বরিশালে ডায়াগনস্টিকের ৬৫ দালালের ফাঁদে অসহায় রোগীরা

সৈয়দ মেহেদী হাসান | ২২:১০, সেপ্টেম্বর ০৯ ২০১৯ মিনিট

মঠবাড়িয়া উপজেলার ভীম নলী গ্রামের বাসিন্দা বাবুলের স্ত্রী শিউলি গুরুত্বর অসুস্থ্য হলে স্বজনদের পরামর্শে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হতে আসেন ১৭ আগস্ট। বাসযোগে এসে রুপাতলীতে নামলেই অটোওয়ালাদের কাছে শুনতে পান শেবাচিমে ভুল চিকিৎসায় রোগী মারা যাওয়ায় ঘন্টা দুই আগে মারামারি হয়েছে। এখন হাসপাতাল এলাকায় কাউকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি রোগীও ভর্তি নিচ্ছে না। এমন খবর শুনে বেকায়দায় পরে গেলেন বাবুল। স্ত্রীকে নিয়ে পড়লেন মহা ঝামেলায়।   ওদিকে শিউলির রক্তক্ষরণ থামছে না। এই যখন অবস্থা তখন জনৈক অটোওয়ালা এগিয়ে এলেন সাহার্যাথ্যে। বললেন শেবাচিমের চেয়েও ভালো একটি হাসপাতাল রয়েছে; সেখানে সরকারিসব বড় বড় ডাক্তার বসে রোগী দেখেন। খরচও তেমন না। ওই অটোয়ালার পরামর্শে শিউলিকে নিয়ে ব্রাউন কম্পাউন্ডের বেসরকারী একটি হাসপাতালে যান বাবুল। সেখানে ভর্তিও করানো হয় বিকেল সাড়ে ৫টায়। কিন্তু রাত ৯টা অবধি কোন ডাক্তার এমনকি নার্স এসেও খোঁজ নেননি।   দুশ্চিন্তায় পড়ে শেষে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের স্মরণাপন্ন হলে জানান, রাতে ডাক্তার আসবে না। সকালে আসবে। বাবুল তার স্ত্রীর গোপনাঙ্গ থেকে রক্ত পরা বন্ধ করার জন্য বলেন। কিন্তু আরও এক ঘন্টা অপেক্ষা করার পর কেউ না আসায় নাম কাটাতে যান বাবুল। তখন জানতে পারেন হাসপাতালে তার দেড় হাজার টাকা বিল এসেছে। বাবুল আরও অবাক হন। পরে ওই হাসপাতালের অদূরে এক চা দোকানী জানান শেবাচিম হাসপাতালে রোগীকে নিয়ে যেতে। কিন্তু বাবুল যে জানে হাসপাতাল বন্ধ। চা দোকানী তখন জানান, হাসপাতাল কখনো বন্ধ থাকে না এবং তিনি যে দালালের খপ্পড়ে পরে এই হাসপাতালে এসেছে তাও জানতে পারে চা দোকানীর মাধ্যমে।   শুধু বাবুল নয় এমন অনেক অজপাড়াগায়ের মানুষ রোগাক্রান্ত স্বজন নিয়ে বিপদের সময়ে এসে এই বরিশাল নগরীতে পড়েন গোলক ধাঁধায়। ভুল তথ্য, বিভ্রান্তকর পরিবেশের সৃষ্টি এবং অনেকটা জিম্মি হয়ে যান এসব রোগীরা। অনুসন্ধানে বেড়িয়ে এসেছে, নগরীর কয়েকজন প্রভাবশালীর মদদে রোগী ধরার দালাল চক্র বিস্তৃতি লাভ করেছে। রুপাতলী, নথুল্লাবাদ ও লঞ্চঘাট এলাকায় তিনটি দালাল চক্র সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এছাড়াও শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বরিশাল জেনারেল (সদর) হাসপাতালে রয়েছে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ডাক্তারি টেস্ট করানোর জন্য আরও এক শ্রেণীর দালাল এবং সদর রোডেও কয়েকটি সুনামধন্য ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালাল চক্র। প্রশাসনের নিরবতার সুযোগে এসব দালালরা ঘুরে বেড়াচ্ছেন গোটা নগরী। যদিও থানা সূত্রে জানা গেছে, কয়েক দফায় রোগী ধরার দালাল ধরতে তালিকা করা হয়েছে। কিন্তু অগ্রগতিও রহস্যজনকভাবে থেমে আছে। তালিকা প্রস্তুত আর ‘অভিযান পরিচালনা করছি’ আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ হয়ে আছে দালাল নিরোধ অভিযান। সরেজমিনে দেখা গেছে, বাস কিংবা লঞ্চ থেকে নামা মাত্রই দালাল চক্রের ফাঁদে পড়তে হচ্ছে রোগী বা রোগীর স্বজনদের। রিক্সা, অটোরিক্সা ও মাহেন্দ্র চালক বেশে থাকা দালাল চক্র রোগীদের ফাঁদে ফেলে নিয়ে যাচ্ছেন নাম স্বর্বস্য ক্লিনিক ও চিকিৎসকদের কাছে। চিকিৎসকের ভিজিট, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফি’র নামে হাতিয়ে নিচ্ছেন হাজার হাজার টাকা। নগরী ঘুরে দেখা গেছে, দালালরা ‘কন্ট্রাক’ ও ‘সাব কন্ট্রাকে’ রোগী নিয়ে থাকে। এই দুই গ্রুপের তিনজন কন্ট্রাকে বা শীর্ষ পর্যায়ে রয়েছে। বাস স্টেশন ও লঞ্চ স্টেশনে যেকোন রোগী নিতে তাদের মাধ্যমে নিতে হয়। রুপাতলী, নথুল্লাবাদ ও লঞ্চঘাটে এই তিন স্থানে কন্ট্রাক গ্রুপে রয়েছে মোট ১৫ জন দালাল। এরমধ্যে রুপাতলীতে রশিদের কন্ট্রাকে কাজ করছেন মনির, জহির, সহিদ, লিটন, রুহুল ও কালা মানিক। নথুল্লাবাদে কাজ করছে কাদের ও রিপন এবং লঞ্চঘাটে কাজ করছে চান্দু, জামাল, স্বপন (১), ছালাম, আনোয়ার এবং স্বপন (২)। এদের সাথে সাবকন্ট্রাকে প্রায় ৫০ জন কাজ করছেন নগরীর বিভিন্ন এলাকায়। দালালরা জানিয়েছে, এই যে তিনটি গ্রুপ রয়েছে এদের মাধ্যমে ডায়াগনস্টিক সেন্টার বা ডাক্তারদের চেম্বারে সরাসরি রোগী দিলে বেশি পার্সেন্টিস পাওয়া যায়। আর যারা সাব কন্ট্রাকে যারা কাজ করেন তাদের পার্সেন্টিসের হার আবার কম। জানা গেছে, একজন দালাল (কন্ট্রাকে) প্রতি রোগী থেকে ডাক্তারের মারফত পাবেন ১৫০ টাকা এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে ৩০%। অর্থাৎ রোগী এনে দিলে ডাক্তার ১৫০ টাকা দিবে আর ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যত টাকার টেস্ট করাবেন ওই রোগী সেখান থেকে শতকরা ৩০ টাকা করে পাবেন। ওদিকে যারা সাব কন্ট্রাকে কাজ করেন তারা ডাক্তারের কাছ থেকে ১০০ ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে ১৫ পার্সেন্ট পান। রিকশা, অটো ও মাহিন্দ্রা, সিএনজি চালক বেশে নগরীতে রোগী ধরার জাল বিছানো এই ৬৫ জন দালালের সাথে সরাসরি প্রশাসনের যোগাযোগ রয়েছে বলেও নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাছাড়া তিনটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক এসব দালালদের প্রশাসনিক ঝামেলা থেকে বাঁচাতে সবসময় তৎপর থাকেন। জানা গেছে, ওই তিনটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কি হারে রোগী দিবে দালালরা তা নিয়ে কিছু দিন আগে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকদের মধ্যে উত্তেজনা ও হামলার ঘটনাও বেশ আলোচনার রসদ জুগিয়েছিল। দালালরা জানিয়েছেন, নির্ধারিত ওই তিনটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী দেওয়ার পর আরও কয়েকজন ডাক্তারের চেম্বারে তারা রোগী নিয়ে যান। তাছাড়া বাকি যেসব ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে সেখানেও মাঝে মাঝে রোগী দিতে হয়। রুপাতলীর দালাল কমান্ডার রশিদ বলেন, নাম আর ছবি নিয়ে কোন কাজ হবে না। মাস শেষে ডিবিতেও নেয়, পুলিশেও নেয়। আপনে সাংবাদিক; অত ঝামেলার কি দরকার। নাম্বার দিয়া যান। আগামী মাসের শুরুতে কল দিয়েন। দেখি কয় টাকা দেয়া যায়। অপর এক পশ্নের জবাবে আরেক দালাল সহিদ মুঠোফোনে একজন সাংবাদিককে ধরিয়ে দিয়ে বলেন, নেন কথা বলেন। মোবাইলের অপরপ্রান্তে থাকা জনৈক সাংবাদিক কথা না বলে লাইন কেটে দেন। শেষে সহিদ জানান, প্রতিমাসে স্থানীয় সাংবাদিক, নেতা, ডিবি ও পুলিশের বিভিন্ন টিমকে চুক্তি ভিত্তিক মাসোহারা দিয়েই তারা রোগী ধরার দালালি করেন। লঞ্চঘাটের দালাল আনোয়ার জানান, কয়েকদিন আগে সিআইডি তাকে আটক করেছিল। দিন পনেরো কারাগারে ছিল। যেদিন ছাড়া পেয়েছেন সেদিনই অটো নিয়ে লঞ্চঘাটে চলে এসেছে। আনোয়ারের দাবী, আটকের পর তার পরিবারের খরচ ও তার মামলার খরচ সবই দিয়েছে ড্য়াাগনস্টিক মালিক। অপর দালাল স্বপন ও ছালাম বলেন, শহরের সবগুলো ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালাল রয়েছে। একটা রুটিনমত সবাইকে রোগী দিতে হয়। না হলে ঝামেলা করে। প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, মাঝে মাঝে দালাল নিরোধে অভিযান পরিচালনা করলেও আটকের পর তদ্বিরের কারনে দালালদের ছেড়ে দিতে হয়। উল্লেখিত দালালদের বিরুদ্ধে মেট্রোপলিটন পুলিশের বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। এমনকি র‌্যাবের হাতেও এসব অপরাধীরা বিভিন্ন সময়ে আটক হয়েছেন। অবাক করা তথ্য হলো, আটকের পর কোন দালালই এক মাসের বেশি কারাভোগ করেননি। বরিশাল জেলার সিভিল সার্জন ও জেনালে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ মনোয়ার হোসেন জানান, চিকিৎসা সেবায় দেশে প্রথম স্থান অধিকারী ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের দালাল চক্রও নিরোধ করতে পারেনি কেউ। বরিশালেও যে দালালদের দৌরত্ম নেই তেমন নয়; আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি দালালদের সনাক্ত করে আইনের হাতে তুলে দিতে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দালাল যেহেতু এক প্রকারের প্রতারক। প্রতারক দমনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারে পুলিশ-প্রশাসন।  (চলবে....)