কাউন্সিলর প্রার্থীদের ‘সালাম’ পাঠাচ্ছে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা

ন্যাশনাল ডেস্ক | ১২:১২, জানুয়ারি ১৮ ২০২০ মিনিট

ঢাকা সিটি করপোরেশন ঘিরে তৎপর হয়ে উঠেছে আন্ডারওয়ার্ল্ড। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কয়েকজন দেশের বাইরে থেকে একাধিক কাউন্সিলর প্রার্থীকে এরই মধ্যে ফোনও করেছে। আবার অনেকে কারাগারে বসে তাদের শিষ্যদের মাধ্যমে বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে প্রার্থীদের কাছে। সন্ত্রাসীদের 'সালাম' পেয়ে কাউন্সিলরদের কেউ কেউ খুশি, আবার কেউ শঙ্কায়। এরই মধ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসী লেদার লিটন ও আবু রাসেল মাসুদ ওরফে মোল্লা মাসুদ অন্তত চারজন কাউন্সিলরকে ফোন করে তাদের ছোট ভাইদের দেখে রাখার নির্দেশ দিয়েছে। সূত্র বলছে, লেদার লিটন ও মোল্লা মাসুদ বর্তমানে নেপালে রয়েছে। নির্বাচন উপলক্ষে কিছু 'খরচপাতি' চেয়েছে তারা। এর বিনিময়ে নির্বাচনের মাঠে ছোট ভাইয়েরা তাদের হয়ে কাজ করবে। মোল্লা মাসুদ তার দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত পুরান ঢাকার কামরুল ইসলাম কিংকংয়ের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছে। সর্বশেষ ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মাসিক অপরাধ সভায় পুলিশের মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের নির্বাচন ঘিরে অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের তৎপরতার ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সূত্র জানায়, সপ্তাহখানেক আগে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দুই কাউন্সিলর প্রার্থীকে ফোন করে মোল্লা মাসুদ। তাদের বলা হয়, 'মামাও তাদের সঙ্গে আছে। কোনো সমস্যা নেই।' মামা বলতে শীর্ষ সন্ত্রাসী 'সুব্রত বাইন'কে বোঝানো হয়। এ ছাড়া লেদার লিটন পুরান ঢাকার অন্তত দু'জন কাউন্সিলর প্রার্থীকে ফোন করেছে। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তৎপরতার ওপর নজর রাখেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন এক কর্মকর্তাও নির্বাচন ঘিরে সন্ত্রাসীদের এই নড়েচড়ে বসার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। যারা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে ফোন পেয়েছেন, তাদের মধ্যে দু'জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে এ ব্যাপারে তারা প্রকাশ্যে মুখ খুলতে রাজি হননি। এ ছাড়া এরই মধ্যে একজন মেয়র প্রার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান। তার সঙ্গে দুবাইয়ে বৈঠকের পরামর্শ দেয়। তবে ওই মেয়র প্রার্থী জিসানের প্রস্তাবে সাড়া দেননি। জিসান যাদের ব্যবহার করছে তাদের মধ্যে রয়েছে বাসাবোর দাতইন্যা খোকন ও বাড্ডার মুরগি সোহেল। দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, মোল্লা মাসুদ ছাড়া পাওয়ার পর ঢাকায় তার এক ঘনিষ্ঠ ক্যাডারের সঙ্গে সে যোগাযোগ করে। সেই কথোপকথনে উজ্জ্বল ও রনি নামে দু'জনের নাম উঠে আসে। তাদের ঘিরে মাসুদের একটি পরিকল্পনা রয়েছে। একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, কাশিমপুর কারাগারে বন্দি এক সন্ত্রাসীর ব্যাপারে গোয়েন্দারা খোঁজ নিচ্ছেন। তার নাম নাটকা বাবু। নাটকা বাবু সেভেন মার্ডার মামলার আসামি। এ ছাড়া পিচ্চি রনি নামে একজনের ব্যাপারে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে; যে সুব্রত বাইনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। পুলিশের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, লেদার লিটনের সঙ্গে পুরান ঢাকার একাধিক কাউন্সিলর প্রার্থীর অনেক আগে থেকেই সুসম্পর্ক রয়েছে। তবে নির্বাচন উপলক্ষে কেউ কেউ আগে থেকেই তার সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন। 'ম' আদ্যাক্ষরের এক কাউন্সিলর প্রার্থীর সঙ্গে লিটন নিজ থেকে যোগাযোগ করেছে। এ ছাড়া শামীম, প্রিন্স, মঞ্জু নামে তিনজনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে সুব্রত বাইন, জিসান ও লেদার লিটন। এক মেয়র প্রার্থীর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতে বিদেশে বসেই পরিকল্পনা করছে তারা। এ জন্য ঢাকায় শিষ্যদের নিয়মিত নানা ধরনের পরামর্শ দিচ্ছে তারা। এ ছাড়া আরেক সন্ত্রাসী সুইডেন আসলামও কারাগারে বসে অপতৎপরতা চালানোর চেষ্টা করছে। জানা গেছে, পলাতক ও কারাবন্দি শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনেকে চায়, তাদের বলয়ের লোকজন কাউন্সিলর নির্বাচিত হোক। এতে পরে তাদের কব্জায় রেখে অনেক কাজ হাসিল করতে পারবে তারা। এর আগেও একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসীকে নিয়মিত মাসোহারা দিয়েছেন কয়েকজন কাউন্সিলর। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, নির্বাচনের মাঠে যাতে কোনো সন্ত্রাসী প্রভাব রাখতে না পারে, সে ব্যাপারে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিদেশে পলাতক ও কারাবন্দি সন্ত্রাসীদের ওপর নজর রাখা হচ্ছে। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) কৃষ্ণপদ রায় সমকালকে বলেন, নির্বাচন ঘিরে সন্ত্রাসীদের তৎপরতার ব্যাপারে নজর রাখছে পুলিশ। কেউ কোনো অপতৎপরতা চালালে আইনের আওতায় আনা হবে। ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার আবদুল বাতেন বলেন, নির্বাচনে যাতে কোনো সন্ত্রাসী প্রভাব রাখতে না পারে সে ব্যাপারে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সূত্র জানায়, ২০১৫ সালে সরকারের তালিকাভুক্ত ও পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসী মোল্লা মাসুদ ভারতে গ্রেপ্তার হয়। কলকাতা পুলিশের অ্যান্টি-টেররিজম স্কোয়াড (এটিএস) মুর্শিদাবাদ এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে। এর পর অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাকে দুই দফায় ১৮ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই টপ টেররকে আলীপুরের প্রেসিডেন্সি কারাগারে রাখা হয়েছিল। সম্প্রতি মোল্লা মাসুদ জামিনে ছাড়া পেয়েছে বলে একটি সূত্র জানায়। মতিঝিল ও গোপীবাগ এলাকায় একসময় ত্রাসের রাজত্ব ছিল মোল্লা মাসুদের। অপরাধ জগতে তার গুরু আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন। ভারতে মূলত সে আবু রাসেল মো. মাসুদ নামে পরিচিত। ভারতের নাগরিক রিজিয়া সুলতানাকে বিয়ে করে দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় মোল্লা মাসুদ সেখানে বসবাস করছিল। সুব্রত বাইন তার ধর্ম পরিবর্তন করে। বর্তমানে সে ভারতের কারাগারে। পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন দেশে পালিয়ে আছে। তাদের অনেককে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। আবার কোনো শীর্ষ সন্ত্রাসী দেশে কারাগারে বন্দি রয়েছে। বিদেশে দীর্ঘ দিন পলাতক আছে- সুব্রত বাইন, মোল্লা মাসুদ, খন্দকার তানভীরুল ইসলাম জয়, হারিস আহমেদ হারেস, নবী হোসেন, রফিকুল ইসলাম, ইমাম হোসেন, প্রকাশ কুমার বিশ্বাস, বিকাশ কুমার, শামীম আহমেদ ওরফে আগা শামীম, জাফর আহমেদ মানিক ওরফে মানিক, আমিন রসুল সাগর ওরফে টোকাই সাগর, লেদার লিটন ও কামরুজ্জামান। আসলাম ওরফে সুইডেন আসলাম, বিপ্লব রহমান ওরফে লম্বু সেলিম, কিলার আব্বাস, এস এম আরমান রয়েছে দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা সমকালকে জানান, বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসীরা নানা কারণে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। শিষ্যদের মাধ্যমে ঢাকায় চাঁদাবাজির একটি বড় ভাগ তারা নিয়মিত পেয়ে থাকে। অসাধু রাজনৈতিক নেতাদের মাধ্যমে বিভিন্ন দপ্তরের বড় বড় টেন্ডার ও ঈদের সময় কোরবানির গরুর হাটের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার চেষ্টা করে পলাতক সন্ত্রাসীরা। অনেক সময় পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে কেউ কেউ নিজস্ব প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে।