এখনো হৃদয়ে রক্তক্ষরণ

ন্যাশনাল ডেস্ক | ১৩:২৫, ফেব্রুয়ারি ২৫ ২০২০ মিনিট

আজ ২৫ ফেব্রুয়ারি। ১১ বছর আগের এই দিনে পিলখানায় ভয়াবহ এক হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়। মুহুর্মুহু বিকট শব্দে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে ঢাকা শহর। শহরবাসীর ঘুম ভাঙে সেই শব্দে। বিডিআরের বিপথগামী সদস্যরা বিদ্রোহ করে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে। সেই ঘটনায় মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে আসা কর্মকর্তাদের আজও দুঃসহ স্মৃতি তাড়া করে ফেরে। স্বজনহারাদের কান্না এখনো থামেনি। এখনো তাদের হৃদয়ে চলছে রক্তক্ষরণ।   দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করা এ হত্যাকাণ্ডের পর দুটি মামলা করা হয়- সেনা কর্মকর্তাদের নিহতের ঘটনায় দণ্ডবিধি আইনে করা হয় হত্যা মামলা। অপর মামলাটি হয় বিস্ফোরক আইনে। এর মধ্যে হত্যা মামলার বিচারকাজ শেষ। ইতোমধ্যে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছেন, তার পূর্ণাঙ্গ কপিও প্রকাশ হয়েছে। রায়ে সেদিনের বিদ্রোহে নেতৃত্বদানকারী ডিএডি তৌহিদসহ (মৃত) ১৩৯ আসামির ফাঁসি, ১৮৫ জনের যাবজ্জীবন ছাড়াও ২০০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এখন সে রায় কার্যকরের অপেক্ষায় আছেন সেদিন প্রাণে বেঁচে যাওয়া কর্মকর্তারা এবং যেসব কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়েছিল তাদের স্বজনরা। রায় কার্যকর হলে তা হবে তাদের চিরকালীন সে ক্ষতে সান্ত্বনার প্রলেপের মতো। তাই এতদিন পেরিয়ে এসে আজও চলছে সেই প্রতীক্ষা। অন্যদিকে ১১ বছর পেরিয়ে গেলেও অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে করা মামলাটির বিচারকাজ এখনো শেষ হয়নি।   এ ঘটনায় এরই মধ্যে বাহিনীর নিজস্ব আইনে করা মামলার বিচার শেষ হয়েছে। এ ছাড়া পিলখানায় নারকীয় হত্যার ঘটনায় করা মামলায় নিম্নআদালত ১৫২ জনের মৃত্যুদ- দেন। ২০১৭ সালের ২৭ নভেম্বর হাইকোর্টে আপিলের রায়ে ১৩৯ জনের মৃত্যুদ-ের রায় বহাল রাখা হয়। সর্বশেষ গত ৮ জানুয়ারি বিডিআর হত্যা মামলার ডেথরেফারেন্স ও আসামিদের আপিলের ওপর দেওয়া রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়। রায়ের দৈর্ঘ্য ও মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামির সংখ্যার দিক থেকে এটিই বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ রায়। এই রায়ে ওই বিদ্রোহে নেতৃত্বদানকারী ডিএডি তৌহিদসহ ১৩৯ জনকে ফাঁসি, ১৮৫ জনকে যাবজ্জীবন ছাড়াও ২০০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়; খালাস দেওয়া হয় ৭৯ জনকে।   দীর্ঘ দিন পরও এ ঘটনায় নিহতদের স্বজনদের চোখের পানি শুকায়নি। বিডিআরের তৎকালীন ডিজি মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের ভাই শফিক আহমেদ সুইট আমাদের সময়কে বলেন, ‘এসব বলে তো আসলে লাভ হবে না। এখন একটিই অপেক্ষা- সব আইনি প্রক্রিয়া শেষে দণ্ডিতদের রায় কার্যকরের। আমার মায়ের খুব আশা ছিল, বিচার শেষে রায় কার্যকর দেখার। কিন্তু তার সেই আশা পূরণ হয়নি। তার আগেই মা মারা গেলেন। আমরা এখনো সেই অপেক্ষাতেই আছি।’   হত্যা মামলার রায়ে ১৩৯ জনের মৃত্যুদ- বহাল রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে তিনজন মারা গেছেন। যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছে ১৮৫ জনকে। তার ভেতরে একজন মৃত্যুবরণ করেছেন। ১৩ বছর সশ্রম কারাদ- দিয়েছেন দুজনকে। ১৫৭ জনকে ১০ বছর কারাদ- দিয়েছেন আদালত, এর ভেতর দুজন মারা গেছেন। ১৩ জনকে সাত বছর, ১৪ জনকে ৩ বছর, ১ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে ২ জনকে, মোট ৫৫২ জনকে সাজা এবং ২৮৩ জনকে খালাস দেওয়া হয়েছে। মোট মারা গেছেন ১৪ জন।   অন্যদিকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন বিস্ফোরক আইনের মামলাটি। এ মামলায় আসামি ৮৩৪ জনের মধ্যে একজন সিভিলিয়ান, বাকি আসামিরা বিডিআরের জওয়ান। এ মামলার আসামিদের মধ্যে ২৪ জন মারা গেছেন। জীবিত আসামি ৭৯০ জন। পলাতক রয়েছেন ২০ জন। মামলাটিতে ১৪৬ জন সাক্ষী দিয়েছেন। এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রায় ১২০০ সাক্ষী রয়েছে। আগামী ৮ মার্চ পরবর্তী সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য রয়েছে। এ মামলার আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ বাহারুল ইসলাম বলেন, আশা করছি এ বছরের মধ্যে এ মামলার রায় দেওয়া সম্ভব হবে।   বিদ্রোহের পর বিডিআর আইন, নাম, পোশাক, পতাকা ও মনোগ্রামসহ অনেক কিছুতেই পরিবর্তন আনা হয়। দুঃসহ সময় পেছনে ফেলে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বিজিবি। বর্তমানে সাফল্যের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী বিজিবি। বিজিবির কর্মসূচি এদিকে পিলখানায় সেদিন যাদের হত্যা করা হয়েছিল, তাদের স্মরণে আজ মঙ্গলবার শাহাদাতবার্ষিকী পালন করবে বিজিবি। দিনের কর্মসূচিতে রয়েছে পিলখানাসহ বিজিবির সব রিজিয়ন, সেক্টর, প্রতিষ্ঠান ও ইউনিটের ব্যবস্থাপনায় বাদ ফজর খতমে কোরআন, বিজিবির সব মসজিদে এবং বিওপি পর্যায়ে শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় সকাল ৯টায় বনানীর সামরিক কবরস্থানে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তিন বাহিনীর প্রধান (সম্মিলিতভাবে), স্বরাষ্ট্র সচিব এবং বিজিবি মহাপরিচালক (একসঙ্গে) শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এ ছাড়া আগামীকাল বুধবার বাদ আসর পিলখানার বীর উত্তম ফজলুর রহমান খন্দকার মিলনায়তনে শহীদ ব্যক্তিদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। এ ছাড়া স্বরাষ্ট্র সচিব, বিজিবি মহাপরিচালক, শহীদ ব্যক্তিদের নিকটাত্মীয়, পিলখানায় কর্মরত সব কর্মকর্তা, জুনিয়র কর্মকর্তা, অন্যান্য পদবির সৈনিক ও বেসামরিক কর্মচারীরা অংশগ্রহণ করবেন। উল্লেখ্য, ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পিলখানায় বিডিআরের জওয়ানরা ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। সেদিন পিলখানার এই বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশের ৫৭টি ইউনিটে। টানা একদিন এক রাত শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি মোকাবিলা করে ২৬ ফেব্রুয়ারি বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণে আসে। বিডিআর হত্যাকা-ে দুইভাবে বিচার করা হয়। একটি হলো বাহিনীর নিজস্ব আইনে, অন্যটি ফৌজদারি আইনে।