শত শত কর্মকর্তার বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বন্ধ

ন্যাশনাল ডেস্ক | ১১:৫৩, মার্চ ১৫ ২০২০ মিনিট

প্রশাসনে যুগ্মসচিব ও অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ে কর্মরতদের মধ্যে কয়েকশ’ কর্মকর্তার বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকে ২-৩ বছর ধরে এ সুবিধা পাচ্ছেন না। এ নিয়ে তাদের মধ্যে ক্ষোভ-অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ সংকট নিরসনে লিখিত আবেদন জানিয়ে প্রশাসন ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশন নেতাদের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। এদিকে শুধু ক্যাডার কর্মকর্তা নন, বিদ্যমান বেতন স্কেল নিয়ে নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি-দাওয়া জোরালো হচ্ছে। তারা জানিয়েছেন, বেতন দ্বিগুণ করা হলেও ২০০৯ সালের পে-স্কেলে যেসব সুবিধা ছিল তার অনেক কিছু ২০১৫ সালের পে-স্কেলে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে ওই অর্থে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা লাভবান হয়নি। তারা আগের টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের পুনর্বহাল চান। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, সচিব হতে না পারলেও চাকরিতে কর্মরত আছেন সিনিয়র ব্যাচের এমন অনেক যুগ্মসচিব ও অতিরিক্ত সচিব ইতিমধ্যে তাদের বেতন গ্রেডের শেষ ধাপে পৌঁছে গেছেন। যেমন- কোনো কর্মকর্তা অতিরিক্ত সচিব হওয়ার পর তিনি বেতন স্কেলের ২নং গ্রেডে বেতন-ভাতা পাবেন। এছাড়া পদোন্নতি হলে একজন কর্মকর্তা শুধু তার অর্জিত ওপরের বেতন গ্রেডে উন্নীত হন না, বিভিন্ন হিসাব মিলিয়ে ফিক্সেশন বা বেতন সমন্বয়ের পর বেশির ভাগ কর্মকর্তার মূল বেতন প্রাপ্ত গ্রেডের প্রথম স্তরে থাকে না। ওই গ্রেডের আরও কয়েকটি ইনক্রিমেন্ট পার হয়ে মূল বেতন নির্ধারিত হয়। ফলে দেখা যায়, কেউ অতিরিক্ত সচিব পদে ৩ বছর পার করলেই তিনি জাতীয় বেতন স্কেলের ২নং গ্রেডের একেবারে শেষ ধাপে অর্থাৎ ৭৪ হাজার ৪০০ টাকা মূল্য বেতনের সীমায় পৌঁছে যায়। এরপর ১নং গ্রেডে সচিবের জন্য নির্ধারিত বেতন ৭৮ হাজার টাকা। ফলে যারা ২নং গ্রেডের শেষ ধাপে পৌঁছে গেছেন তাদের আর ইনক্রিমেন্ট প্রাপ্তির সুযোগ নেই। মূলত এ কারণে অনেকের স্বাভাবিক বেতন বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে গেছে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তাদের কয়েকজন যুগান্তরকে বলেন, এ বিষয়টির সুরাহা হওয়া দরকার। কেননা একজন কর্মকর্তা এভাবে বছরের পর বছর চাকরি করে যাবে, কিন্তু তার বেতন বাড়বে না, এটা হতে পারে। তারা মনে করেন, হয় ২নং গ্রেডে ইনক্রিমেন্টের সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে। নতুবা বিকল্প কোনো ব্যবস্থা রাখতে হবে। সম্প্রতি একজন অতিরিক্ত সচিব এ বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব বরাবর আবেদন করেন। ৮ মার্চ দেয়া এ আবেদনপত্রের এক স্থানে বলা হয়, ‘আমরা ৮৪, ৮৫ ও ৮৬ ব্যাচের অতিরিক্ত সচিবগণ এবং বিভিন্ন ব্যাচের যুগ্মসচিবগণ জাতীয় বেতন স্কেলের শেষ ধাপে পৌঁছেছি। এ কারণে অনেকেরই ১ থেকে ৩ বছর পর্যন্ত বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি বন্ধ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মকর্তা বেতন বৈষম্য বা বঞ্চনার শিকার।’ সেখানে আরও বলা হয়, জানা মতে বেতন স্কেল বিষয়ে গঠিত একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সুপারিশে বলা আছে, যারা বেতন স্কেলের শেষ ধাপে পৌঁছাবে তাদের জন্য বিশেষ বেতন বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা হবে। এ ধরনের একটি সুপারিশ অর্থ বিভাগের বাস্তবায়ন অনুবিভাগে রয়েছে। তাই সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আবেদনকারী অতিরিক্ত সচিব জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আলোচনাক্রমে দ্রুত সমাধান করার দাবি জানান। এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব যুগান্তরকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে ২ বছর আগে একটি কমিটি কাজ করেছিল। সে সময় তিনি ওই কমিটির সদস্য ছিলেন। কমিটি কিছু সুপারিশ করেছিল। কিন্তু পরে কি হয়েছে বলতে পারব না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব প্রতিবেদককে বলেন, বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কয়েকশ’ কর্মকর্তা বিষয়টি নিয়ে মানসিক কষ্টে আছেন। তাই এর একটা বিহিত হওয়া দরকার। তবে একটি কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, বর্তমান সরকার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য যা করেছে তা অতীতের কোনো সরকার করেনি। বিশেষ করে কর্মকর্তাদের নানামুখী সুবিধা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এজন্য তার প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। নন-ক্যাডার কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রধান দাবি : সচিবালয়ের কর্মচারীদের নেতাদের অনেকে যুগান্তরকে জানান, ২০০৯ সালের জাতীয় বেতন স্কেলে নন-ক্যাডার কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য সিলেকশন গ্রেড ও টাইমস্কেল প্রদানে বেশ কিছু সুবিধা দেয়া হয়। এর মধ্যে প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তারা (এওপিও) পেতেন ১টি সিলেকশন গ্রেড ও ২টি টাইমস্কেল, স্টেনোটাইপিস্ট ও অফিস সহকারীরা পেতেন ৩টি টাইমস্কেল এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা ৩টি টাইমস্কেল ও ১টি সিলেকশন গ্রেড পেতেন। কিন্তু ২০১৫ সালে জাতীয় বেতন স্কেলে এসব সুবিধা কর্তন করে চাকরির ১০ এবং ১৬ বছর পূর্তিতে ২টি বেতন সুবিধা রাখা হয়। এর ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আগের প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। সে কারণে জাতীয় বেতন স্কেলে মূল বেতন দ্বিগুণ করা সত্ত্বেও সামগ্রিকভাবে হিসাব করলে কর্মচারীরা আর্থিকভাবে লাভবান হননি। তারা উদাহরণ দিয়ে বলেন, ২০০৯ সালের জাতীয় পে-স্কেলে এওপিওরা চাকরির চার বছর পূর্তিতে উচ্চতর স্কেলে সিলেকশন গ্রেড, ৮ বছরে প্রথম টাইমস্কেল এবং ১২ বছরে দ্বিতীয় টাইমস্কেল পেতেন। স্টেনোটাইপিস্টরা চাকরির শুরুতে ১টি টাইমস্কেল, ১২ বছরে ২য় টাইমস্কেল এবং ১৫ বছরে পেতেন ৩য় টাইমস্কেল। কিন্তু বিদ্যমান পে-স্কেলে তাদের এসব সুবিধা আর নেই। অপরদিকে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ৪টি উচ্চতর বেতন স্কেল এখন আর নেই। তারা বলেন, যেহেতু পে-স্কেলের সময়সীমা ৫ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে তাই পরবর্তী পে-স্কেল না হওয়া পর্যন্ত তাদের জন্য মহার্ঘ ভাতা দেয়া হোক। তারা বলেন, প্রতিদিন জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে। তাই বর্তমান বেতন-ভাতা দিয়ে কর্মকর্তাদের অনেকের সমস্যা না হলেও সাধারণ কর্মচারীদের ওপর খরচের চাপ বাড়ছে। কেউ কেউ স্থায়ী পে-কমিশন গঠনের ওপর জোরালো মতামত দেন। তারা মনে করেন, স্থায়ী পে-কমিশন হলে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতি বছর তাদের বেতন ও ভাতা বাড়বে। সেটি হলে খুব ভালো হবে। বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ এবং এডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মো. রুহুল আমিন শনিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা আগের সিলেকশন গ্রেড ও টাইমস্কেল সুবিধা পুনর্বহাল চাচ্ছি। বিষয়টি নিয়ে সংগঠনের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে লিখিত দাবি জানানো হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘সব সুবিধা পাচ্ছেন ক্যাডার কর্মকর্তারা। বিপরীতে সে তুলনায় নন-ক্যাডার কর্মকর্তা ও সাধারণ কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়েনি।’ রুহুল আমিন বলেন, ‘তবে সরকারি কর্মচারীরা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনেক খুশি। কেননা এ সরকার যা করেছে তা কোনো সরকার করেনি। এখন শুধু প্রয়োজন, কর্মকর্তাদের সঙ্গে কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য কমানো। সচিবালয় চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আবুল হাশেম যুগান্তরকে বলেন, ‘আমাদের আগের টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বহাল করা খুবই জরুরি। কেননা চতুর্থ শ্রেণির বহু যোগ্য কর্মচারী দীর্ঘদিন চাকরি করেও পদোন্নতি পাচ্ছে না। যেমন আমার কথা ধরুন। আমি স্নাতক পাস। চাকরি করছি ১২ বছর। কিন্তু কোনো পদোন্নতি পাইনি। বিদ্যমান পে-স্কেলে বলা হয়েছে, কেউ ১০ বছর চাকরি করার পর কোনো পদোন্নতি না পেলে পরের বছর তিনি বেতন স্কেলের এক ধাপ ওপরে যাওয়ার সুবিধা পাবেন। অর্থাৎ একটি টাইমস্কেল। এছাড়া কেউ টানা ১৬ বছর চাকরি করার পর পদোন্নতি না পেলে আরও ১টি উচ্চতর স্কেল পাবেন। এটাই শেষ। কিন্তু ২০০৯ সালের পে-স্কেলে আমরা চাকরির ৮, ১২ ও ১৫ বছর পূর্তিতে ৩টি টাইমস্কেল এবং ১টি সিলেকশন গ্রেড পেতাম। পদোন্নতি পেলেও এ সুবিধা বহাল থাকত। কিন্তু এখন এসব কিছু নেই। সঙ্গত কারণে সাধারণ কর্মচারীদের এ যৌক্তিক দাবি নিশ্চয় অন্যায় হবে না।’ কর্মচারীদের আগের টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেড পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী সংহতি পরিষদের সভাপতি মো. নিজামুল ইসলাম ভূঁইয়া মিলন। শনিবার তিনি যুগান্তরকে বলেন, ২০১৫ সালের পে-স্কেলে আগের ৩টি টাইমস্কেল ও ১টি সিলেকশন গ্রেড প্রত্যাহার করা সঠিক হয়নি। এতে করে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির প্রায় ১২ লাখ কর্মচারী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি ১০০% পেনশন বহাল রাখাসহ মুজিববর্ষে কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর দাবি জানান। প্রসঙ্গত, টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের আর্থিক সুবিধা একই। অর্থাৎ বেতন গ্রেড এক ধাপে উন্নীত হওয়া। এর মধ্যে টাইমস্কেল হলো চাকরির একটি নির্ধারিত সময়কাল পার হওয়ার পর দেয়া হয়। এছাড়া নির্দিষ্ট একটা সময় অতিক্রম অথবা বিভাগীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া সাপেক্ষে দেয়া হয় সিলেকশন গ্রেড।