করোনাভাইরাস: সাংবাদিক-পুলিশ-চিকিসৎকদের সুরক্ষা জরুরী

মতবাদ ডেস্ক | ১২:২০, মার্চ ২১ ২০২০ মিনিট

বিশ্বজুড়ে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশে মারা গেছে একজন। প্রতিদিনই করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। করোনা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। তবে আমাদের দেশে যে কোন দুর্যোগ দেখা দিলে ডাক্তার, নার্স, সাংবাদিক ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সবার আগে ঝাপিয়ে পড়েন। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে আতংক করোনা মোকাবিলায়ও পিছ-পা হননি এ সংস্থাগুলোর সদস্যরা। সচেতনতা বাড়িয়ে এ রোগের সংক্রমন ঠেকাতে তারা একযোগে কাজ করছেন। তাদের পাশাপাশি বিভিন্ন সেচ্ছাসেবী সংস্থাও এগিয়ে আসছে। এক্ষেত্রে সংবাদকর্মী, পুলিশ ও চিকিৎসকদের সর্বাগ্রে নিরাপত্তার তাগিদ দিচ্ছেন এসব সংস্থা/সংগঠনের প্রতিনিধিরা। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর)’র অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা গতকাল নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন শুক্রবার পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২০ জন। তিনি জানিয়েছেন, নভেল করোনা ভাইরাসের (২০১৯-এনসিওভি) ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ, তবে এ বিষয়ে আতঙ্কের কিছু নেই। উল্লেখ্য গত ডিসেম্বরে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহর থেকে করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি হয়। এরপর থেকেই তা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। এদিকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে ডাক্তার, নার্স, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্টদের সুরক্ষার জন্য ব্যক্তিগত নিরাপত্তার সরঞ্জাম (পিপিই) সরবরাহের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বাস্থ্য সচিব, জনপ্রশাসন সচিব, সমাজকল্যাণ সচিব, তথ্য সচিব, বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের মহাব্যবস্থাপক, পুলিশের আইজি, আইইডিসিআর ও আইসিডিডিআরবির পরিচালকসহ মোট ১১ জনকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. জে আর খান (রবিন)। নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে, সাংবাদিক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ডাক্তারদের কর্তব্য পালন করতে গিয়ে অসংখ্য মানুষের মুখোমুখি হতে হয়, তাই তাদের নিরাপত্তার স্বার্থে পিপিই একান্ত আবশ্যক। বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস ছড়াতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে জেলা শহর থেকে শুরু করে গ্রাম এলাকাতেও বিস্তার লাভ করেছে। করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে পেশাদারিত্বের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখে জনগণের সেবায় কাজ করছেন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা ছাড়াও বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস এবং সিভিল ডিফেন্স, বাংলাদেশ পুলিশ, ডাক্তার, নার্স, ফায়ার সার্ভিস, সংবাদকর্মী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, আনসার-ভিডিপি, বাংলাদেশ স্কাউটস, বিএনসিসির সদস্যসহ বিভিন্ন সেচ্ছাসেবী সংস্থা। সকলের ইতিবাচক মানসিকতা, পেশাদারিত্ব মনোভাবসহ সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই এ রোগের সংক্রমন ঠেকাতে সকলের সহযোগিতা অপরিহার্য। চলতি মার্চ মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ১০ হাজার প্রবাসী বরিশাল বিভাগে এসেছেন। গত ১৯ দিনে বরিশাল বিভাগের ১০ হাজার ৩০৩ জন প্রবাসী দেশে ফিরলেও হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত হয়েছে মাত্র ৪০৭ জনের। নির্দিষ্ট ঠিকানা না থাকায় প্রবাস ফেরতদের খুঁজে পাচ্ছে না প্রশাসন। এ কারণে তাদের যথাযথ কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে পারছে না তারা। সরেজমিনে দেখা গেছে, বিদেশ ফেরত প্রবাসীদের যে তালিকা আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে প্রেরণ করা হয়েছে তাতে ওই প্রবাসীদের নাম থাকলেও পিতা-মাতা কিংবা মোবাইল নম্বর না থাকায় তাদেরকে খুঁজে পাওয়া দুস্কর হয়ে পড়ছে। তবে পুলিশের বিশেষ শাখার তালিকা অনুযায়ী সবাইকে খুঁজে বের করে কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। এক্ষেত্রে সম্মিলিতভাবে প্রবাস ফেরতদের খুঁজে কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করার জন্য সরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিসহ সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা। এদিকে মাঠ পর্যায়ে যে সকল পুলিশ সদস্য, সাংবাদিক এবং চিকিৎসকরা কাজ করছেন তাদের সাথে আলাপকালে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানিয়েছেন, একমাত্র বরিশাল বিভাগে এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাস সনাক্তকরণে প্রয়োজনীয় কিট আসেনি। তাহলে আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কি ব্যবস্থা নেয়া হবে। তারা আরো বলেন, ‘আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে আমরা কিভাবে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবো? বরিশাল নিউজ এডিটরস্ কাউন্সিলের সভাপতি আরিফিন তুষার বলেন, করোনা পরীক্ষা জন্য যে কিট প্রয়োজন তা এখনো বরিশালে এসে পৌঁছায়নি। যারা চিকিৎসা সেবা দিবেন তাদের নিরাপত্তার জন্যই কোন ব্যবস্থা এখনো হয়নি। সেক্ষেত্রে পুলিশ ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা দিবে কিভাবে? প্রশ্ন রাখেন তিনি। বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি সুশান্ত ঘোষ বলেন, সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তা প্রয়োজন চিকিৎসকদের। কারণ তারা সরাসরি আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিয়ে থাকেন। আর করোনা ভাইরাসের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকরা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই এদিক বিবেচনা করে সংবাদকর্মীদের তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে সরাসরি না গিয়ে ডিজিটাল মাধ্যম অর্থাৎ মুঠোফোনে কিংবা ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে তথ্য সংগ্রহ করা উচিত। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে যতক্ষণ পর্যন্ত সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তামূলক প্রোটেকশনের ব্যবস্থা না করা হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত নিজস্ব প্রটেকশনে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে। তিনি বলেন, আমরা সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধি হিসেবে প্রত্যেকটি সংবাদ মাধ্যম কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানাবো যেন সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা সর্বাগ্রে চাই বলেন তিনি। শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এস.এম জাকির বলেন, ‘ইতিমধ্যে জাতীয় প্রেসক্লাব বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে বলে জেনেছি। আমরাও পরিস্থিতি বিবেচনা করে বরিশাল প্রেসক্লাব বন্ধ করবো।’ তিনি আরো বলেন, সংবাদকর্মী বিশেষ করে যারা মাঠ পর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহ করে থাকে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে বরিশাল জেলা প্রশাসনকে জানিয়েছি। এছাড়া আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের জন্য যদি সরকারের পক্ষ থেকে কোন ধরণের মেডিকেল ইকুইপমেন্ট সরবরাহ করা হয় তাহলে যেন সংবাদকর্মীদের জন্যও তা বরাদ্দ দেয়া হয় এজন্য আমরা সরকারের কাছে খুব শীঘ্রই আবেদন করবো’। এদিকে সিভিল প্রশাসনের পাশাপাশি করোনা প্রতিরোধে পুলিশের করনীয় বিষয়ে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দিক নির্দেশনা দিয়েছেন বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোঃ শাহাবুদ্দিন খান ও রেঞ্জ ডিআইজি মো. শফিকুল ইসলাম। বিএমপি কমিশনার মোঃ শাহাবুদ্দিন খান (বিপিএম-বার) বলেন, করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে যে সকল নির্দেশনা আছে সেগুলো বাস্তবায়নে ইতিমধ্যে আমাদের প্রত্যেকটি সদস্যকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তাছাড়া প্রতিনিয়ত এ ব্যাপারে ব্রিফ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে কমিউনিটি লেভেলে মিটিং, স্কুল ভিজিট প্রোগ্রাম বন্ধ রাখা হয়েছে। এছাড়া বড় কোন জমায়েত, বিনোদন পার্ক, সামাজিক রাজনৈতিক কর্মকা- বন্ধে নিয়মতি মনিটরিং করছি আমরা।’ আমাদের প্রতিটি সদস্যকে বিশেষ করে প্রত্যেকটি থানায় প্রতিনিয়ত ব্রিফ করা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার পুলিশ সদস্যদের একান্ত প্রয়োজন ব্যতীত ছুটি দিচ্ছিনা, যারা গেছেন ছুটিতে তাদেরকে ছুটি বাড়িয়ে দিচ্ছি, যদি ছুটি থেকে কেউ ফিরে আসে তাহলে তাদেরকে আইসোলেশনে পাঠানো হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রত্যেকটি থানায় হ্যান্ড স্যানিটাইজেশন ও হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া বিদেশ ফেরত প্রবাসীদের তথ্য সংগ্রহ করার সময় প্রত্যেক সদস্যকে করণীয় বিষয়ে পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে। বিশেষ করে প্রবাসীদের বাড়ি গিয়ে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা, মাস্ক ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক। তবে বিদেশ ফেরত লোকজনকে হোম কোয়ারেন্টাইনে নেয়ার দরকার হলে বা পরিস্থিতি সে রকম হলে অর্থাৎ ফিজিক্যালি যদি তাদেরকে কোয়ারেন্টাইনে আনতে হয় তাহলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি শফিকুল ইসলাম বলেন, এই সংকট মোকাবেলায় সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রবাস ফেরতদের হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করার অনুরোধ করা হবে। কেউ যদি হোম কোয়ারেন্টাইন অমান্য করেন তাদের নির্দেশ মানতে বাধ্য করা হবে।