ঢাকা বুধবার, ১২ মে ২০২১

Motobad news

বরিশালে অতিমাত্রায় শব্দ দূষণ, বিষিয়ে তুলছে নগর জীবন

বরিশালে অতিমাত্রায় শব্দ দূষণ, বিষিয়ে তুলছে নগর জীবন

বরিশাল নগরীতে শব্দ দূষণের মাত্রা ভয়াবহ হয়ে উঠছে। হাইওয়ে সড়ক, নগরীর বিভিন্ন অলিগলি এমনকি আবাসিক এলাকাগুলোতেও হচ্ছে উচ্চমাত্রার শব্দদূষণ। শব্দদূষণ রোধে জনসচেতনতা তৈরিতে বরিশাল নগরের বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্কুল-কলেজের পাশে নেই জোরে হর্ন বাজানো এবং মাইক বাজানো নিষেধ-সংবলিত সাইনবোর্ড। বিয়ে, পিকনিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কিশোর গ্যাঙের ডিজে পার্টি, বারবিকিউ পার্টি, জন্মদিন উৎসবসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের লাউড স্পিকারের কানফাটানো শব্দে দিনদিন শব্দ দূষণ বাড়ায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে বরিশালের নগরবাসী। এ-সংক্রান্ত আইন সম্পর্কে জানা না থাকার ফলে আবার জানালেও তা কেউ মানছে না। আবার নেই আইনের প্রয়োগও।

পিকনিক আয়োজনের ক্ষেত্রে  নির্ধারিত নীতিমালা থাকলেও তার তোয়াক্কা করছেনা কেউই। কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে পিকনিক আয়োজন করতে হবে আবাসিক এলাকা থেকে অন্তত এক কিলোমিটার দূরে নির্ধারিত স্থানে এবং সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫ টা পর্যন্ত মাইক ও লাউড স্পিকার ব্যবহার করার বৈধতা রয়েছে এবং রাত দশটার মধ্যে এসব অনুষ্ঠান অবশ্যই শেষ করতে হবে। এসব অনুষ্ঠানের  ক্ষেত্রে শব্দের মাত্রা অতিক্রম না করে - এমন যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে মর্মে নীতিমালাও রয়েছে। কিন্তু বরিশাল নগরী এই আইনের সম্পূর্ণ বিপরীত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় শহরের অলিগলি ও আবাসিক এলাকায় সন্ধ্যা রাত থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত চলে উচ্চ শব্দে হিন্দি, মুজরা, ইংরেজীসহ বিদেশী সংস্কৃতির গান।

নগরীর রূপাতলী আবাসিক এলাকার বাসিন্দা এনামুল হক জানান, গত ১৭-১৮ ই এপ্রিল তার বাসার এক পাশে বিবাহ অনুষ্ঠান অপর পাশে সুন্নতে খৎনার অনুষ্ঠান উপলক্ষে টানা দুই দিন রাত ২ টা পর্যন্ত হাই ভোল্টেজের সাউন্ডবক্সে গানবাজনা চলছিল। অথচ এটি একটি আবাসিক এলাকা।
 এনামুল হক আরো জানান, ঘটনার পরের দিন ছিল ৪১ তম বিসিএস পরীক্ষা। এখানে অনেক শিক্ষার্থী থাকে। শুধু তাই নয় অনেক অসুস্থ, বৃদ্ধ থাকতে পারে। তাছাড়া গভীর রাত পর্যন্ত উচ্চশব্দে সাউন্ডবক্স চললে শিশুদের কি অবস্থা হয়? প্রশ্ন করেন তিনি।

এসব অনুষ্ঠানে আইন মেনে সহনীয় মাত্রায় মাইক, সাউন্ডবক্স ব্যবহার করা হলে দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য ঝুঁকি থেকে রক্ষা পাবে নগরবাসী। তাই আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধি ও নজরদারির আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন নগরবাসী।  নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শব্দদূষণের ফলে বৃদ্ধ ও শিশুদের হৃদরোগ ও শ্রুতিহীনতার মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

২০২০ সালের এক জরিপে জানা গেছে বাংলাদেশে শব্দ দূষণের কারণে অনেক মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস পেয়েছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ৬০ ডেসিবেলের অধিক শব্দ যদি দীর্ঘসময় ধরে থাকে তাহলে সাময়িক বধিরতা আর ১০০ ডেসিবেলের বেশি হলে স্থায়ী বধিরতা (Permament Deafness) হতে পারে। 

বাংলাদেশে শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালায় স্পষ্ট বলা আছে কোন এলাকায়, দিনের কোন সময়ে, কি ধরনের শব্দ দূষণ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। সাউন্ডবক্স, মাইকের ব্যবহার, গাড়ির হর্ন, নির্মাণকাজ কোন ক্ষেত্রেই শব্দ দূষণ বিষয়ে যেসব নিয়ম রয়েছে তা মানা হচ্ছে না। যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় রাত ৯ টা থেকে ভোর ৬ টা পর্যন্ত শব্দের মাত্রা ৪৫ ডেসিবেল এবং দিনের অন্য সময়ে ৫৫ ডেসিবেল অতিক্রম করতে পারবে না। বাণিজ্যিক এলাকায় তা যথাক্রমে ৬০ ও ৭০ ডেসিবেল। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালতের আশপাশে ১০০ মিটার পর্যন্ত নীরব এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে রাতে ৪০ ও দিনে ৫০ ডেসিবেল শব্দ মাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া আছে। কিন্তু বরিশাল নগরীতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়ছে শব্দদূষণ। আবাসিক এলাকাতেই শব্দ দূষণের মাত্র বেশি লক্ষ্য করা গেছে।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আঞ্জুমান আরা রজনী বলেন, বরিশাল নগরীতে আমি নিজেও এই সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি।  দিনরাত হাই ভোল্টেজে গান-বাজনার কারণে অনলাইনে ঠিকভাবে ক্লাস নিতে পারছিনা।  স্কুল-কলেজের আশেপাশেও গান-বাজনা চলতে থাকে কিন্তু কোন প্রতিকার নেই। হাই ভোল্টেজের কারণে কানের পর্দা ফেটে যেতে পারে, উচ্চ রক্তচাপের রোগীর বমির উপক্রম হতে পারে, হার্টের রোগী হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। এ বিষয়গুলো আমাদের এখনই খেয়াল করা উচিত। এক্ষেত্রে তরুণদের বেশি এগিয়ে আসতে হবে। তরুণদের এ ব্যাপারে সচেতন করে তুলতে স্বেচ্ছাসেবকরাও ভূমিকা পালনা করতে পারে। আর নগর কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই গুরুত্বের সাথে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে।

বরিশাল জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দীন হায়দার জানান, "শহরে প্রচুর শব্দ দূষণ হচ্ছে। এ ব্যাপারে পুলিশ কমিশনারসহ আমরা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সিটি কর্পোরেশনের সাথে আলোচনা করেছি। দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার জন্যও বলেছি। আমরা চেষ্টা করছি শব্দ দূষণ রোধে কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে।"
এ বিষয়ে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মোঃ ফারুক বলেন, সিটি আইন দেখে মাননীয় মেয়র মহোদয়ের সাথে কথা বলে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়াও জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সচেতনতামূলক প্রচারণা, স্কুল-কলেজের সামনে সাইন বোর্ড স্থাপনের আশ্বাস দেন তিনি। 
ওদিকে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক কামরুজ্জামান শব্দদূষণ নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
 


/ইই