ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০২১

Motobad news

সার্বভৌম সম্প্রীতির বাংলাদেশ চাই

সার্বভৌম সম্প্রীতির বাংলাদেশ চাই

স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে এসেও ধর্মোন্মাদ কিছু মানুষ আজও সাম্প্রদায়িক পাকিস্তানি রাষ্ট্রদর্শন ও চিন্তাচেতনা থেকে মুক্ত হতে পারেনি। এরাই বারবার ধর্মের দোহাই দিয়ে নিপীড়ন করেছে চিরকালের চেনা প্রতিবেশী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে, লুটপাট করছে, ধর্ষণ করছে, খুন করেছে। নির্বিবচারে খুনের ভয় দেখিয়ে দেশ থেকে দেশান্তরে  নির্বাসনে পাঠাচ্ছে মুক্তমনা ও প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবি, লেখক, কবি ও শিল্পীকে। অপমান অপদস্থ করেছে বাংলার সহজিয়া মরমিয়া আউল-বাউলকে। এ বিষ যেন এক ছাই চাপা সাম্প্রদায়িক আগুন! যা ভেতরে ভেতরে জ্বলছে। ঠুনকো অজুহাতেই যেন আজকাল দাউদাউ জ্বলে উঠছে এই আগুনের দাবানল। আজকের এই সন্ত্রাসীরা মনে হচ্ছে, একাত্তরের সেই পাকিস্তানী সৈন্যদের মতোই  জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিতে উদ্ধত হচ্ছে চিরচেনা সম্প্রীতির এই দেশ ও সমাজ।

বলা বাহুল্য যে, ১৯৭১-সালে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ তৈরি হওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই, আবার স্বাধীনতা বিরোধী এদেশীয় শত্রুদের চক্রান্তে দেশের ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি ক্রমেই দুর্বল হতে শুরু করেছিল। ১৯৭২-সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সংবিধানে প্রণীত ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িক নীতির সর্বনাশ, পঁচাত্তরে সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছিল। এরপর বাংলাদেশের শান্তি, সমৃদ্ধি এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার উল্টো পথের যে অসৎ যাত্রা শুরু হয়েছে, সেই অশুভ যাত্রার বুলডেজার যেন আজও থামেনি। এক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তাঁর সেক্যুলার স্বাধীন বাংলাদেশে গড়ার স্বপ্ন ও মৌলিক পরিবর্তন এবং সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠনের জঘণ্যতম কাজটিÑ সর্বপ্রথম ঘটেছিল, তৎকালীন সামরিক বাহিনীর প্রধান এবং পরবর্তী সময়ের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে (১৯৭৭-১৯৮১)।

তখন পাকিস্তানী প্রেতাত্মা জিয়াই বাংলাদেশের সংবিধানে কোরআনের বাণী ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’ সংযোজন করে এদেশের ভাগ্যে আসাম্প্রদাকি তকমার পেরেকটি এঁটে দিয়েছেন। এরপরে, জিয়াউর রহমানের কাঙ্খিত ইসলামী ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের ধর্মানিরপেক্ষতাকে পুরোপুরি আরও পাকিস্তানী করে তোলেন,  তৎকালীন আরেক সামরিক শাসক বাংলাদেশের স্বৈরাচারী রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিরি ১৯৮৮ সালে সাংবিধানিক এক সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করেন। এই ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে মুসলমান কর্তৃক হিন্দুসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর উপর অত্যাচার উৎপীড়ন মাত্রা তীব্রতর হয়। কেননা, তার শাসনামলেই ভারতের উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায় 'রাম মন্দির' বিতর্ককে কেন্দ্র করে ১৯৮৯-সালেই এদেশে আবার পুরোদ্দমে হিন্দু বিরোধী আগ্রাসন শুরু হয়।

ভারত বিভক্তির ২৪-বছর পর দ্বিজাতিতত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করে জন্ম হয়েছিল এই স্বাধীন স্বার্ভভৌম বাংলাদেশ। সেই স্বাধীন দেশের বুকে তখন থেকেই আবার বৃহৎ পরিসরে হিন্দুদের মন্দির ধ্বংস ও তাদের উপর নির্যাতনের ট্রায়েল আরও বেড়ে যায়। ১৯৯০-সালের ২৯-অক্টোবর, বাংলাদেশের ইসলামী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী পোষ্য সংবাদপত্র 'দৈনিক ইনকিলাবের' শিরোনামে ছাপা হয় “ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে বাবরি মসজিদ” ফলে সমগ্র বাংলাদেশ ব্যাপী বাবরী মসজিদ ধ্বংসের গুজব রটানোর ফলে ব্যাপকহারে বাংলাদেশের হিন্দুদের উপর অবর্ণনীয় অত্যাচারের খড়্গ নেমে আসতে থাকে।

 ১৯৯০-সালে বাবরী মসজিদ ধ্বংসের প্রতিবাদে বাংলাদেশের কিছু সন্ত্রাসী মুসলিম জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে সংখ্যালঘু অত্যাচার শুরু হলেও, ১৯৯৩-সাল পর্যন্তই এর ধারাবাহিকতা চলতে থাকে। ফলে, সেই থেকেই এদেশের অনেক অঞ্চলই হিন্দু শুন্য হয়ে যেতে থাকে এবং বহুস্থানের হিন্দুরা বাস্তচ্যুত দিশেহারা হয়ে পড়েন। চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর হিন্দুরা সহায়-সম্বল, বাড়ি-ঘর সব হারিয়ে পাহাড়ের উপর কৈবল্যধাম মন্দিরের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় গ্রহণ করে বেঁচেছিল। ভোলা জেলার দৌলতখান উপজেলার চরপাতা ইউনিয়নের নলগোড়া গ্রামের সাধু সিংয়ের বাড়িতে যেসব পরিবার ছিল তারা সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের শিকার হয়ে ভারতে পাড়ি দিয়ে জীবন ও সম্মান রক্ষা করে। ১৯৯০ ও ১৯৯২ সালের সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের শিকার হয়ে ভোলা জেলার হাজার হাজার হিন্দু তখন দেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারত চলে যায়। সারাদেশ ব্যাপী অনেক হিন্দু জীবনের নিরাপত্তার জন্য তাদের জায়গা, সম্পত্তি, বাড়ি-ঘর ছেড়ে ভারতে আশ্রয়ের জন্য পালিয়ে চলে গেছে।

এখানেই এই ইতিহাসের শেষ নয়, সংখ্যালঘু নির্য়াতনের তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, বিএনপি-জামায়াত ৪ দলীয় জোট সরকারের (২০০১-২০০৬) ক্ষমতায় আসার পরপরই দেশের সংখ্যালঘুদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালানো হয়েছিল। বিভিন্ন স্থানে বিএনপি-জামায়াত ক্যাডাররা নারী ধর্ষণ, সংখ্যালঘুদের জায়গা জমি দখল, লুটতরাজ, খুন, হত্যাসহ নানা অপকর্মে মেতে উঠেছিল। এ-সময়ও জান বাচাঁতে অনেক সংখ্যালঘু বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যায়। তবুও, ইতিহাসের জঘণ্যতম এই বর্বরতার রেশ কিন্তু আজও থামেনি। এখনো বছর বছর ছুটছে তো ছুটছেই ধর্মোন্মাদনার পাকিস্তানী ষাঁড়। ফলে ধর্মের নামে এদেশের ইসলামভিত্তিক মৌলবাদী রাজনৈতিক সংগঠন ও তাদের ইন্দনদাতাদের কৌশলী অর্গানাইজড ব্রুটাল ক্রাইম চলছেই। সামান্য উসকানি পেলেই যেন এরা তাদের ধর্মভিত্তিক পশুত্বের আগুন চারদিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

ছাইয়ের নিচের জ্বলজ্বলে সে আগুন, যা একটু ফুঁ দিলেই আবার জ্বলে উঠছে। আর তাতেই পুড়ছে বাংলাদেশ, মানচিত্র, মা ও মাটির বুক। এই নিভন্ত ছাইয়ের তাওয়ায় বাতাস দেওয়ার লোকেরও অভাব নেই। এই আগুনের লেলিহান শিখায় মানুষ, ঘরবাড়ি, মন্দির, পেগোডা আর পাঠাগারের পাশাপাশি আমাদের জীবন, স্বাধীনতা, সভ্যতা, কৃষ্টি এবং শিল্প-সাহিত্যও পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। মৌলবাদী সন্ত্রাস তো একে  আগেও ঘটেছে যেমন, কক্সবাজারের রামুতে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে, সুনামগঞ্জের শাল্লায়। অতি সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কুমিল্লায় নানুয়ার দীঘির পারের পূজাম-পে দেবতার কোলে ‘কোরআন’ পাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে, যে খান্ডবদাহন শুরু হয়েছে, তা নোয়াখালী, বাগেরহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, কুড়িগ্রাম, গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ, মাদারীপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের মন্দির ও হিন্দুদের বাড়িঘরে ভাঙচুর এবং হামলার মাধ্যমেই ঘটে চলেছে। যে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতার আগুনে গত রোববার (১৭.১০.২০২১) রাতে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের মাঝিপাড়া, বটতলা ও হাতীবান্ধা গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের বাড়ি-ঘর। রাতের আঁধারে চলেছে লুটপাট, পৈচাশিক ধর্ষণ ও নৈরাজ্য।

এ সবই হচ্ছে স্রেফ ধর্মকে ব্যবহার করে, সাধারণ মানুষের মধ্যে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে। এ অবস্থার ভয়াবহতা সমূহ বিপদজনক এবং সর্বনাশা এক খেলায় মেতে উঠেছে এদেশের ধর্মান্ধ মানুষের আবেগ। আর এ উন্মাদনা বরাবরই সৃষ্টি করছে কতিপয় রাজনৈতিক দল এবং এই নৈরাজ্যকে পুঁজি করে লাভবান হচ্ছে আমাদের নষ্ট রাজনৈতিক নেতারা। তাই, ধর্মকে উপজীব্য করে আমাদের সম্প্রীতি বিনষ্টের রাজনীতি যারা করছেন, সেই ষড়যন্ত্রকে রুখতে আমাদের সকলকেই একাট্টা হয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

কেননা, উগ্র মৌলবাদীদের জান্তব আক্রোশ হিংস্রতায় জর্জরিত প্রত্যেক ঘটনার সাথে কত অশ্রুপাত, আর্তনাদ, কত যে নীরব বেদনা জড়িত আছে? আমরা যেন সে উপলব্ধির বিবেক যন্ত্রণায় বিদ্ধ হয়ে উঠি বিবেকবান প্রত্যেকেই। তবেই হয়তো, আবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে আমাদের সার্বভৌম সম্প্রীতির এই বাংলাদেশ।  

 

লেখক : কবি এবং দৈনিক মতবাদ এর যুগ্ম সম্পাদক।

 


এমবি