ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০২১

Motobad news

একজন অপরাজিত রাজনীতিক এবায়দুল হক চাঁন

একজন অপরাজিত রাজনীতিক এবায়দুল হক চাঁন
এবায়দুল হক চাঁন


বরিশাল বিএনপি’র রাজনীতিতে একজন অগ্রনায়কের নাম বীর মুক্তিযোদ্ধা এবায়দুল হক চাঁন। যিনি দলের পেছনে হারিয়েছেন জীবন জৈবন। ১৯৬৯ থেকে এযাবৎ কঠোর পরিশ্রম আর মেধা ভিত্তিক রাজনীতি তাকে পৌঁছে দিয়েছে দক্ষ সংগঠকের উচ্চ শেখরে। ছাত্র রাজনীতি থেকে শুরু করা এবায়দুল হক চাঁন এখন হয়েছেন কেন্দ্রীয় নেতা।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নিজেকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রেখে ক্লিন ইমেজের রাজনীতিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন এবায়দুল হক চাঁন। এজন্য পুরস্কার সরুপ দলের অনেক সাংগঠনিক পরিচয় বহন করেছেন নামের আগে। তবে দলীয়ভাবে জনপ্রতিনিধিত্বের সুযোগ পাননি তিনি। তাই জীবনের শেষ বয়সে এসে রাজনীতিতে প্রাপ্তি আর প্রত্যাশার হিসাব-নিকাশের সময় এসেছে তাঁর।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন নিয়ে দৈনিক মতবাদ এর সাথে একান্তে আলাপ করেন বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপি’র সদ্য সাবেক সভাপতি এবায়দুল হক চাঁন। জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত রাজনৈতিক জীবনের নানান স্মৃতি কথা।

জানা গেছে, ‘বরিশাল নগরীর উত্তর আমানতগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা এবায়দুল হক চাঁন রাজনীতির পাশাপাশি একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। নগরীর সদর রোডস্থ অভিউরিসি সিনেমা হল এবং কমপ্লেক্সের মালিক তিনি। দেশে স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে থেকেই রাজনীতিতে জড়ান চাঁন। অনেক হত্যাচার-নির্যাতনও সহ্য করতে হয়েছে তাকে।

এবায়দুল হক চাঁন জানান, ‘মূলত ১৯৬৯ সালে স্কুল জীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ওইসময় তিনি যখন বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) স্কুলে ১০ম শ্রেণির ছাত্র তখন স্কুল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পরবর্তী ৭০ সালে বরিশাল কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তখন তিনি বরিশাল কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র।

এবায়দুল হক চাঁন বলেন, ‘১৯৭১ সালে দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। আমিও সেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেই। আমার বাড়ির পার্শ্ববর্তী আমানতগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ি থেকে পুলিশের দুটি অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছি। মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিয়েছি ভাষানচরে। সেখানে পুলিশ এবং আপিআর লোক ছিলেন।
ইতিহাস তুলে ধরে চাঁন বলেন, ‘তালতলি দিয়ে পাকিস্তানি আরমিরা বরিশাল শহরে প্রবেশের চেষ্টা করে। আমরা খবর পেয়ে গোপনে সেখানে যাই। আরমিরা শহরে প্রবেশের চেষ্টা করলে আমরা গুলি করি। কিন্তু তখন প্রশিক্ষণ ছিলো না, তাই কাউকে আঘাত করতে পারিনি। তখন আর্মিরাও পাল্টা গুলিছুড়লো। তবে সেদিন আর আর্মিরা শহরে প্রবেশ করতে পারেনি। তারা চরবাড়িয়া হয়ে প্রতাপপুরে আর্মি ক্যাম্পে চলে যায় এবং পরদিন শহরে প্রবেশ করে।

একইভাবে নাজিরের পুলিশেও আমরা আরমিদের ওপর আক্রমণ করেছিলাম। সেখানে আমি এবং আমার বন্ধু গিয়াস উদ্দিন ছিলেন। তখন আর্মিরাও ফাঁকা গুলি করে। আমরা ব্রিজের পাশেই শুয়ে থেকে আত্মগোপন করেছিলাম। তাই আমাদের না পেয়ে তারা চলে যায়। অবশ্য সেদিন একটি রাইফেল হারিয়ে ফেলতে হয়। এরপর আমি ও আমার বন্ধু গিয়াসউদ্দিন ভাষান চরে চলে যাই। সেখানে মুক্তিবাহিনী গঠন করি।

রাজনৈতিক জীবনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরে এবায়দুল হক চাঁন বলেন, ‘দেশ স্বাধীনের পরে ১৯৭৮ সালে জগো দল গঠন হয়। ওই দলের বরিশাল জেলার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হন আব্দুর রহমান বিশ্বাস। সেই জেলা কমিটির সদস্য ছিলাম আমি। স্বাধীনতা পরবর্তী এটিই ছিলো রাজনৈতিক দলের প্রথম পদ। বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমানকে হত্যার পরে বরিশালে যে গায়েবী জানাজা হয় সেটার আয়োজকও ছিলাম আমি। বর্তমান ঈদগাহ ময়দানের ওখানে গায়েবী জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

এরপর যখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গঠিত হয় তখন দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হন আব্দুর রহমান বিশ্বাস। আর আমি বরিশাল শহর যুবদলের সভাপতি এবং বরিশাল দক্ষিণ জেলা যুবদলের সদস্য হিসেবে নেতৃত্ব শুরু করি। ১৯৮২ সালে এরশাদ মারশালের সময় আমিসহ চারজনকে ধরে নিয়ে যায় আর্মিরা। তারা তিনজনকে কারাগারে পাঠালেও আমাকে জেলখানায় আটকে রেখে টানা ১৩-১৪ দিন নির্মমভাবে নির্যাতন করেন। কি অপরাধে আমাকে ধরে নিলো সেটা আমার জানা ছিলো না। তবে আর্মিরা আমাকে নির্যাতনের সময় শুধু বলতো অস্ত্র কোথায়।

তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশের একজন এডিসনাল এসপি সার্কেট হাউজে আর্মি ক্যাম্পে এসে আমার সাথে কথা বলেন। তাকে দেখে বুঝতে পারি হয়তো আমাকে কারাগারে না পাঠিয়ে থানায় আটকে রেখে নির্যাতনের বিষয়ে হয়তো কোন তদন্তের জন্য এসেছেন তিনি। আমাকে আটকে রাখার কারণ জানতে চান ওই কর্মকর্তা। আমি তাকে একই উত্তর দিয়েছি যে, আমি কিছু জানি না। পরে পুলিশের সেই কর্মকর্তার হাতে একটি কাগজ দেখতে পাই। সেখানে আমার নামের সামনে মজিবর রহমান সরোয়ারের নামটি লেখা দেখি। তখন মজিবর রহমান সরোয়ার টেক্সটাইল শ্রমিক নেতা। সেই কাগজটি দেখেই বুঝতে পারি আমাকে কেন আটকে রেখে এমন নির্যাতন করা হয়। অবশ্য পুলিশের ওই কর্মকর্তা চলে যাবার পরে আর্মির মেজর আমাকে ছেড়ে দেয়ার জন্য থানার ওসিকে নির্দেশ দেন। এরপর দিন আমি ছাড়া পাই।

চান বলেন, ‘দেশে ঘরোয়া রাজনীতি শুরু হলো। বেগম খালেদা জিয়া তখন প্রথম বরিশালে আসেন। তাকে নিয়ে আমরা একে স্কুলের পাশে একটি কক্ষে মিটিং করি। সেই মিটিংয়ের আয়োজনেও ছিলাম আমি। এরপর ঢাকায় যাই সমাবেশ করতে। ওইসময় আওয়ামী লীগ থেকে আমাকে অনেকবার প্রস্তাব দিয়েছিলো তাদের সাথে যেতে। কিন্তু আমি বিএনপিকে ছাড়িনি। তখনকার সময়ের নামকরা সাগর লঞ্চ ভাড়া করে আমি লোকজন নিয়ে ঢাকায় যাই। আমাদের অবস্থানের জন্য জায়গা নির্ধারণ করা হয় ভাষানি মিলনায়তনে।

এবায়দুল হক চাঁন আরও বলেন, ‘যুবদলের রাজনীতি শেষ করে মুল দলের রাজনীতি শুরু হয়। ১৯৯২ সালে বরিশাল কোতয়ালী বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক এর দায়িত্ব পাই। সেখান থেকে পরবর্তী ১৯৯৮ সালে বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক করা হয় আমাকে। তখন ওই কমিটির সভাপতি ছিলেন মজিবর রহমান সরোয়ার। পরে ২০১৩ সালে আমাকে দক্ষিণ জেলার সভাপতি ও মজিবর রহমান সরোয়ারকে মহানগর বিএনপি’র সভাপতি করা হয়।

চাঁন বলেন, ‘রাজনৈতিক জীবনে দক্ষতা এবং যোগ্যতার কারণে দল থেকে অনেক রাজনৈতিক পরিচয় পেয়েছি। কিন্তু দলীয়ভাবে মনোনিত হয়ে জনপ্রতিনিধির সুযোগ আসেনি। মনোনয়ন চাইলেও বঞ্ছিত হয়েছি। অবশ্য ২০০৩ সালে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন গঠিত হওয়ার পরে মেয়র পদে নির্বাচন করেছিলাম। তখন দলীয় মনোনয়নের সুযোগ ছিল না। ওই নির্বাচনে ২৪ হাজার এবং পরবর্তী ২০০৮ সালের নির্বাচনে ২৬ হাজার ভোট পেয়েছিলাম।
এবায়দুল হক চাঁন বলেন, ‘আমি জিয়াউর রহমান এবং বিএনপিকে ভালোবাসি বলেই এই দলের সাথে আছি। দীর্ঘ জীবন পার করেছি বিএনপি’র পেছনে। কখনো কিছু পাইনি বলে মুখ ফিরিয়ে নেইনি। সম্প্রতি বরিশাল জেলা ও মহানগর বিএনপি’র আহŸায়ক কমিটি ঘোষণা করেছে কেন্দ্র। সেখানে নবীন-প্রবীনদের সুযোগ দেয়া হয়েছি। এতে আমি অখুশি নই। দল যেটা ভালো মনে করেছি সেটাই করেছে। তাছাড়া আমাকে জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য বানিয়ে সম্মানিত করেছে। এজন্য আমি দলের প্রতি কৃতজ্ঞ। আমি পূর্বে বিএনপি’র সাথে ছিলাম, এখনো আছি এবং ভবিষ্যতেও থাকবো।
 


এসএম