ঢাকা রবিবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২২

Motobad news

নলছিটি পৌরসভা যেন টর্চার সেল!

নলছিটি পৌরসভা যেন টর্চার সেল!

ঝালকাঠির নলছিটি পৌরসভায় নিয়ম নিতীর যেন বালাই নেই । মেয়র ও কাউন্সিলরা ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে যা খুশি তাই করে যাচ্ছে। প্রকাশ্য অফিস কর্তৃপক্ষকে মারধর, আত্নীয়দের কাজ পাইয়ে দেয়া, সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষদের সাথে দুর্রব্যবহার করাটা প্রতিদিনের রুটিন হয়ে দাড়িঁয়েছে তাদের। এক প্রকার সেবার নামে পৌর সভাটিকে অনিয়মের আখড়ায় পরিণত করেছেন ঐ জনপ্রতিনিধিরা।  তাদের  এই কর্মকান্ড থেকে প্রতিকার চেয়ে একাধিক ভুক্তভোগী  সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছে। এর প্রেক্ষিতে অধিকাংশ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করাও হয়েছে।  বর্তমানে ঐ তদন্ত কমিটি তাদের কার্যক্রম চলমান রেখেছেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বিকার করেছে পৌর মেয়র ও অভিযুক্ত কাউন্সিলররা। তাদের দাবী পৌর সভার কাউন্সিলদের মধ্যে একটি গ্রুপ এ ধরনের মিথ্যাচার করে বেড়াচ্ছে। 

সম্প্রতি পৌর সভার উপ-সহকারি জিয়াউল হাসান (মুরাদ)কে মারধর করেছে  পৌর সভার প্যানেল মেয়রসহ তিন কাউন্সিলর। 

এ ঘটনায় হামলাকারিদের শাস্তি  চাওয়াসহ অন্যথায় বদলী চেয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবরে লিখিত আবেদন করেছেন হামলার শিকার হওয়া উপ সহকারি জিয়াউল হাসান (মুরাদ)। 

তিনি  লিখিত আবেদনে উল্লেখ করেন, গত বছরের ১৫ নভেম্বর বেলা ১১ টার দিকে করোনা মোকাবেলার উপ খাতের বরাদ্দকৃত ১ রাখ ৭৫ হাজার টাকা এবং ডেবলপমেন্ট’র  ২৭ লক্ষ টাকা জিওসহ বিভিন্ন বিলের টাকা দাবী করে পৌর সভার প্যানেল মেয়র পলাশ তালুকদার, কাউন্সিলর রেজাউল চৌধুরী, মামুন মাহামুদ ও ফিরোজ আলম।  পাশাপাশি এই টাকার চেক তৈরি করতে চাপ সৃষ্টি করে তারা। তাদের চাপে নত স্বিকার না হলে আমার প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। এসময় উপ সহকারি জিয়াউল হাসান মুরাদ (আমাকে) টেনে হিঁচড়ে কাউন্সিলর কক্ষে ও সচিবের রুমে নিয়ে শাররিকভাবে লাঞ্ছিত করে প্যানেল মেয়র পলাশ তালুকদার, কাউন্সিলর রেজাউল চৌধুরী, মামুন মাহামুদ ও ফিরোজ আলম। এ ঘটনা মেয়র আব্দুল ওয়াহেদ খান তার কক্ষে বসে শুনতে পেলেও তিনি ঘটনাস্থলে ছুটে আসেনি। পরে ঘটনার বিষয় মেয়রকে জানানো হলেও তিনি কোন কথা না বলে অফিস রেখে বাড়িতে চলে যায়। 

উপ-সহকারি জিয়াউল হাসান মুরাদ মুঠফোনে জানান, গত বছরের ২৬ জুলাই  পৌর সভার চেক জালিয়াতির অভিযোগে সাময়িক বহিস্কার হলে ১১ আগস্ট মেয়র আমাকে ক্যাশিয়ার পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন। এ কাজে পারদর্শি না, একথা বলা সত্ত্বেও বাধ্য করা হয় অতিরিক্ত দায়িত্ব নিতে। উপ-সহকারী প্রকৌশলী হওয়া স্বত্ত্বেও আমাকে দিয়ে একাউন্ট সেকশনের ক্যাশিয়ার পদের কাজ করানো হয়। পরবর্তিতে অতিরিক্ত দায়িত্ব থেকে ১৪ অক্টোবর অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করি। মেয়র আবেদনটি সচিব আব হেনা রাশেদ ইকবালকে র্মাক করে দেন এবং ব্যবস্থা গ্রহন করার নির্দেশ দেন। কিন্তু সচিব কোন ব্যবস্থা নেয় নি। ফলে কয়েক কাউন্সিলর ক্যাশিয়ারের দায়িত্ব পালন করার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। তিনি আরো বলেন, গত বছরের ১৫ নভেম্বর করোনা মোকাবেলার উপ খাতের বরাদ্দকৃত ১ রাখ ৭৫ হাজার টাকা এবং ডেবলপমেন্ট’র  ২৭ লক্ষ টাকা জিওসহ বিভিন্ন বিলের টাকা দাবী করে চেক তৈরি করতে চাপ সৃষ্টি করে পৌর সভার প্যানেল মেয়র পলাশ তালুকদার, কাউন্সিলর রেজাউল চৌধুরী, মামুন মাহামুদ ও ফিরোজ আলম। কাজ ব্যতীত বিল দেয়া যাবে না, বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করি। কিন্তু কাউন্সিলরা যত টাকার চেক তৈরী করতে বলবো, তখন তত টাকার চেক দিতে হবে” বলে হুমকি প্রদান করে। এক পর্যায়ে তারা উপ সহকারি জিয়াউল হাসান মুরাদ (আমাকে)  টেনে হিচরে চার কাউন্সিলর মিলে সচিবের রুমে নিয়ে শাররিকভাবে  লাঞ্ছিত করে। বাসা থেকে তুলে এনে হত্যার হুমকিও দেয়া হয়েছে। উপ সহকারি বলেন, চার কাউন্সিলর মিলে আমার  সাথে অনেক কিছুই করেছে যা ভাষায় বলা সম্ভব নয়। তাদের ভয়ে আমি পনের দিন পৌর সভায় অফিস না করে পালিয়ে বেড়িয়েছি।  ওই কাউন্সিলরদের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের বিষয়ে মেয়র সবই জানেন। কিন্তু অদৃশ্য কারনে তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি। 

এ কারণে ১৮ নভেম্বর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবরে ঘটনার বর্ণনাসহ অন্যতায় বদলী এবং হামলাকারিদের বিচার দাবী করে লিখিত আবেদন করেছি বলেন উপ সহকারি জিয়াউল হাসান মুরাদ । 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রতিবেদককে একাধীক ভুক্তোভোগীরা বলেন,  মেয়র হিসেবে আব্দুল ওয়াহেদ খান দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই পৌর সভায় নিয়ম উঠে অনিয়মের ওপর শুরু হয় কার্যক্রম। সেবা থেকে প্রতিটি কাজেই এই অনিয়ম চলে আসছে । গুটি কয়েক কাউন্সিলরা ক্ষমতার প্রভাব দেখায়। তাদের কথায় ওঠে বসেন মেয়র। সাধারণ মানুষদের বিভিন্ন সময় তাদের দুরব্যবহারের শিকার হতে হয়েছে । এ কারনে পৌর সভায় সেবা নিতে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে অধিকাংশ পৌরবাসী বলেন তাঁরা। 

অন্যদিকে উপ –সহকারী জিয়াউল হাসান মুরাদকে  মারধরের বিষয় অস্বিকার করে প্যানেল মেয়র পলাশ তালুকদার বলেন, ঘটনার দিন আরো তিন কাউন্সিলর পৌর সভায় ছিলেন। কাউকে মারধর করা হয়নি। তিনি বলেন, কাউন্সিলদের মধ্যে একটি গ্রুপ রয়েছে। এরা পৌর সভার কখনোই ভালো চায় না। বানোয়াট ঘটনা প্রচার করাই তাদের কাজ। 

সূত্রে জানা গেছে, প্যানেল মেয়রের বিরূদ্ধে ৩টি মামলা চলমান রয়েছে । এর মধ্যে ঝালকাঠি অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতে দন্ডবিধি ৩৪২,৩৮৬ ধারায় মামলা নং ৬৩/২০০২। এছাড়া সিআর মামলা নং ৩০৮/২০০০, নির্বাচনী ট্রাইবুন্যাল  মামলা নং-৩ মোকাম ঝালকাঠি ২০২১। দুটি মামলায় তার বিরুদ্ধে সাজা রয়েছে। তবে মামলার বিষয়টি স্বিকার করলেও প্যানেল মেয়র পলাশ তালুকদার দাবী করেন তার বিরূদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার মধ্যে  একটি থেকে খালাস পেয়েছেন । অপর মামলা পূন্য বিচার চলমান। এছাড়া নির্বাচনী মামলাটি চলমান রয়েছে। অপরদিকে কাউন্সিলর রেজাউল চৌধুরি বিরদ্ধে সাইবার ট্রাইব্যুনালে  মামলা রয়েছে , যার মামলা নং -৩৫/২০২১ । বর্তমানে মামলাটি বরিশাল বিচারিক আদালতে বিচারাধীন ও ঝালকাঠি জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট, বিচারিক ২য় আদালতে মামলা নং-সি আর ৪১/২০২১ মামলা রয়েছে জানিয়েছে সূত্রটি। এ বিষয়ে জানতে কাউন্সিলর রেজাউল চৌধুরি মুঠফোনে ফোন দেয়া হলে বন্ধ পাওয়ায় বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।  এদিকে জিয়াউল হাসান মুরাদকে লাঞ্চিতর ঘটনায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপ সচিব মোহাম্মদ ফারুক হোসেন ঐ বছরের ২২ ডিসেম্বর অভিযোগ তদন্ত করে দায়-দায়িত্ব নিধারণপূর্বক জরুরী মতামতসহ প্রতিবেদন প্রেরণের জন্য ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার শাখার উপপরিচালক নির্দেশ প্রদান করেন। এই নির্দেশ পেয়ে চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার শাখা সহকারী কমিশনার মো.তাছবীর হোসেনকে তদন্ত করে সাত কার্য্যদিবসের ভিতর প্রতিবেদন দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। 

তদন্তের বিষয়ে সত্যতা নিশ্চিত করে ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার শাখার উপপরিচালক মো. কামাল হোসেন বলেন, উপ –সহকারী প্রকৌশলী  (সিভিল) নলছিটি পৌর সভা জিয়াউল হাসান মুরাদকে লাঞ্চিত করাসহ বিভিন্ন মাধ্যমে হুমকির অভিযোগের বিষয় তদন্ত চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিবেদনে উঠে আসবে ঘটনার সত্যতা । এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সত্যতা পাওয়া গেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেয়া হবে তা  স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এর বিষয়।  

এ ব্যাপারে নলছিটি পৌর সভার মেয়র আব্দুল ওয়াহেদ খান মুঠফোনে বলেন, উপ সহকারি জিয়াউল হাসান মুরাদকে লাঞ্চিত বিষয় তার জানা নেই। এছাড়া বিভিন্ন প্রশ্নের উওর না দিয়ে চুপ থাকেন পৌর মেয়র আব্দুল ওয়াহেদ খান । 

প্রসঙ্গত, গত বছরের  ১৬ সেপ্টেম্বর নলছিটি পৌরসভার মেয়র, সচিব ও উপ-সহকারী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে  নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এর নির্দেশে তদন্ত করেন ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার শাখার উপ- পরিচালক মো. কামাল হোসেন। সকাল ১০টা থেকে তিনি দুপুর পর্যন্ত অভিযোগের বিষয়ে মেয়রসহ সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য শোনেন। এ সময় তিনি বিভিন্ন কাগজপত্র যাচাই করে দেখেন। গত ২৭শে আগস্ট স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের পৌর-২ শাখায় মেয়র, সচিব ও উপ-সহকারী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ দেন নলছিটি পৌর এলাকার সূর্য্যপাশা গ্রামের ছাইদুর রহমান।  

 


 


এসএম