ঢাকা বুধবার, ১২ মে ২০২১

Motobad news

পাঁচ বছরে নৌ-দুর্ঘটনায় নিখোঁজ ৭০০ মানুষ

পাঁচ বছরে নৌ-দুর্ঘটনায় নিখোঁজ ৭০০ মানুষ

বরিশাল থেকে নারায়ণগঞ্জ আসার পথে ডাকাতিয়া নদীতে কয়েকশ যাত্রী নিয়ে ডুবে যায় এমভি দিগন্ত। ঘটনাটি ঘটে ২০০৪ সালের ১ মে। দুর্ঘটনার কয়েকদিন পর লঞ্চটি শনাক্ত করা সম্ভব হলেও সেটি আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। লঞ্চটিতে চেপে চাঁদপুর থেকে নারায়ণঞ্জে ফিরছিলেন বন্দর উপজেলার বাসিন্দা বাকি বিল্লাহ, যার খোঁজ আজও পাননি তার স্বজনরা। বাকি বিল্লাহর মতো খোঁজ পাওয়া যায়নি আরো শতাধিক যাত্রীর।

ঘটনাটি নিয়ে গতকাল কথা হয় বাকি বিল্লাহর ছেলে আব্দুল মোস্তাফার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ঝড়ের কবলে পড়ে লঞ্চটি ডুবে যায়। কিন্তু সেটি প্রথম দিন শনাক্তই করতে পারেনি উদ্ধারকারী কর্তৃপক্ষ। তিনদিন পর যখন লঞ্চটিকে শনাক্ত করা হলো উদ্ধারকারী জাহাজ এসেও আর লঞ্চটিকে তুলতে পারল না। নিখোঁজই রয়ে গেলেন আমার বাবা।’

২০০৩ সালের ৮ জুলাই চাঁদপুরে মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মোহনায় ডুবে যায় এমভি নাসরীন-১। সরকারি হিসাবে ওই দুর্ঘটনায় ৬৪১ যাত্রীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। বেসরকারি হিসাবে, মরদেহ উদ্ধার হয়েছিল ৮০০-এর বেশি। দেশের ইতিহাসের ভয়াবহতম ওই নৌ-দুর্ঘটনায় নিখোঁজ হন অন্তত দুই শতাধিক যাত্রী। শুধু এমভি নাসরীন দুর্ঘটনা নয়, সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে দেশে এ যাবৎ যতগুলো বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেসব দুর্ঘটনার পর অনেক যাত্রীর খোঁজ আর কখনই পাওয়া যায়নি।

নৌ-পরিবহন অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) তথ্য বলছে, গত ১৬ বছরে দেশে নৌ-দুর্ঘটনায় ৯৪২ জন যাত্রী নিখোঁজ হয়েছেন। এর মধ্যে সর্বশেষ পাঁচ বছরেই নিখোঁজ হয়েছেন ৬৯২ জন। সবচেয়ে বেশিসংখ্যক যাত্রী নিখোঁজের ঘটনা ঘটে ২০১৯ সালে। ওই বছর ১৫১টি নৌ-দুর্ঘটনায় ২৪৪ জন নিখোঁজ হন। এর বাইরে ২০১৬ সালে ১৫ জন, ২০১৮ সালে ১১৮ জন, ২০২০ সালে ২৩৭ জন এবং চলতি বছরের ৩ মে পর্যন্ত দেশে ১৪টি দুর্ঘটনায় ৭৮ জন যাত্রী নিখোঁজ হয়েছেন। আর গত পাঁচ বছরে সারা দেশে নৌ-দুর্ঘটনা হয়েছে ৩৬১টি। এসব দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ৫৪২ জনের। আহত হয়েছেন ৩১৬ জন।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব বলছেন, নৌ-দুর্ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের মাত্র ১০ শতাংশের খোঁজ পরবর্তী সময়ে পাওয়া যায়। বাকি ৯০ শতাংশ নিখোঁজ ব্যক্তি আর কখনো ফিরে আসেন না।

নৌযান দুর্ঘটনার পর যাত্রী নিখোঁজ হওয়ার জন্য মোটা দাগে তিনটি কারণ চিহ্নিত করেছেন বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. মো. হাদিউজ্জামান। তিনি বলেন, প্রথমত নৌযান দুর্ঘটনার পর অনেক যাত্রী সাঁতরে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করেন। তাদের অনেকেই হয়তো জীবন বাঁচাতে সফল হন না। এক্ষেত্রে যাদের মৃত্যু হয় তাদের লাশ দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশে থাকার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু সাঁতার না জানা ব্যক্তিদের লাশ স্রোতের টানে দ্রুত অনেক দূর ভেসে যায়। এ কারণে তাদের খোঁজ পাওয়া যায় না। দ্বিতীয়ত, আমাদের দেশে নৌ-দুর্ঘটনার পরবর্তী উদ্ধার কার্যক্রম দুর্ঘটনাস্থল ঘিরেই পরিচালনা করা হয়। যেসব লাশ এ সীমানার বাইরে চলে যায়, সেগুলো বলতে গেলে নিখোঁজই থাকে। তৃতীয়ত, নৌপথে দুর্ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধার অভিযান কার্যক্রম কেবল একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্তই করা যায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, দুর্ঘটনার ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই উদ্ধার অভিযান শেষ করে দেয়া হয়। এছাড়া নৌ-দুর্ঘটনার পর উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করতে দেরি করার কারণেও নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা বেড়ে যায় বলে মনে করেন তিনি।


তিনি আরো বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত ব্যক্তিদের ট্র্যাকিং করার একটা গাইডলাইন রয়েছে। দুর্ঘটনার প্রায় ৩০ দিন পর্যন্ত আহত ব্যক্তির খোঁজখবর রাখা হয়। কিন্তু নৌপথের জন্য এ ধরনের কোনো গাইডলাইন নেই। নৌপথে দুর্ঘটনা-পরবর্তী উদ্ধার কার্যক্রম ও আহত ব্যক্তিদের জন্য একটি গাইডলাইন তৈরি করা খুবই জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

তবে দুর্ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের সংখ্যাটি এর চেয়ে কম হতে পারে বলে মনে করছেন বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ডুবুরিরা। তারা বলছেন, দুর্ঘটনার পর অনেক যাত্রীর লাশ উদ্ধার অভিযান শেষ করার পর ভেসে ওঠে। তখন স্থানীয়ভাবেই সেই লাশের দাফন কিংবা নিহতের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করে দেয়া হয়। কখনো কখনো এসব ঘটনা সরকারি-বেসরকারিভাবে নথিভুক্ত করা হয় না। আবার এমন দেখা যায়, দুর্ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তি পরে জীবিত ফিরে এসেছেন। সেই তথ্যও পরে সমন্বয় করা হয় না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিখোঁজের ভুয়া তথ্যও নথিভুক্ত করা হয়। এসব কারণে নৌ-দুর্ঘটনায় নিখোঁজদের প্রকৃত তথ্যটি নৌপরিবহন অধিদপ্তরের (এআরআই) তথ্যের চেয়ে কিছুটা কম হতে পারে বলে জানিয়েছেন তারা।

বিষয়টি সম্পর্কে যোগাযোগ করা হলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ ডুবুরি গিয়াস উদ্দিন বলেন, দুর্ঘটনার ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নদীতে ডুবে যাওয়া ব্যক্তির লাশ ভেসে উঠবেই। প্রশ্ন হচ্ছে, লাশটি কোথায় ভেসে ওঠে? যদি দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশেই লাশ ভেসে ওঠে, তাহলে সেটি সহজেই চিহ্নিত করা যায়। কিন্তু দুর্ঘটনাস্থল থেকে অনেক দূরে গিয়ে লাশ ভেসে উঠলে সেটি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আবার নদীতে কয়েকদিন ধরে ভেসে থাকা লাশে পচন ধরলেও অনেক সময় সেটি শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় নিহত যাত্রীর লাশের সন্ধানও পাওয়া যায় না বলে জানান তিনি।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) চেয়ারম্যান কমোডর গোলাম সাদেক বলেন, নৌপথে দুর্ঘটনার পর উদ্ধার অভিযানে কোনো ধরনের ত্রুটি থাকে না। তবে আমাদের প্রথম চেষ্টা থাকে দুর্ঘটনা রোধ করা। এজন্য দেশের নৌপথগুলোকে নিরাপদ রাখতে কাজ করে যাচ্ছি। তার পরও বিচ্ছিন্নভাবে কিছু দুর্ঘটনা ঘটছে। এগুলো ঘটছে মূলত নৌযানের মালিক-চালক ও যাত্রীদের অসচেতনতার কারণে। আজকের (গতকাল) দুর্ঘটনার কথাই যদি বলি, বাংলাবাজার-শিমুলিয়া ঘাট দিয়ে জরুরি প্রয়োজনে যাত্রী পারাপারের জন্য ফেরি সার্ভিস চালু থাকা সত্ত্বেও যাত্রীরা স্পিডবোটে নদী পার হওয়ার চেষ্টা করেছে। নিরাপদ ফেরি সার্ভিস থাকার পরও যাত্রীরা ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও অবৈধভাবে স্পিডবোটে উঠেছে। তিনি বলেন, আমরা সবাই যদি সচেতন না হই, তাহলে যতই অভিযান পরিচালনা করা হোক না কেন, অবৈধ স্পিডবোট চলাচল বন্ধ করা সম্ভব নয়।


টিএইচএ/