ঢাকা শুক্রবার, ১৮ জুন ২০২১

Motobad news

এক সব্যসাচী মানবসেবক ডাঃ আনোয়ার হোসেন

এক সব্যসাচী মানবসেবক ডাঃ আনোয়ার হোসেন

গল্পটি এক নায়কের। সে নায়ক কোন সিনেমার নায়ক নন, তিনি হলেন বাস্তব জীবনের নায়ক এক সব্যসাচী মানবসেবক। এই নায়কের নাম ডাঃ আনোয়ার হোসেন। সময়টি ছিল ১৯৬৫ সালের ৫ জুন। ঝালকাঠি জেলার বিনয়কাঠি ইউনিয়নের নাক্তা গ্রামে আজাহার আলী ও হালিমা বেগমের ঘর আলোকরে জন্ম নেন তাদের দ্বিতীয় সন্তান আনোয়ার হোসেন। ১০ ভাইবোনের বিশাল সংসারের সকল ভাইবোনকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাটাই ছিলো যার বিশাল চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জে সাফল্যের সাথে জয়ী হন আজাহার আলী এবং হালিমা খাতুন, যার ফলশ্রুতিতে পরবর্তীতে বরিশালবাসী পায় ডাঃ আনোয়ার হোসেনের মতো এক ক্ষণজন্মা সমাজসেবককে।


ছেলেবেলায় মানাপাশা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে পার্শ্ববর্তী সুগন্ধিয়া হাইস্কুল থেকে ১৯৮১ সালে কৃতিত্বের সাথে এস এস সি পাশ করেন আনোয়ার হোসেন। এরপর সরকারী ব্রজমোহন কলেজে একাদশ শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। রোদ-বৃষ্টি-ঝড় পেরিয়ে বাড়ি থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে বিএম কলেজে গিয়ে অধ্যয়ন করে ১৯৮৩ সালে কৃতিত্বের সাথে এইচ এস সি পাশ করেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় নিজের মেধার পরিচয় দিয়ে বুয়েট ও মেডিকেল দুটো প্রতিষ্ঠানেই অধ্যয়নের সুযোগ পান। পরবর্তীতে তার বাবার ঐকান্তিক ইচ্ছায় বরিশাল মেডিকেলে ভর্তি হয়ে অধ্যয়ন করতে থাকেন। শুরু হয় পরবর্তী জীবনের মহাযাত্রা। 


আনোয়ার হোসেন ছিলেন বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের ১৪ ব্যাচের শিক্ষার্থী। এমবিবিএস পাস করে ইন্টার্ন করার সময় তিনি সান্নিধ্যে আসেন প্রখ্যাত সার্জন ডাঃ সানোয়ার হোসেনের। সরকারি চাকুরির ইচ্ছা কখনোই ছিলো না ডাঃ আনোয়ার হোসেনের। বরাবরই লক্ষ্য ছিলো স্বাধীনভাবে চিকিৎসাসেবা প্রদান করার। সেই লক্ষ্য নিয়েই বাংলাবাজারের পলি ক্লিনিকে একটি চেম্বার নিয়ে শুরু করেন স্বাধীনভাবে চিকিৎসা সেবাদান। অমায়িক ব্যবহার, হাস্যজ্জ্বোল আন্তরিকতার কারণে রোগীদের সাথে তার একটি আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

এই আন্তরিকতার গল্প ছড়িয়ে যেতে থাকে গণমানুষের মাঝে। নিজ এলাকা ঝালকাঠী থেকে তার চিকিৎসার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে বরগুনা, কলাপাড়া, কুয়াকাটা, পিরোজপুর, ভান্ডারিয়া, কাউখালি, পাথরঘাটা, ভোলা, চরফ্যাসন, হাতিয়া, মনপুরা পর্যন্ত। দূর-দূরান্ত থেকে রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসায় প্রায় রাতেই বাড়ি ফেরা হতো না তার। চিকিৎসাসেবার মহান ব্রত নিয়ে ভুলে যেতেন নিজের নূন্যতম বিশ্রমের কথাও। রোগীদের সেবা দিয়ে সুস্থ করে তোলার মাঝেই যেন নিহিত ছিলো তার সকল সুখ ও শান্তি।


মেডিকেল কলেজ ও পরবর্তীতে তার কর্মস্থল আলেকান্দার আশেপাশে বাড়ি হওয়াতে ডাঃ আনোয়ার হোসেনের সাথে ঘনিষ্ঠতা হয় প্রয়াত মেয়র শওকত হোসেন হিরণের। শওকত হোসেন হিরণের ছেলে সাজিদ, ইঞ্জিনিয়ার শহীদ ভাইয়ের মেয়ে শীতল ও ডাঃ আনোয়ার হোসেনের ছেলে রাহাত ছোটবেলায় একত্রে বিডিএস স্কুলে পড়ার সুবাদে তিনটি পরিবারের মধ্যে একটি সুন্দর পারিবারিক বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। সাউথ এপোলো ডায়াগনোস্টিক সেন্টার প্রতিষ্ঠা হলে পারিবারিক বন্ধু থেকে ডাঃ আনোয়ার, হিরন ভাই ও শহীদ ভাই ব্যবসায়িক পার্টনারে পরিণত হন।


বরিশাল বান্দ রোডস্থ গ্রান্ডপার্ক হোটেলের বিপরীতে ডাঃ আনোয়ারের থাকা ব্যক্তিগত জমির একাংশে প্রায় বছর দশেক আগে তিনি একটি দৃষ্টিনন্দন বাড়ি করেন। জমির বাকি যে খালি অংশটি ছিলো, মেয়র হওয়ার পরে শওকত হোসেন হিরন সেখানে একটি আধুনিক হোটেল অথবা অত্যাধুনিক হাসপাতাল গড়ে তোলার পরামর্শ দেন ডাঃ আনোয়ার হোসেনকে। ডাক্তারী পড়ার সময় থেকেই আনোয়ারের স্বপ্ন ছিলো, যদি কোনদিন আল্লাহ তাকে তৌফিক দেন, তাহলে বরিশালবাসীর জন্য তিনি একটি আধুনিক হাসপাতাল গড়ে তুলবেন, যেখানে থাকবে সকল ধরণের উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা।

স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্য নিয়েই ২০১৫ সালে শুরু করেন ‘রাহাত আনোয়ার  হাসপাতাল’ তৈরীর  কাজ। নিজের জীবনের সমস্ত সঞ্চয় ও ব্যাংক ঋণ নিয়ে গড়ে তোলেন দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ, দৃষ্টিনন্দন ও অত্যাধুনিক প্রাইভেট হাসপাতাল। ২০১৭ সালের ১ জুলাই যাত্রা শুরু করে উন্নত চিকিৎসা সেবার কারণে অতিদ্রুত দক্ষিণাঞ্চলসহ সমগ্র বাংলাদেশে এই হাসপাতালের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। 


হাসপাতালের শুরু থেকে আমি ও ইঞ্জিনিয়ার শহীদভাই নিয়মিত হাসপাতালে যাতায়াত করতাম। হাসপাতাল পরিচালনার ক্ষেত্রে ডাঃ আনোয়ারের সহধর্মিনী শারমীন আনোয়ার, ভাই দেলোয়ার, আমি ও ইঞ্জিনিয়ার শহীদ ভাই কাজ করতাম। ২০১৮ সালে অকস্মাৎ সকলকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান ইঞ্জিনিয়ার শহীদ ভাই। পরবর্তীতে আমাদের সাথে হাসপাতাল পরিচালনার কাজে যোগ দেন ডাঃ ইকবালুর রহিম সেলিম।
নিত্য নতুন অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে হাসপাতালটিকে আরও উন্নত করার প্রক্রিয়া চলছিল সতত গতিতেই।

এই গতিতে হঠাৎ করে যেন বাঁধ দিয়ে বসে ডাঃ আনোয়ারের মৃত্যু। ২০২০ সালে ৮ জুন ফজরের ওয়াক্তে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার সময় অপারেশন থিয়েটারেই হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়েন ডাঃ আনোয়ার। সেদিন খুব ভোরে আমাদের রাজনৈতিক নেতা আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ’র সহধর্মিণী সাহান আরা বেগম এর জানাজা নামাযের শেষে হঠাৎ দেলোয়ারের ফোন আসে। দেলোয়ার জানায় যে আনোয়ার খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছে।

শোনার সাথে সাথে পাগলের মতো হাসপাতালে ছুটে যাই। সমগ্র পৃথিবী যেন অন্ধকার হয়ে আসছিল, এক অজানা আতংক আর শংকায় হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছিল। অনেক চেষ্টা চরিত্র করে ডাঃ সাইফুলের সহযোগিতায় তার পাইলট বন্ধুর এয়ারক্রাফটে ঢাকা পাঠাই আনোয়ারকে। তখন কল্পনাতেও আসেনি যে এটাই হবে আমাদের শেষ দেখা। সেদিনই দিবাগত রাত তিনটার দিকে না ফেরার দেশে চলে যায় আনোয়ার। স্ত্রী হারায় তার স্বামীকে, সন্তানেরা হারায় তাদের পিতাকে, আমি হারাই আমার কাছের মানুষ- বিশ্বস্ত বন্ধুকে আর বরিশালবাসী হারায় একজন মানবদরদী সমাজসেবককে।

বিস্ময় আর অবিশ্বাসে স্থবির হয়ে যায় মন। ভাবতেও কষ্ট হয়, যে চিকিৎসক হাজার হাজার মানুষকে সেবা দিয়ে সুস্থ করেছেন, করোনার মধ্যে সকল হাসপাতাল, ডাক্তার চিকিৎসা সেবা থেকে মুখ ফিরিযে নিলেও যিনি সাহসী বীরের মতো চিকিৎসা দিয়ে মানুষের পাশে থেকেছেন- সেই মানুষটি কোন হাসপাতালে চিকিৎসা পেলেন না। ঢাকায় একের পর এক হাসপাতালে মিনতি করেও তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায় নি। এই স্মৃতির বেদনায় বারবার চোখ ভিজে আসে। 
মানবসেবায় ডাঃ আনোয়ার ছিলেন একজন সব্যসাচী ব্যক্তি।

তিনি একই সাথে ছিলেন রাহাত আনোয়ার হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, বরিশাল ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনোস্টিক এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক, ঝালকাঠী জেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি, দৈনিক বরিশালের আজকাল পত্রিকার প্রকাশক, নিজ এলাকা মানপাশা মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কর্ণকাঠী হাইস্কুল ও কলেজের সভাপতি, সাউথ এপোলো মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক- সর্বোপরি একজন বড় মনের মানুষ, যিনি তার পুরোটা জীবন উৎসর্গ করেছেন মানুষের সেবায়।

নিজের এলাকার সকল মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসা করতেন, নিজ এলাকা মানপাশায় পঁচাত্তর লাখ টাকা ব্যয় করে একটি বিদ্যালয় ভবন করেছেন যার ছাত্রদের প্রতিবছরের ইউনিফর্ম নিজ খরচে দিতেন। এছাড়াও, কারও পরীক্ষার ফি, মেয়ের বিয়ের জন্য অর্থ সাহায্য ইত্যাদি নানাবিধ সেবামূলক কাজ তো রয়েছেই। মানুষের সেবা করতে করতেই তার মৃত্যু হয়। এ মৃত্যু তাই পরকালের জন্য মঙ্গলময়। 


আজ এক বছর হয়ে গেলো ডাঃ আনোয়ার নেই। কিন্তু বেঁচে আছে তার স্বপ্ন, তার ভালোবাসার হাসপাতালটি। এই হাসপাতালটিকে জৌলুসময় রাখার জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তার স্ত্রী শারমীন আনোয়ার। স্বামীর স্বপ্নপূরণের জন্য দিনরাত নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তিনি। সেই সাথে সাধ্যমত চেষ্টা করছেন স্বামীর সমাজসেবা মূলক কর্মকান্ড গুলোকেও চালিয়ে যাবার।

মায়ের এই নিয়ত যুদ্ধ চালিয়ে নেবার জন্য সাহসী সৈনিকের মতো মা শারমীন আনোয়ারকে অনুপ্রেরণা দিয়ে যাচ্ছে ডাঃ আনোয়ারের দুই সুযোগ্য সন্তান- রাহাত আনোয়ার ও তাসনিম আনোয়ার অর্ণা। দুই সন্তানই বর্তমানে মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নরত। আশা করা যায়, তারা দুজনেই বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হয়ে বাবার মতোই মানুষের সেবায় নিয়োজিত হবে। সে অবধি মা শারমীন আনোয়ারের দৃঢ় নেতৃত্বে পূর্ণ জৌলুসে এগুতে থাকবে ডাঃ আনোয়ারের স্বপ্ন- রাহাত আনোয়ার হাসপাতাল। 


ক্ষণজন্মা জীবনে কিছু মানুষ দ্রুতই পৃথিবী থেকে চলে যায়। তারা চলে গেলেও থেকে যায় তাদের কাজ। স্বীয় কর্মগুণে তারা অমর হয়ে থাকে মানুষের মনে। তেমনি দক্ষিণাঞ্চলের অনেক মানুষের মনেও ডাঃ আনোয়ার হোসেন অমর হয়ে থাকবেন। আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা, আল্লাহ তার কাছে আনোয়ারকে ভালো রাখুন, তার পরিবারকে হেফাজত করুন- সর্বোপরি, তার স্বপ্নকে রক্ষা করে রাহাত আনোয়ার হাসপাতালকে গৌরব মহিমায় সারাদেশের কাছে উজ্জ্বল করে তুলুন। 


লেখক: অ্যাডভোকেট লস্কর নুরুল হক
সাবেক সম্পাদক
বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতি


এমবি