ঢাকা সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪

Motobad news

এতো টাকা জনপ্রতিনিধিদের! কোথা থেকে পায়?

এতো টাকা জনপ্রতিনিধিদের! কোথা থেকে পায়?
গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

--বিপ্লব রায়, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, মতবাদ


আমাদের জনবান্ধব প্রতিনিধিদের টাকা-পয়সা বা সম্পদ-সম্পত্তি খালি চোখে দেখে ধারণা করা যায় না। কার এমন সাধ্য! নেতার সম্পদের কথা জিজ্ঞাসা করে?
তবে প্রতি ৫ বছর পর তাদের সম্পত্তির হিসাব দিতে হয় নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলের সময়। এসময় তাদের সম্পদ-সম্পত্তির খবর কিছুটা জানা যায়। তাও যতটা আইনের মার-প্যাচে দেখানো লাগে, ততটুকু। এটুকু জেনেই সাধারণ মানুষের চোখ কপালে উঠে যাওয়ার অবস্থা হয়ে যায়। এছাড়াও তাদের বুক পকেট, প্যান্টের পকেট, গোপন পকেটেও বহু টাকা-পয়সা থাকে। যা অধরাই থেকে যায়। আর পাঠকরা এই খবর পড়েন আর বলেন, এমপি-মন্ত্রীদের এতো টাকা! কোথা থেকে পায়? আহারে জনপ্রতিনিধি! 


           এজন্যই তো এসব এমপি-মন্ত্রীরা (যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে) সব সময় চোখে রঙিন চশমা লাগিয়ে দেশের শুধু উন্নয়ন দেখেন, সব মানুষের পকেট ভরা টাকা দেখেন, বিপুল অঙ্কের মাথাপিছু আয় দেখেন, মুল্যস্ফীতি কম দেখেন। এজন্যই তো আমাদের বাণিজ্যমন্ত্রী টিপুমুন্সী বলেন, তার এলাকার মানুষ কষ্টে নেই। সেখানের নারীরা দিনে তিনবার লিপস্টিক লাগাচ্ছে। বাহ! কি দারুণ কথা! কতটা নারী সচেতন মন্ত্রী তিনি। নারীরা কতবার লিপস্টিক লাগায়, তাও তার জানা। 

 গত পাঁচ বছরে বরিশাল-৫ (সদর) আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুকের আয় বেড়েছে প্রায় ৪০ গুণ ! ভাবা যায়?
 ঢাকায় তিনটি প্লট ও একটি ফ্ল্যাট বিক্রির অর্থ বিনিয়োগ করে তাঁর আয় বেড়েছে। তিনি এবারও এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী।

 এ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর আয় বেড়েছে প্রায় তিনগুণ। তবে তাঁর কাছে নগদ অর্থ রয়েছে দুই কোটি টাকার বেশি। তিনি বরিশাল সিটি করপোরেশনের সদ্য সাবেক মেয়র।


গত ২৮ নভেম্বর নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র জমা দেন জাহিদ ফারুক ও সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ। মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া হলফনামায় তাঁরা এই সম্পদ বিবরণী জমা দিয়েছেন। 
    ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সময় জাহিদ ফারুকের দেয়া সম্পদ বিবরণীতে আয় দেখানো হয়েছিল ৪ লাখ ২২ হাজার ৪২ টাকা। এবার দেখিয়েছেন ১ কোটি ৬৭ লাখ ৬০ হাজার ৬৫৮ টাকা। সে হিসাবে তাঁর গত পাঁচ বছরে আয় বেড়েছে প্রায় ৪০ গুণ!

 অন্যদিকে সাদিক আবদুল্লাহ ২০১৮ সালের সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্ব›িদ্বতার সময় দেওয়া সম্পদ বিবরণীতে বার্ষিক আয় দেখিয়েছিলেন ৭ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। এবার দেখিয়েছেন ২০ লাখ ৪০ হাজার টাকা। সে হিসাবে সাদিক আবদুল্লাহর আয় গত পাঁচ বছরে তিন গুণের মতো বেড়েছে। 

শুধু এরাই নয়, এদের ওপর নির্ভরশীল স্ত্রী-সন্তানদেরও আয় বেড়েছে বহুগুণ। কী একটা জাদু, তাই না? এদের কাগজে দেখানো হয়, সম্মানি, কৃষিকাজ ও মাছচাষ আবার কারো থাকে ব্যবসা।

 বরিশাল-৩ (মুলাদী-বাবুগঞ্জ) আসনে সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য গোলাম কিবরিয়া টিপু গত পাঁচ বছরে দৃশ্যমান আয় বাড়িয়েছেন তিনগুণের বেশি। এবারের নির্বাচনে তিনি আয় দেখিয়েছেন প্রায় ১৯ কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, স্ত্রীর নামেও অস্থাবর সম্পদ রয়েছে ৪ কোটি টাকার ওপরে। এ তো গেল বরিশালের কয়েকজনের খবর।

এর বাইরেও রাঘব বোয়াল আছে বহু। এদের মধ্যে ফরিদপুর-৪ আসনের এমপি নিক্সন চৌধুরীও একজন। এক দশক আগে সংসদ নির্বাচন করার সময় এলাকায় কোনো জমি ছিল না নিক্সনের। কিন্তু দুই মেয়াদে সংসদ সদস্য হয়ে তিনি ২০ একরের বেশি জমির মালিক হয়েছেন। 

এ ছাড়া ২০১৪ সালে তাঁর নামে কোনো বাড়ি, দালান ও অ্যাপার্টমেন্ট না থাকলেও ১০ বছরের ব্যবধানে গুলশান, বনানীতে ফ্ল্যাট ও ভাঙ্গায় বাড়ি হয়েছে তাঁর।

২০১৪ সালে নিক্সন চৌধুরীর ওপর নির্ভরশীলদের কোনো আয় ছিল না। ২০১৮ সালে সেই নির্ভরশীলদের আয় দাঁড়ায় ৪০ লাখ ১৬ হাজার ৬৪২ টাকা। এবার তাদের আয় দেখিয়েছেন ৬১ লাখ ১৪ হাজার ৪৩০ টাকা। ২০১৪ সালে নিক্সন চৌধুরীর স্ত্রীর নামে সাড়ে ৭ কাঠা অকৃষিজমি ও একটি ফ্ল্যাট ছিল। ২০১৮ সালে তাঁর স্ত্রী ঢাকার বনানী ও গুলশানে দুটি ফ্ল্যাটের মালিক হন। এবার গুলশানে ১ কোটি ৪৭ লাখ ১২ হাজার ৬০০ টাকা মূল্যের নতুন একটি ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছেন তিনি।

প্রিয় পাঠক, এভাবে কম্বলের লোম বাছাই করলে কখনো শেষ হবে না। এসব  পড়তে পড়তে আপনি নিশ্চয়ই ক্লান্ত হবেন। মনে হবে রূপকথার গল্প লেখা হয়েছে। কিন্তু এটাই বাস্তব। এজন্যই এদেশে গণতন্ত্রের মোড়ক দিয়ে একেকটি দল ক্ষমতায় এসে আর ছাড়তে চায় না। কারণ এই ক্ষমতার মধ্যেই সব মধু। এখানের মৌমাছি হচ্ছেন জনপ্রতিনিধিরা। যারা সাধারণ মানুষের কাছে মিথ্যা প্রতিশ্রæতি দিয়ে ক্ষমতায় গিয়ে কাড়ি কাড়ি টাকা বানায়। 


এজন্যই ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে তাদের মিত্র দলগুলোর আসন ভাগাভাগি হয়। আগুন সন্ত্রাস মামলার আসামিরা এক ঝিলিকে কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে সোজা রাজ দরবারে যেতে পারে। সব নৈতিকতা বিষর্জন দিয়ে তাদের হাতে তুলে দেয়া হয় ক্ষমতাসীন দলের চ‚ড়ান্ত মনোনয়ন।

 

গত করোনা মহামারীর সময় দেশের বহু মানুষ সহায় সম্বল হারিয়ে নি:স্ব হয়ে গেছেন। ব্যবসা চুলোয় গেছে। ঢাকা শহরে বহু স্কুল শিক্ষককেও দেখেছি রাস্তায় ভ্যানে করে শাক বিক্রি করতে। বহু ব্যবসায়ী দোকান ছেড়ে বসেছেন ফুটপাতে। তারা অনেকে এখনো ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারেননি। কিন্তু আমাদের এই কথিত জনপ্রতিনিধিরা ফুলে ফেঁপে কলাগাছ।

বর্তমানে বাজারে সব পণ্যের দাম আকাশ ছোঁয়া। সাধারণ মানুষ কত কষ্ট করে বেঁচে আছে, তা তারা নিজেরাই জানে। এই কথিত জনবান্ধবরা এখন নির্বাচনের সময় সবার সঙ্গে বন্ধুত্বের অভিনয় করে। গলা জড়িয়ে ধরে। বুকে টেনে নেয়। টঙ দোকানে বসে সবার সঙ্গে চা খায়। বস্তিতে গিয়ে তাদের কাÐারি চরিত্রে অভিনয় করে। আশ^াস দেয়, নির্বাচিত হলে তাদের সব কষ্ট দূর করে দিবে। কিন্তু নেতা ঠিকই এমপি হয়, কিন্তু দুর্ভোগ আর তেমন কাটে না। শুধু তাই নয়, নির্বাচিত হওয়ার পরই তাদের সঙ্গে কথা বলতে পিএস-এপিএস, দালাল ও পাতিনেতা অনেক কিছু ভেদ করে যেতে হয়। দেখা হলেও মাথা নিচু করে গলার স্বর মন্দ্রকে নিয়ে কথা বলতে হয়। সবকিছুই চলে চক্রাকারে।

 
এখন দ্রব্যমূল্যের যাতাকলে পিষ্ঠ হয়ে সাধারণ মানুষের জীবনের চাকা আর চলতে চায় না। সেখানে নেতাদের টাকা, দেশে-বিদেশে বাড়ি গাড়ি বাড়ে জাদুর মতোন। এজন্যই তো এমপি পদে এতো লোভ।
  
 


এমএন
গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন