বরিশালে ৭ বছরে বিএনপির ছয় প্রার্থীর আয়ের সাথে বেড়েছে সম্পদ

ক্ষমতায় না থাকলেও বিগত সাত বছরে আয় বেড়েছে বরিশালের সংসদীয় ছয়টি আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের। নিজেদের পাশাপাশি সম্পদ বেড়েছে তাদের স্ত্রী-সন্তানদেরও। নির্বাচন কমিশনে ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে জমা দেওয়া হলফনাম থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া)
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-১ আসনে বিএনপির ধানের শীষের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন।
হলফনামায় তিনি নিজের আয় দেখিয়েছেন ১২ লক্ষ ৮৮ হাজার ৩৬০ টাকা। এর মধ্যে বাড়িভাড়া, বাণিজ্যিক স্থাপনা এবং অন্যান্য খাতে ১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা, কোম্পানি থেকে সম্মানি ১০ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা এবং ব্যাংক থেকে লাভ পান ৪০ হাজার ৩৬০ টাকা।
তার ওপর নির্ভরশীল স্ত্রী ডালিয়া রহমান ৮৯ লক্ষ ৪৮ হাজার ৫৯ টাকা এবং পুত্র আপন জহিরের আয় দেখিয়েছেন ছয় লক্ষ ৫৯ হাজার ২২৫ টাকা। নিজেদের কোম্পানি থেকে সম্মানি এবং ব্যাংক সুদ থেকে এ আয় দেখিয়েছেন তারা।
এছাড়া নগদ এক কোটি ১৪ লক্ষ ৭৬ হাজার ১১৫ টাকাসহ নিজের বর্তমান অস্থাবর সম্পদ দেখিয়েছেন এক কোটি ৫২ লক্ষ ৪৩ হাজার ৮৬০ টাকা। স্ত্রীর ২ কোটি ১৩ লক্ষ ৩৬ হাজার ৭৯৬ টাকা এবং ছেলের ৩৯ লক্ষ ৯৮ হাজার ৭৬৮ টাকা অস্থাবর সম্পদ দেখানো হয়েছে।
অপরদিকে স্থাবর সম্পদের মধ্যে জহির উদ্দিন স্বপনের নিজের এবং পৈত্রিক সম্পদসহ ২ কোটি ১৮ লক্ষ ৭৫ হাজার ৫০০ টাকার এবং স্ত্রীর নামে রয়েছে ১৪ লক্ষ ৬৭ হাজার ৫০০ টাকার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে।
এর আগে ২০১৮ সালে জহির উদ্দিন স্বপনের কৃষিজমি, বাড়িভাড়াসহ বিভিন্ন খাতে আয় দেখিয়েছিলেন ১৪ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা। ওই সময় স্ত্রী-সন্তানদের আয়ের তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি তখনকার হলফনামায়।
তবে স্ত্রীর নামে ৩০ লক্ষ ৬৪ হাজার ৪০৫ টাকার স্থাবর সম্পদ ছিল। আর স্বপনের নিজের নামে ২ কোটি ৩০ লক্ষ টাকার শেয়ারসহ মোট ২ কোটি ৫২ লক্ষ ১৩ হাজার ৪৪২ টাকার স্থাবর সম্পদ দেখানো হয়েছিল। আর অস্থাবর সম্পদ ছিল ৩ কোটি ৭০ লক্ষ ৯৯ হাজার ৩৬০ টাকার এবং স্ত্রীর নামে অস্থাবর সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৮ লাখ ৪ হাজার ২৯৬ টাকার।
বরিশাল-২ (উজিরপুর-বানারীপাড়া)
এই আসনে বিএনপির ধানের শীষের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও উজিরপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি সরদার সারফুদ্দিন আহমেদ সান্টু।
হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, প্রার্থীর তুলনায় কয়েকগুণ বেশি সম্পদ তার স্ত্রী নাসিমা আহমেদের নামে। তাছাড়া দেশে বা দেশের বাইরে নিজের কোনো আয় দেখাননি তিনি। তবে বাড়ি ভাড়া বাবদ ছেলে মহিউদ্দিন আহমেদের আয় দেখানো হয়েছে ২ লক্ষ ৫২ হাজার টাকা। যা ছেলের লেখাপড়ার পেছনেই ব্যয় হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে নিজের নামে ৯১ লক্ষ ৬২ হাজার ২৫৮ টাকা নগদ এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ৮ লক্ষ ৫১ হাজার ৫১৫ টাকাসহ মোট ১ কোটি ৯৩ লক্ষ ৮ হাজার ৭৭৩ টাকার এবং স্ত্রীর নামে ৯৫ লক্ষ ৪৬ হাজার ১৪৫ টাকার অস্থাবর সম্পদ দেখিয়েছেন সান্টু।
তবে সারফুদ্দিন সান্টুর নিজের নামে নেই কোনো স্থাবর সম্পত্তি। তার স্ত্রীর নামে ৫৬ শতাংশ জমি, একটি বাড়ি, পাঁচটি এ্যপার্টমেন্ট, একটি পেট্রোলপাম্পসহ মোট ৮ কোটি ৪২ লক্ষ ৩৪ হাজার ৪১৪ টাকা মূল্যের স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে। আর ছেলের নামেও রয়েছে তিনটি এপার্টমেন্টসহ ৫৭ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা মূল্যের স্থাবর সম্পত্তি।
২০১৮ সালে সান্টুর নিজের ১ কোটি ৪৩ লক্ষ ৭১ হাজার ৭২৮ টাকার এবং তার স্ত্রীর নামে ৪টি গাড়িসহ মোট ৩ কোটি ৫৫ লক্ষ ৬৯ হাজার ৫৮৫ টাকার স্থাবর সম্পত্তি ছিল।
বরিশাল-৩ (মুলাদী-বাবুগঞ্জ)
এই আসনে বিএনপির ধানের শীষের প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস-চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন। তিনি নিজের আইন পেশায় ৩৫ লাখ ৯৬ হাজার টাকা, কৃষি খাতে ৮০ হাজার এবং বাড়িভাড়া বাবদ ২৭ লাখ ৫৬ হাজার ৯৬৪ টাকাসহ মোট আয় দেখিয়েছেন ৭০ লক্ষ ৫৬ হাজার ৬১৭ টাকা এবং বাড়ি, শেয়ার, সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংক আমানতসহ অন্যান্য খাতে নিজের গৃহিনী স্ত্রীর আয় দেখিয়েছেন ১১ লক্ষ ৫১ হাজার ৬৮৬ টাকা।
এর বাইরে নিজের নগদ ৩৩ হাজার ৭১৯ টাকাসহ ১ কোটি ৭১ লক্ষ ২০ হাজার ৮৯৫ টাকা এবং স্ত্রীর নামে ২৬ লক্ষ ৭৪ হাজার ৬৮৬ টাকার অস্থাবর সম্পত্তি দেখিয়েছেন। আর নিজের নামে বর্তমানে স্থাবর সম্পদ ৯ কোটি ৬৫ লক্ষ এবং স্ত্রীর নামে ৫০ লক্ষ টাকার সম্পত্তি দেখিয়েছেন। মেয়ের কাছে ধার বাবদ দেনা দেখিয়েছেন ৩০ লক্ষ টাকা। এর আগে ২০১৮ সালে জয়নুল আবেদীন নিজের আয় দেখিয়েছিলেন ২৫ লক্ষ ৩৫ হাজার ৪১৩ টাকা। তবে ওই সময় স্ত্রীর আয় দেখানো হয়নি হয়লফনামায়।
তখন নিজের অস্থাবর সম্পদ দেখিয়েছিলেন নগদ ২০ লাখ টাকাসহ মোট ৭৪ লক্ষ ৪৭ হাজার ৩২০ টাকা এবং ৩১ তোলা স্বর্ণালংকার। এছাড়া মুলাদীতে পৈত্রিক সম্পত্তি, ঢাকায় এবং বরিশালে বাড়িঘরসহ স্থাবর সম্পদ দেখিয়েছিলেন ১ কোটি ৮ লাখ ৯০ হাজার টাকার।
বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ)
এই আসনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহসান। তিনি নিজের পেশা দেখিয়েছিলেন ব্যবসা। ব্যবসা থেকে তার আয় দেখানো হয়েছে ৪ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা।
এছাড়া ১২ লক্ষ ২০ হাজার ৫১ টাকাসহ, ব্যাংক, শেয়ারসহ এবং স্বর্ণালঙ্কারসহ নিজের অস্থাবর সম্পদ দেখিয়েছেন ৮৩ লক্ষ টাকা। তবে নিজের কোনো স্থাবর সম্পত্তি নেই বলে উল্লেখ করেছেন হলফনামায়।
বরিশাল-৫ (সদর উপজেলা ও সিটি করপোরেশন)
এই আসনে এবারও ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আসনটির পাঁচবারের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মজিবর রহমনা সরোয়ার। তিনি বাড়িভাড়া থেকে ১৩ লক্ষ ৫০ হাজার, ব্যবসা থেকে ৬ লাখ, কোম্পানি থেকে সম্মানি ১২ লাখ এবং কৃষিখাতে ২ লাখসহ আয় দেখিয়েছেন ৪০ লাখ ২৫ হাজার ৯৩৯শ টাকা।
অস্থাবর সম্পদ হিসাবে নিজের ৩ কোটি ৩১ লাখ ৬০ হাজার ৯৭৪ টাকা, ব্যাংকে জামানত ২ কোটি ২৪ লাখ ৯ হাজার ৯৮০ টাকা, ৯৫ লাখ টাকার সঞ্জয়পত্রের কথা উল্লেখ করেন তিনি। সব মিলিয়ে তার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে ৮ কোটি ৬৬ লাখ ৪০ হাজার ৯৫৪ টাকার।
অপরদিকে স্থাবর সম্পদ দেখিয়েছেন ৩ কোটি ৫৯ লক্ষ ১৯ হাজার ৫৬২ টাকার। এর মধ্যে কৃষি জমি ১২ লক্ষ ৩৬ হাজার ১৪৮ (ক্রয়কালীন মূল্য) এবং ঢাকা ও বরিশালে ৩ কোটি ১৪ লক্ষ ১৮ হাজার টাকা মূল্যের তিনটি ফ্লাট ও একটি টিন সেট বাড়ি রয়েছে। তবে নিজের স্ত্রী-সন্তানের আয়-ব্যয় বা সম্পদের হিসাব হলফনামায় দেননি সরোয়ার।
২০১৮ সালে মজিবর রহমান সরোয়ারের আয় ছিল বর্তমান সময়ের থেকে বেশি। ওই সময় তিনি কৃষি, বাড়িভাড়া, ব্যবসা, সম্মানি এবং ব্যাংক লাভ থেকে আয় দেখিয়েছিলেন ৪৮ লাখ ৭০ হাজার ৯৮৮ টাকা।
তখন তার ৫০ তোলা স্বর্ণালঙ্কার এবং এক কোটি ৯০ লাখ ৮৮ হাজার ৫০০ টাকার অস্থাবর এবং কৃষি জমি ও বাড়িসহ মোট ৩ কোটি ৩০ লাখ ২৭ হাজার ৪২৬ টাকার স্থাবর সম্পদ দেখিয়েছিলেন মজিবর রহমান সরোয়ার।
বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ)
এই আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও বরিশাল জেলা (দক্ষিণ) বিএনপির আহ্বায়ক আবুল হোসেন খান। এই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ছিলেন তিনি। ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও মনোনয়ন পেয়েছিলেন আবুল হোসেন খান।
ওই নির্বাচনের সময় হলফনামায় নির্বাচন কমিশনকে নিজের আয় ব্যয় এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের হিসাব দিয়েছেন। ওইসময় তিনি ব্যবসা থেকে নিজের আয় দেখিয়েছিলেন ৬ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা এবং নিজের স্ত্রী সেলিনা হোসেনের চাকরি থেকে আয় দেখানো হয়েছিল ৩৪ লাখ ৩ হাজার টাকা।
ওই সময় আবুল হোসেনের অস্থাবর সম্পদ ছিল এক কোটি ৩৬ লাখ ২ হাজার ৪৭৪ টাকার। এছাড়া তার স্ত্রীর ১০ তোলা স্বর্ণালঙ্কারসহ অস্থাবর সম্পদ ছিল ২৭ লাখ ৪২ হাজার ৮৪২ টাকার। নিজের স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪১ লক্ষ ৩৬ হাজার ১২০ টাকার এবং স্ত্রীর নামে জমি, ভবনসহ মোট ৩২ লাখ ১২ হাজার ৫০০ টাকার স্থাবর সম্পত্তি দেখানো হয়েছিল।
তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে দাখিল করা হলফনামায় আবুল হোসেন খান ব্যবসা থেকে নিজের আয় দেখিয়েছেন ২৩ লক্ষ ২৮ হাজার ২০০ টাকা এবং ব্যাংক সুদসহ ১৫ হাজার ২৫৮ টাকাসহ মোট আয় ২৩ লাখ ৪৩ হাজার ৪৫৮ টাকা। তবে এবার স্ত্রীর আয় দেখাননি আবুল হোসেন।
এছাড়া নিজের নগদ ২ লাখ ৬০ হাজার, ৩০ লাখ টাকার ডিপোটিজ এবং ৩৯ লাখ টাকা মূল্যের বাড়িসহ মোট অস্থাবর সম্পদ দেখিয়েছেন এক কোটি ৭০ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫৫ টাকার। তাছাড়া স্ত্রীর নগদ এক লাখ ৫০ হাজার টাকা, ১৫ লাখ টাকার গাড়ি, ১৩ লাখ টাকার ডিপোজিট এবং ১০ ভরি স্বর্ণালঙ্কারসহ মোট ৩২ লাখ ৪৩ হাজার ৯০৩ টাকার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে।
স্থাবর সম্পদ হিসেবে ধানমন্ডিতে নিজের দোকান, বাকেরগঞ্জে তিনতলা ভবন, বনানীতে ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ জমিসহ মোট এক কোটি ৭৩ লাখ ১ হাজার ৬২০ টাকার এবং স্ত্রীর নামে ঢাকার মালিবাগ, গুলশানসহ পৃথক স্থানে মোট ৩২ লাখ ১২ হাজার ৫০০ টাকার স্থাবর সম্পদ দেখিয়েছেন আবুল হোসেন।
এইচকেআর