গুমে সবচেয়ে বেশি জড়িত র্যাব, এরপরই পুলিশ

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশে গুমের ঘটনার প্রায় ২৫ শতাংশের সঙ্গে র্যাব জড়িত, আর ২৩ শতাংশের সঙ্গে পুলিশ। এছাড়া ডিবি, সিটিটিসি, ডিজিএফআই ও এনএসআই গুমের ঘটনার সঙ্গে ব্যাপকহারে জড়িত ছিল। বহু ক্ষেত্রে সাদা পোশাকধারী বা ‘প্রশাসনের লোক’ পরিচয়ে অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। সম্প্রতি এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর গুলশানে অবস্থিত গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সার্বিক বিষয় তুলে ধরেন কমিশন সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন গুম কমিশনের সদস্য বিচারপতি ফরিদ আহমেদ শিবলী, নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেন।
সংবাদ সম্মেলনে মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, অভিযোগগুলোর ধরন থেকে স্পষ্ট যে, গুম একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও পদ্ধতিগত চর্চা হিসেবে র্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দ্বারা একক ও যৌথ অভিযানে সংঘটিত হয়েছে, যা বিচ্ছিন্ন অসদাচরণের পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় সমন্বিত কার্যক্রমের ইঙ্গিত দেয়।
কমিশন অব ইনকোয়ারি অ্যাক্ট-এর ধারা-১০ অনুযায়ী গুম সংক্রান্ত অভিযোগগুলোর মধ্যে থেকে ফিরে না আসা ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত ও নিষ্পত্তির লক্ষ্যে চার ধাপে কিছু অভিযোগ বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শকের কাছে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে আনা দুই থেকে পাঁচদিনের গুমের অভিযোগগুলোর তদন্তসাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পৃথকভাবে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে অগ্রগতি মানবাধিকার কমিশনকে জানাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কমিশনে দাখিল করা ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগের মধ্যে একাধিকবার দায়ের করা ২৩১টি অভিযোগ এবং যাচাই-বাছাই শেষে প্রাথমিক তদন্তের পর গুমের সংজ্ঞারবহির্ভূত বিবেচনায় ১১৩টি অভিযোগ বাতিল করা হয়। ফলে মোট ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ কমিশনের সক্রিয় বিবেচনায় ছিল; যার মধ্যে ২৫১ জন গুম এবং ৩৬ জনের গুম পরবর্তী মরদেহ উদ্ধার হয়।
নিখোঁজদের অবস্থান নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা, সন্দেহভাজন ব্যক্তি, শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য ও বেসামরিক সাক্ষীসহ মোট ২২২ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে কমিশন। পাশাপাশি ৭৬৫ জন গুমের শিকার ও তাদের পরিবারের সদস্যদের একাধিকবার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলার পুলিশ সুপার ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের সেক্টর কমান্ডারদের কাছ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভারত থেকে বাংলাদেশে পুশইন করা ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ করলেও তাতে গুমের শিকার কোনো ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়নি। তবে ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর ঢাকার ধামরাইয়ের বাসিন্দা, গুমের শিকার মোহাম্মদ রহমত উল্লাহকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর সীমান্ত দিয়ে পুশইন করার একটি নির্দিষ্ট ঘটনা কমিশনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
এছাড়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতের বিভিন্ন কারাগারে আটক প্রথম দফায় ১ হাজার ৫২ জন ও দ্বিতীয় দফায় ৩ হাজার ২৮৫ জন বাংলাদেশি নাগরিকদের তালিকা কমিশনপ্রাপ্ত হলেও তা যাচাইয়ের পর গুমের শিকার কোনো ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়নি।
কমিশন সভাপতি আরও বলেন, নিখোঁজদের ভাগ্য নির্ধারণে কমিশন সারাদেশের বিভিন্ন জেলায় সম্ভাব্য ক্রাইম সিন, পিক-আপ প্লেস, আয়নাঘর ও ডাম্পিং প্লেস পরিদর্শন করেছে।
মুন্সিগঞ্জে একটি বেওয়ারিশ লাশ দাফনের কবরস্থান পাওয়া গেছে, যেখানে গুমের শিকার ব্যক্তিদের দাফন করা হয়েছে। বরিশালের বলেশ্বর নদীতে এবং বরগুনার পাথরঘাটায় ডাম্পিং প্রেসের সন্ধান পাওয়া গেছে। বরিশালে দুটি দেহ উত্তোলন ও ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে কমিশন এ কাজের সূচনা করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের ছবি ব্যবহারে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে।
তিনি জানান, কমিশন অজ্ঞাতপরিচয় ও বেওয়ারিশ মরদেহ শনাক্ত করে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে একটি ব্যাপক ডিএনএ ডাটাবেস গঠনের সুপারিশ করেছে।
কমিশন গুম সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সদস্যদের নিয়ে প্রতিটি বিভাগে পরামর্শ সভা, ৩০০ জনের বেশি বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেটদের জন্য চারটি কর্মশালা এবং বেশ কিছু প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের মাধ্যমে গুম বিষয়ক এক ঘণ্টার প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশ করা হয়। কমিশন দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও কূটনৈতিক মিশনের সঙ্গে নিয়মিত সম্পৃক্ত থেকেছে; সবাই গুমের ব্যাপকতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কমিশনের কাজের প্রশংসা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের তাগিদ দেন।
মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, কমিশন বাংলাদেশে বলপূর্বক গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অবসান ঘটাতে ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত সংস্কারের সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বিলুপ্তকরণ, অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব থেকে সশস্ত্র বাহিনী প্রত্যাহার, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ বাতিল বা মৌলিক সংশোধন, সমাজভিত্তিক প্রতিরোধমূলক সন্ত্রাসবিরোধী নীতি প্রণয়ন, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইন, ২০০৩-এর ১৩ ধারা বাতিল, সব বাহিনীকে কঠোর আইনি জবাবদিহির আওতায় আনা, বাধ্যতামূলক মানবাধিকার প্রশিক্ষণ, ভুক্তভোগী-কেন্দ্রিক ন্যায়বিচার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিতকরণ এবং সত্য, স্মৃতি ও জবাবদিহির প্রতীক হিসেবে ‘আয়নাঘরগুলোকে’ জাদুঘরে রূপান্তরের সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এইচকেআর