রোগী কমলেও অক্সিজেন সেবায় ব্যত্যয় নেই তাদের

করোনা মহামারির সংকট মুহূর্তে যখন বিপর্যস্ত জনজীবন, সপ্তাহ, মাসের ব্যবধানে কোভিড সংক্রমণের হার বাড়ছে , অক্সিজেন ও হাসপাতালে আইসিইউ বেডের অভাবে জায়গায় জায়গায় হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন সাধারণ মানুষ, তখন এই সময়ে গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়ে নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করোনাক্রান্ত মুমূর্ষু রোগীদের ফ্রি অক্সিজেন সেবা দিয়ে সহযোগীতার হাত বাড়িয়েছেন বরিশালের তিন সেবা প্রতিষ্ঠান। তারা হল বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল- বাসদ বরিশাল জেলা শাখা ও বরিশাল জেলা জাতীয়তাবাদী যুবদল নেতার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হিউম্যানিটি ভলান্টিয়ার্স। বর্তমানে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা শূন্যের কোটায় নামলেও চলমান আছে তাদের ফ্রি অক্সিজেন সেবা।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ গত ১৫ এপ্রিল নগরীর পুলিশ লাইনসে প্রাথমিকভাবে ২২টি অক্সিজেন সিলিন্ডার দিয়ে শুরু করে তাদের কার্যক্রম। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিনামূল্যে রোগীর বাড়িতে এই অক্সিজেন সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়া হয়। পাশাপাশি নিজস্ব টেকনিশিয়ান দিয়ে মূমূর্ষ রোগীকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন পুলিশের নিবেদিত প্রাণ। আর এই কাজে ২৪ ঘন্টা নিয়োজিত রয়েছে ৫ জন পুলিশ সদস্যের একটি টিম ও দুটি গাড়ি। পুলিশের হটলাইনে কোন ফোন আসলেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে রোগীর বাসায় ফ্রি অক্সিজেন সিলিন্ডার পৌঁছে দেয় পুলিশ সদস্যরা। শুধু তাই নয় প্রশিক্ষিত এক্সপার্ট দিয়ে প্রাইমারি চিকিৎসাও দিয়েছেন তারা।
করোনার ১ম ঢেউয়ে গত ১৫ এপ্রিল থেকে ২ জুলাই ৬৯ জনকে, দ্বিতীয় ঢেউয়ে ২৩ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট ২৮৮ জনকে এবং ৮ আগস্ট থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত ১২৩ জনসহ মোট ৪৮৯ জন করোনাক্রান্ত রোগীর বাসায় ফ্রি অক্সিজেন পৌঁছে দিয়েছেন বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের সদস্যরা।
মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. শাহাবুদ্দিন খান জানান, মার্চ মাসে যখন করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসে তখন দেখলাম অক্সিজেনের খুব চাহিদা। করোনাক্রান্ত রোগীর শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা যে কোন সময় দেখা দিতে পারে, যেকোনো সময়ে অক্সিজেনের প্রয়োজন হতে পারে কিন্তু মানুষ রাত বিরাতে কিভাবে অক্সিজেন সংগ্রহ করবে সেই ভাবনা থেকেই ফ্রি অক্সিজেন সার্ভিস চালু করেছি। এছাড়া একমাত্র পুলিশের দ্বারাই অলিগলিতে ২৪ ঘন্টা যেকোনো জায়গায় অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। তাই আমরা মানুষের সেবায় হটলাইন নম্বর চালু করেছি। পুলিশের যে কোন নম্বরে ফোন করে জানালেই বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয় ফ্রি অক্সিজেন সেবা।
বরিশাল নগরীতে বিনামূল্যে অক্সিজেন ব্যাংক ও অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চালু করে অসহায় রোগীদের পরিবহন ও বাসায় অক্সিজেন পৌঁছে দিয়েছেন বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ বরিশাল জেলা শাখা। অক্সিজেন ব্যাংক পরিচালার জন্য ছিল ২৫ জন ছাত্র ও শ্রমীকের সমন্বয়ে একটি স্বেচ্ছাসেবী টিম যারা ২৪ ঘন্টা হটলাইনের মাধ্যমে পরিচালনা করেন এই অক্সিজেন ব্যাংক। তারা নিজেরাই রোগীর বাসায় পৌঁছে দেন অক্সিজেন ও অক্সিমিটার। বরিশাল নগরী বাইরেও আগৈলঝাড়া, বাকেরগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও গিয়েও তারা দিয়েছেন এই সেবা।
এর উদ্যোক্তা বাসদ বরিশাল জেলার সদস্য সচিব ডা. মনীষা চক্রবর্তী বলেন, গতবছর জুন মাসে আমরা ফ্রি অক্সিজেন ব্যাংক ও অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চালু করেছি। এখনো চলমান রয়েছে আমাদের ফ্রি এসব সেবা।এখন পর্যন্ত ৮ শতাধীক করোনা ও ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের বাসায় ফ্রি অক্সিজেন ও অক্সিমিটার পৌঁছে দেয়া হয়েছে। এছাড়া ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের মাধ্যমে ৩০০ জনের অধিক মুমূর্ষু রোগীকে চিকিৎসা কেন্দ্রে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। তিনি জানান, জরুরী অ্যাম্বুলেন্স সেবা ও অক্সিজেন সংকটের জন্য যেন কোন রোগী জীবন নাশ না হয় সেজন্যই আমাদের এই উদ্যোগ। আমরা নগরীর সব এলাকায় মাইকিং করে হটলাইন নম্বর দিয়েছি যাতে কোন রোগী সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে পরলে আমাদের ফ্রি সার্ভিসটি নিতে পারে। আমাদের স্বেচ্ছাসেবীরা রোগীর বাসায় গিয়ে পৌঁছে দিচ্ছেন এ সেবা। এজন্য কোন ধরনের টাকা পয়সা নেয়া হচ্ছে না। এটা সম্পুর্ণ ফ্রি।
এছাড়াও বরিশাল নগরীতে করোনাক্রান্ত রোগীদের বাসায় বাসায় ফ্রি অক্সিজেন সিলিন্ডার পৌঁছে দিচ্ছেন হিউম্যানিটি ভলান্টিয়ার নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। গতবছর এপ্রিল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত ৬৩০ জন করোনা ও শ্বাসকষ্টে ভোগা রোগীর বাসায় পৌঁছে দিয়েছেন অক্সিজেন।
হিউম্যানিটি ভলান্টিয়ার সংগঠনের বর্তমান পরিচালক বরিশাল জেলা যুবদলের সহ সাধারণ সম্পাদক আলী হায়দার জানান, লকডাউনের কারণে রুজি-রোজগার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অসহায়,ছিন্নমূল ও কর্মহীন ৩ শতাধিক মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিয়ে সংগঠনটির যাত্রা শুরু করেন বরিশাল জেলা যুবদলের যুগ্ন সম্পাদক পারভেজ আকন বিপ্লব । পরবর্তীতে করোনায় অসুস্থ রোগীদের জন্য নিয়মিত অক্সিজেন সেবা কার্যক্রমও শুরু করি আমরা। কিন্তু হঠাৎ করেই আমাদের সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা পারভেজ আকন বিপ্লব ভাই মারা গেলে আর্থিক সংকটের কারণে কাজ কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়লে আমরা এখনও সেবাটি চালু রেখেছি। শুরুতে ১১ জন স্বেচ্ছাসেবী নিয়ে কাজ শুরু করি।
তিনি জানান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ফ্রি অক্সিজেন দেয়ার প্রচারণা করি সেখানে অনেকে ম্যাসেজ দেয় আবার অনেকে ফোন করে। কারো অক্সিজেন প্রয়োজন এমন সংবাদ পাওয়া মাত্রই রোগীর ঠিকানায় নিজেরাই পৌঁছে দেই অক্সিজেন।
এসএম