ঢাকা মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

Motobad news

বিদায়ী ভাষণে যেসব বিষয়ে গুরুত্ব দিলেন প্রধান উপদেষ্টা

বিদায়ী ভাষণে যেসব বিষয়ে গুরুত্ব দিলেন প্রধান উপদেষ্টা
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি: সংগৃহীত
গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

টানা ১৮ মাস অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব শেষে নবনির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রাক্কালে জাতির উদ্দেশে বিদায়ী ভাষণ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাত ৯টা ১৫ মিনিটে দেয়া এই দীর্ঘ ভাষণে তিনি গত দেড় বছরের অর্জন, চ্যালেঞ্জ, সংস্কার কার্যক্রম, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন।

ভাষণে তিনি ১৭ বছর পর একটি সুষ্ঠু নির্বাচন ও জুলাই সনদের গণভোট সফল করার জন্য দেশবাসীকে অভিনন্দন জানান। একইসঙ্গে ৫ আগস্টের অভ্যুত্থান পরবর্তী কঠিন পরিস্থিতির বর্ণনা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নেয়া নানা পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন।

 
নির্বাচনী সফলতা ও গণতন্ত্রের সৌন্দর্য 
 
ভাষণের শুরুতেই প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর পর একটি উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ, রাজনৈতিক দল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এক প্রশংসনীয় নজির সৃষ্টি করেছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নির্বাচন কেমন হয়া উচিত, এটি তার চমৎকার উদাহরণ।
 
তিনি বলেন, ‘এই প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে যারা জয়ী হয়েছেন তাদের আমি অভিনন্দন জানাচ্ছি। যারা পরাজিত হয়েছেন তাদেরকেও আমি অভিনন্দন জানাচ্ছি। হার-জিতই হলো গণতন্ত্রের এক সৌন্দর্য। যারা জয়ী হয়েছেন তারা মোট ভোটের প্রায় অর্ধেক পেয়েছেন। যারা জয়ী হতে পারেননি তারাও মোট ভোটের অর্ধেক পেয়েছেন। যারা জয় হতে পারেননি তারা এই জেনে আশ্বস্ত হবেন যে প্রায় অর্ধেক ভোটার আপনাদের ওপর আস্থা রেখেছে।’
 
আগামী দিনে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে তাদের ১৮ মাসের দায়িত্বের সমাপ্তি ঘটবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
 

৫ আগস্টের স্মৃতি ও দায়িত্ব গ্রহণ 
 
দায়িত্ব নেয়ার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ৫ আগস্টের স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, ‘সে কি আনন্দের দিন! বাংলাদেশিরা দেশে-বিদেশে যে যেখানেই ছিল আনন্দে চোখের পানি ফেলেছিল। দৈত্যের গ্রাস থেকে তরুণ ছাত্র-ছাত্রীরা দেশকে বের করে এনেছে। দেশ মুক্ত হয়েছে। কিন্তু দেশ সম্পূর্ণ অচল। অভ্যুত্থানের ছাত্র নেতারা ঠিক করল দেশকে সচল করার জন্য একটি সরকার লাগবে। আমি তখন বিদেশে। আমি দায়িত্ব নিতে রাজি না। তারা জাতির প্রতি কর্তব্য পালনের কথা বলে আমাকে রাজি করাল।’
 
ভঙ্গুর প্রশাসন ও শুরুর চ্যালেঞ্জ 
 
সরকার গঠনের পর মুখোমুখি হওয়া চ্যালেঞ্জ নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রথম কাজ ছিল দেশকে সচল করা। এটি ছিল সবচাইতে কঠিন কাজ। যারা দেশকে লুটেপুটে খেত তারাই দেশের এই যন্ত্র চালাত। তাদের একান্ত অনুগত লোকজন নিয়ে অভ্যুত্থানের সঙ্গে সঙ্গে সবাই পালিয়ে গেছে। সরকারের ভেতর যারা পালিয়ে যাননি তাদের মধ্যে কাকে বিশ্বাস করবেন, কাকে বিশ্বাস করবেন না এটি মহাসঙ্কট হয়ে দাঁড়াল। যতই মৃতদেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গবিহীন দেহের সন্ধান আসছিল ততই তারা চিহ্নিত হচ্ছিল।’
 
সংস্কার, বিচার ও জুলাই সনদ 
 
অন্তর্বর্তী সরকারের তিনটি মূল দায়িত্ব ছিল সংস্কার, বিচার এবং নির্বাচন। প্রধান উপদেষ্টা জানান, তারা ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক ও আর্থিক সংস্কারে হাত দিয়েছেন যাতে ভবিষ্যতে কোনো সরকার জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিজেকে স্থাপন করতে না পারে।
 
তিনি বলেন, ‘চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় ১৩০টি নতুন আইন ও সংশোধনী প্রণয়ন করেছে এবং প্রায় ৬০০টি নির্বাহী আদেশ জারি করেছে, যার প্রায় ৮৪ শতাংশ ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। এই সংস্কারসমূহ নাগরিক অধিকারকে সংহত করেছে।’
 
জুলাই সনদকে অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদের বাস্তবায়ন হলে ফ্যাসিবাদের ফিরে আসার পথগুলো চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। অন্তর্বর্তী সরকারের ছোট বড় ভালো মন্দ অনেক কথা ভুলে গেলেও জুলাই সনদের কথা জাতি কখনো ভুলবে না।

পুলিশ ও বিচার বিভাগ সংস্কার 
 
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আজ পুলিশ আর মারণাস্ত্র ব্যবহার করে না। বেআইনিভাবে কাউকে তুলে নিয়ে যায় না। বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যা করে না। পুলিশ ও গোয়েন্দা বাহিনীর ভয়ে কাউকে ডিলিট বাটন চাপতে হয় না। জনবান্ধব পুলিশ গড়তে পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫ প্রণয়ন করা হয়েছে।
 
বিচার বিভাগ নিয়ে তিনি বলেন, সেপারেশন অব জুডিশিয়ারি-র জন্য মাজদার হোসেন মামলার রায় আমরা বাস্তবায়ন করে গেলাম। গুমকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করা হয়েছে।
 
নারী ও শিশু সুরক্ষা 
 
নারীদের অংশগ্রহণ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নারী ও শিশুর সুরক্ষায় যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধের অধ্যাদেশ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করা হয়েছে। নতুন এসব আইনের মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নারীদের হয়রানি প্রতিরোধ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার পথ সুগম করা হয়েছে।’
 
ফ্যাসিবাদের বিচার ও আয়নাঘর 
 
বিগত সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘স্বৈরাচারের ১৬ বছরে এদেশের রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা যে ভয়াবহ নিপীড়ন, গুম ও হত্যার শিকার হয়েছেন তা আমাদের জাতির জন্য এক গভীর বেদনাদায়ক শিক্ষা। যেন আর কখনো ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠিত না হয়, শত শত আয়নাঘর সৃষ্টি না হয়, বিচারবহির্ভূত হত্যা ফিরে না আসে—সেজন্য সংস্কার জরুরি।’
 
তিনি জানান, একাধিক ট্রাইব্যুনাল বর্তমানে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে এবং গুমের সংস্কৃতির বিচারও শুরু হয়েছে।

অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও পাচার হওয়া অর্থ 
 
অর্থনৈতিক অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা দায়িত্ব গ্রহণের সময় অর্থনীতি ছিল বিপর্যস্ত। তলাবিহীন অর্থনীতি আমাদের জন্য রেখে গিয়েছিল আগের ফ্যাসিবাদী সরকার। ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার করে নিয়ে গেছে। বিশাল ঋণের বোঝা রেখে গেছে।’
 
তবে বর্তমান পরিস্থিতির উন্নতি নিয়ে তিনি আশ্বস্ত করেন, ‘এখন যাওয়ার সময় স্বস্তি পাচ্ছি যে আমরা অবস্থার মোকাবেলা করতে পেরেছি। আমাদের রিজার্ভের পরিমাণ এখন ৩৪ বিলিয়ন ডলার। প্রবাসীদের রেমিটেন্সের টাকায় রিজার্ভ বাড়ছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।’
 
শ্রমিক অধিকার ও ব্লু ইকোনমি 
 
তিনি জানান, শ্রমিক অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার কনভেনশন অনুসমর্থন ও নতুন শ্রম আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এছাড়া ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে গভীর সমুদ্র বন্দর ও মৎস্য উন্নয়নে নতুন কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে।
 
পররাষ্ট্রনীতি ও রোহিঙ্গা সংকট 
 
পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘নতজানু পররাষ্ট্রনীতি কিংবা অপর দেশের নির্দেশনা ও পরামর্শনির্ভর বাংলাদেশ এখন আর নয়। বিশ্বের সকল দেশের সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
 
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে তিনি বলেন, ‘দায়িত্ব গ্রহণের পর আমরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মৃতপ্রায় এই ইস্যুকে পুনরায় বিশ্ব মনোযোগের কেন্দ্রে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি। জাতিসংঘের মহাসচিব নিজে বাংলাদেশ সফর করেছেন।’
 
সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন 
 
তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনামলে সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতার বিষয়টি উপেক্ষিত ছিল। আমরা অল্প সময়ের মধ্যেই সে অবস্থার মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা করেছি। বহিঃবিশ্বের সম্ভাব্য হুমকি ও আগ্রাসন মোকাবেলার জন্য সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী ও নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।’
 
তরুণদের সম্ভাবনা ও জনশক্তি রপ্তানি 
 
তরুণদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ আজ অমিত সম্ভাবনার দেশ। জাপান, কোরিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাসহ সবাই চাইবে বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের শ্রম ও মেধা ব্যবহার করতে। আমরা তাদের জন্য পছন্দের জনশক্তি সরবরাহকারী দেশ হয়ে উঠতে পারি।’
 
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য (যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও চীন) 
 
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও শুল্ক চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের শুল্ক হার ৩৭ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশে কমিয়ে আনা হয়েছে। এটি পোশাক শিল্পের জন্য মস্ত বড় সুবিধা।’
 
জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির ফলে অটোমোবাইল ও ইলেকট্রনিক্স শিল্পে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে তিনি জানান। এছাড়া চীনের সঙ্গে তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও নীলফামারীতে ১০০০ শয্যার হাসপাতাল তৈরির অগ্রগতির কথাও উল্লেখ করেন।
 

শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সততা 
 
ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য শিক্ষা ও সততার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘অতীতে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় সীমাহীন দুর্নীতি ও জালিয়াতিকে উৎসাহিত করা হয়েছিল। নতুন বাংলাদেশকে সেই পথ থেকে সরে আসতে হবে। আমাদের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে নিয়ম মানায় ও রাষ্ট্রকে দুর্নীতিমুক্ত করায়।’
 
জুলাই স্মৃতি জাদুঘর ও বিদায়ী আহ্বান 
 
ভাষণের শেষ পর্যায়ে তিনি ঘোষণা করেন, ‘ক্ষমতাবানদের ক্ষমতা মানুষকে কী রকম মনুষ্যত্বহীন করে তুলতে পারে, সেটা ধরে রাখার জন্য আমরা পলাতক প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনকে ‘জাতীয় জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে রেখে যাচ্ছি। যখন জনসাধারণের জন্য খুলে দেয়া হবে, আমি অনুরোধ করব, আপনারা সপরিবারে একবার এসে জাদুকরে কাটিয়ে যাবেন।’
 
বিদায়লগ্নে তিনি দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়ে বলেন, ‘আমরা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ছেড়ে গেলেও নতুন বাংলাদেশ গড়ার সার্বিক দায়িত্ব আমার, আপনার, আমাদের সবার। জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের জন্য এই দরজা খুলে দিয়েছে। দলমত নির্বিশেষে সবাইকে আহ্বান জানাই একটি ন্যায়ভিত্তিক মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে।’


এইচকেআর
গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন