আলোচিত ডিডাব্লিউএফ নার্সিং কলেজের দুর্নীতি তদন্তের নির্দেশ আদালতের

বরিশাল নগরীর অনিয়ম এবং দুর্নীতির আতুরঘরখ্যাত “ডিডাব্লিউএফ নার্সি কলেজে” বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর একটি মিস কেস (নং-০২/২০২৬) দায়ের ও স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস,এম শরিয়ত উল্লাহ ওই আদেশ দিয়েছেন।
তিনি পুলিশের নূন্যতম একজন উপ-পুলিশ কমিশনার দিয়ে অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রতিবেদন আগামী ১৫ জুনের মধ্যে দাখিল করতে বরিশাল মেট্রোপলিটন কমিশনারকে নির্দেশ দিয়েছেন। ১৭ মে বিচারকের স্বাক্ষরিত এমন একটি নথি এসেছে মতবাদের হাতে।
আদেশে ডিডাব্লিউএফ নার্সিং কলেজ কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট কেউ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণের নামে টাকা আদায় করে কি-না, টাকা আদায় করে থাকলে উক্ত টাকা গ্রহণে আর্থিক বিধান অনুসরণ বা লঙ্ঘন করা হয়েছে কি-না? কতজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মোট কত টাকা আদায় করা হয়েছে? উক্ত টাকা আদায়ের সাথে সুনির্দিষ্টভাবে কে কে জড়িত বা সম্পৃক্ত ছিল? এই লেনদেনের সাথে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কারও সম্পৃক্ততা আছে কি-না? সে বিষয়গুলো তদন্ত করতে বলা হয়েছে।
আদেশে বলা হয়েছে- বরিশাল মহানগরীর কোতয়ালী মডেল থানাধীন সিএন্ডবি রোডে অবস্থিত ‘ডিডাব্লিউএফ নার্সিং কলেজর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণে নামে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ সংক্রান্ত একটি সংবাদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সময় টিভিতে প্রচারিত হয়েছে। উক্ত টেলিভিশন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত কিছু সংবাদ অত্র ম্যাজিস্ট্রেটের নজরে এসেছে।
গত ১১ মে সময় টিভিতে প্রচারিত “বরিশালে নার্সিং প্রশিক্ষণের নামে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ” শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদের সার সংক্ষেপ তুলে ধরা হয় নথিতে।
এতে বলা হয়- ডিডাব্লিউএফ নার্সিং কলেজের বিএসসি নার্সিং কোর্সের প্রায় ২০০ জন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে সরকারি হাসপাতালে প্রশিক্ষণের নামে প্রতিজনে ১০ হাজার টাকা করে মোট ২৭ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। এই টাকা আত্মসাতের বিষয়টি জানাজানি হলে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা টাকা ফেরত পাওয়ার দাবিতে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল, শিক্ষকদের অবরুদ্ধকরণ এবং অনশন কর্মসূচি পালন করেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও শিক্ষার্থীরা তাদের অর্থ ফেরত পাননি।
উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি দাবি অর্থ আত্মসাতের এই অভিযোগের বিষয়ে ডিডাব্লিউএফ নার্সিং কলেজের চেয়ারম্যান মো. জহিরুল ইসলাম দাবি করেছেন, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ তিনি শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দিয়েছেন। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই দাবি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, সরকারি হাসপাতালে বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণের নামে এভাবে টাকা নেওয়ার কোনো আইনি সুযোগ বা বিধান নেই।
কাগজে-কলমে ১৫টি কলেজ, বাস্তবে অস্তিত্বহীন! অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, নিয়মানুযায়ী নিজস্ব ক্যাম্পাস বা ভবন থাকার কথা থাকলেও এই প্রতিষ্ঠানের তা নেই। চেয়ারম্যান জহিরুল ইসলাম পূর্বে আওয়ামী লীগের এবং বর্তমানে ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙিয়ে বরিশাল, পটুয়াখালী ও মাদারীপুরে কাগজে-কলমে ১৫টিরও বেশি কলেজ দেখালেও বাস্তবে সেগুলোর কোনো অস্তিত্ব নেই। এমনকি সরকারি কোনো তদন্ত দল পরিদর্শনে গেলে একই প্রতিষ্ঠানে দুটি ভিন্ন সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগে প্রকাশ।
এছাড়া প্রতিষ্ঠানের উক্ত চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে প্রতারণা, জালিয়াতি ও নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগে আদালতে একাধিক মামলা দায়ের হয়েছে।
আদালতের কঠোর পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনায় আদালত তার আদেশে উল্লেখ করেন, প্রকাশিত সংবাদটি সঠিক হয়ে থাকলে তা দণ্ডবিধির ৩৮৫/৪০৬/৪২০ ধারা, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ অনুযায়ী একটি গুরুতর শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এমন কর্মকাণ্ডে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক নষ্ট হচ্ছে এবং শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জনস্বার্থ ও ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্যে আদালত বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার পদমর্যাদার নিচে নন, এমন একজন কর্মকর্তা দিয়ে এই ঘটনার বিস্তারিত অনুসন্ধান করানো হয়। অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তাকে সরেজমিনে পরিদর্শন, খসড়া মানচিত্র প্রস্তুত এবং ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬১ ধারা অনুযায়ী সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণ করে আগামী ১৫ জুনের মধ্যে আদালতে সুনির্দিষ্ট প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
এই আদেশের অনুলিপি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, মহানগর দায়রা জজ, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, ডেপুটি কমিশনার এবং শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরে প্রেরণ করা হয়েছে।
এদিকে, আলোচিত ডিডাব্লিউএফ নার্সিং কলেজ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আদালতের এমন আদেশে স্বস্তি ফিরেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের মাঝে। তারা বলেন, সুষ্ঠু তদন্তে বেরিয়ে আসবে থরের বিড়াল। এমনকি ফেঁসে যেতে পারেন প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, জহিরুল ইসলাম।
এইচকেআর