ঢাকা রবিবার, ১৭ মে ২০২৬

Motobad news
শিরোনাম
  • দেশে উচ্চ রক্তচাপের রোগী আড়াই কোটি, নিয়ন্ত্রণে একগুচ্ছ পরামর্শ বরগুনায় জেলের বড়শিতে ধরা পড়ল ধূসর ডলফিন বরিশাল মহানগর ছাত্রদলের আহ্বায়ক তাসনিমের বাবার ইন্তেকাল ফেসবুকে এমপিকে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে নিলয় পারভেজ গ্রেফতার পলাশপুরে তিন নারীসহ আটক চার, ২৭১ পিস ইয়াবা উদ্ধার  পিরোজপুরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৭ দোকান পুড়ে ছাই বেতাগীতে ডাকাতের গুলিতে নিজ বাড়িতে গুলিবিদ্ধ মালিক, আটক ৩ নারায়ণগঞ্জে গ্যাস বিস্ফোরণে নিহত একই পরিবারের ৫ সদস্যকে পাশাপাশি কবরে সমাহিত  প্রেমিকার বয়স কম হওয়ায় পিরোজপুর ‍এসে ফিরে গেল চীনা যুবক কুয়াকাটা সৈকতে মিললো বিরল প্রজাতির ‘অলিভ রিডলি’ কচ্ছপ
  • দেশে উচ্চ রক্তচাপের রোগী আড়াই কোটি, নিয়ন্ত্রণে একগুচ্ছ পরামর্শ

    দেশে উচ্চ রক্তচাপের রোগী আড়াই কোটি, নিয়ন্ত্রণে একগুচ্ছ পরামর্শ
    ছবি: সংগৃহীত 
    গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

    নুরুল্লাহ (৫০)। কওমি মাদরাসার শিক্ষক। চাঁদপুরের কচুয়ার এই নাগরিক দীর্ঘদিন হৃদরোগে আক্রান্ত। কদিন পর পর দৌড়াতে হয় হাসপাতালে। বুকে ব্যথা উঠলেও তাৎক্ষণিক চিকিৎসা নিতে পারেন না। টাকা ম্যানেজ করে লোক নিয়ে আসতে হয়। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ব্যয় ও সেবা পাওয়ার দীর্ঘসূত্রতায় বিরক্ত এই শিক্ষক।

    জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে তার সঙ্গে কথা হয় সাংবাদিকের। বলেন, এই সেবা যদি আমাদের জেলা-উপজেলা পর্যায়ে পাওয়া যেত সহজ হত। সেই গ্রাম থেকে সকালে উঠে এখানে আসতে হয়। যাতায়াত ব্যয়ের পাশাপাশি ভোগান্তি তো আছেই। আর এই রোগ তো বড় কঠিন। টাকা ছাড়া গতি নাই। একবার এনজিওগ্রাম করছি। আবার করতে হবে। নানাবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধে অনেক খরচ।

    হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জের আবুল কালাম। তিনিও সেই অজপাড়া গ্রাম থেকে এখানে এসে চিকিৎসা নেন। তিনিও আক্ষেপ করে বলেন, এখানে সেবা পাই, কিন্তু যাতায়াতের ব্যয় ও কষ্ট বেশি। এই সেবা এলাকায় পাওয়া গেলে যাতায়াতের ব্যয় ও কষ্ট থাকতো না।

    বেরসরকারি টেলিভিশনের একজন প্রতিবেদকের সঙ্গে দেখা হয় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। তিনি ভর্তি থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছেন হৃদরোগের। তারও বক্তব্য এই রোগ সব কেড়ে নেয়।

    শুধু নুরুল্লাহ, আবুল কালাম বা সাংবাদিক নয়, প্রতিদিন জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসাপাতালে প্রায় দুই হাজার রোগী আসেন। জরুরি, বহিঃবিভাগসহ নানা বিভাগে তারা সেবা নেন। সারাদেশ থেকে এই একমাত্র সরকারি জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং বেসরকারি হার্ট ফাউন্ডেশনে রোগীরা আসেন বেশি। তিল ধারনের ঠাঁই থাকে না।

    সরকারি হিসাবে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। চিকিৎসকরা বলছেন, দেশের ২২-২৩ শতাংশ মানুষ এখন উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। নগরায়ন, ধূমপান, বায়ুদূষণ, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ ও শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়ার কারণে উচ্চ রক্তচাপ বাড়ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বহুমুখী ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

    তারা বলছেন, উচ্চ রক্তচাপ শুধু হৃদরোগ বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায় না, এটি ধীরে ধীরে রক্তনালীর স্বাভাবিক কার্যকারিতা নষ্ট করে বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি করে। অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ পুরুষদের ইরেক্টাইল ডিসফাংশনের কারণ হতে পারে, যা ভবিষ্যৎ হৃদরোগের আগাম সতর্কসংকেত।

    চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে ২০২৩ সালে ভর্তি হওয়া রোগীদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, মোট মৃত্যুর ৬২.৩ শতাংশই হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘটে। গবেষণাটি পরিচালনা করেন রাঙামাটি মেডিকেল কলেজ ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের একদল চিকিৎসক।

    গবেষণায় ১ হাজার ৯৪৪ জন মৃত রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মৃত্যুর প্রধান কারণ ছিল অ্যাকিউট মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন বা হার্ট অ্যাটাক (৫১ শতাংশ), এরপর হার্ট ফেইলিউর ও সংশ্লিষ্ট জটিলতা, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট এবং সেপসিস।

    গবেষকদের মতে, দেরিতে হাসপাতালে আসা, জরুরি স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা ও দুর্বল রেফারাল ব্যবস্থা এই উচ্চ মৃত্যুহারের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে।

    গবেষণায় আরও দেখা যায়, ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজ মোট মৃত্যুর ৬৬.৩ শতাংশের জন্য দায়ী এবং উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস ছিল সবচেয়ে বেশি। চিকিৎসকরা মনে করেন, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ, উন্নত করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) সেবা এবং অ্যাকিউট করোনারি সিন্ড্রোম ও হার্ট ফেইলিউরের সমন্বিত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে মৃত্যুহার কমানো সম্ভব। তবে নিম্ন-আয়ের দেশে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের স্বল্পতা, সিসিইউ সুবিধার সীমাবদ্ধতা এবং নন-কার্ডিয়াক জটিল রোগ ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রোগীদের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

    বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
    ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা খুব জরুরি। নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করতে হবে, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, কম লবণ ও কম চর্বিযুক্ত খাবার খেতে হবে এবং ধূমপান ও মদ্যপান সম্পূর্ণ পরিহার করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত হাঁটাচলা বা ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ কম রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। ডায়াবেটিস থাকলে সেটিও নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

    তিনি বলেন, উচ্চ রক্তচাপ একবার হলে তা পুরোপুরি সারে না, তবে নিয়মিত চিকিৎসা ও ওষুধের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। অনেকেই রক্তচাপ স্বাভাবিক হলে ওষুধ বন্ধ করে দেন, যা খুবই বিপজ্জনক। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনো ওষুধ বন্ধ করা যাবে না। নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ও চেকআপ করালে হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি বিকলসহ মারাত্মক জটিলতা থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

    বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ. এম. সিদ্দিকী বলেন, বাংলাদেশে প্রায় ২১ থেকে ২৩ শতাংশ মানুষ হাইপারটেনশনে ভুগছেন, তবে মাত্র ১৪ শতাংশ নিয়ন্ত্রণে। উচ্চ রক্তচাপ হার্ট, কিডনি, ব্রেইন, রক্তনালী ও চোখসহ পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি দীর্ঘস্থায়ী কার্যকারিতাসম্পন্ন ওষুধ ব্যবহার এবং কার্যকর ড্রাগ পলিসি প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।


    ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, দেশের ৩১০টি উপজেলায় এনসিডি কর্নারের মাধ্যমে গ্রামীণ জনগণকে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগসংক্রান্ত সেবা দেওয়া হচ্ছে। রোগীদের ওষুধ সরবরাহের সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।

    স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হেলথ সার্ভিস ডিভিশনের অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি বলেন, বর্তমানে ৩০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী প্রায় আড়াই কোটি মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, মানসিক চাপ ও তামাক ব্যবহার তরুণদের মধ্যেও হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। সরকার নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে নাগরিকদের সতর্কতা বা সচেতনতা প্রয়োজন। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করা দরকার।
     


    এইচকেআর
    গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ