ঢাকা রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬

Motobad news
ঈদের আগে-পরে নিহত ১০, আহত ১৬ 

থামছে না বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনা

থামছে না বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনা
ফাইল ছবি
গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কে একের পর ঘটে চলছে সড়ক দুর্ঘটনা। এতে যেমনি প্রাণ হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ, তেমনি পঙ্গুত্ব বরণ করছে অনেকেই। গত ৫ মে থেকে ১৩ জুন পর্যন্ত ঈদুল আজহার আগে-পরে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কে ১০টি দুর্ঘটনায় দশজন নিহত এবং অন্তত ১৬ জন আহত হয়েছেন। এর ভিতরে বেশিরভাই দুুর্ঘটনা ঘটেছে বাবুগঞ্জ, উজিরপুর ও গৌরনদী উপজেলায়। 

এই তিন উপজেলায় অতিঝূকিপূর্ণ হিসেবে পাঁচটি দুঘর্টনা স্থান চিহিৃত করেছেন গৌরনদী হাইওয়ে থানা পুলিশ। সবশেষ শনিবার (১৩ জুন) সকাল সোয়া ৯ টার দিকে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের গৌরনদীর দিকে উপজেলার আশোকাঠি এলাকায় ঢাকাগামী হানিফ পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসের চাপায় বাবুলাল বিশ্বাস (৪০) নামে এক ভ্যান চালক নিহত হয়েছে। নিহত বাবুলাল উজিরপুর উপজেলার জুমিরবাড়ি এলাকার সুখনন্দ বিশ্বাসের ছেলে। 

সড়ক ও পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মহাসড়কে এ প্রাণহানি ও দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম অপ্রশস্ত মহাসড়ক, যানবাহনের সংখ্যা ও চলাচল কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়া, বেপরোয়া গতি ও বাঁক।

সরেজমিনে দেখা যায়, পদ্মা সেতু চালুর পর বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কে যানবাহনের চাপ কয়েকগুণ বেড়েছে। দিন-রাত চলাচল করছে বিপুল সংখ্যক বাস, ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহন। ওভারটেকিং কিংবা ক্রসিংয়ের সময় পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যাচ্ছে অথবা অন্য গাড়ির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াচ্ছে। এছাড়া দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ফিটনেসবিহীন থ্রি-হুইলার, ইজিবাইকসহ অবৈধ যানবাহন। এর ফলে সড়কে বিশৃঙ্খলা যেমন বেড়েছে। 

অভিযোগ রয়েছে হাইওয়ে পুলিশের কঠোর নজরদারি না থাকায় সৃষ্টি হয়েছে এমন পরিস্থিতি। তবে বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে অসহায়ত্বের কথা বলছে, হাইওয়ে পুলিশ এবং বিআরটিএ।

বরিশাল বিআরটিএর তথ্যমতে, এ জেলায় নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ৯১ হাজার ৫৭৯। এর মধ্যে রয়েছে-মিনি ট্রাক, মোটরসাইকেল, পিকআপ ভ্যান, সিএনজি চালিত অটোরিকশা, মাইক্রোবাস, লেগুনা, কাভার্ড ভ্যান, মিনিবাস ইত্যাদি। তবে নিবন্ধন ছাড়া শুধু বরিশাল জেলায় অবৈধ এ যানবাহন সংখ্যা দুই লাখেরও বেশি। তবে পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পদ্মা সেতুর কল্যাণে ঢাকা-বরিশাল-কুয়াকাটাসহ দক্ষিণের ছয় জেলায় মহাসড়কের গাড়ি চলাচল দ্বিগুণ বাড়লেও সে অনুযায়ী সড়ক প্রশস্ত করা হয়নি। 

সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ), হাইওয়ে থানা এবং স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের সূত্রে জানা গেছে, ঈদুল আজহার আগে এবং পরে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কে ছোট-বড় মিলিয়ে ১০টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ঘটনাস্থলে কিংবা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া গুরুতর আহত হয়েছেন অন্তত ১৬ জন। তাদের অনেকেই স্থায়ী পঙ্গুত্ব নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। 

এর মধ্যে ৩১ মে শনিবার বিকেলে গৌরনদীতে যাত্রীবাহী লাবিবা গ্রুপের আহানাত পরিবহনের ধাক্কায় নিহত হয় মোটরসাইকেল চালক শাহ আলম (৩৯)।  তিনি উজিরপুরের সাতলা গ্রামের মৃত হানিফ বিশ্বাসের ছেলে। ২৬ মে মঙ্গলবার দুপুর ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের মদিনা স্ট্যান্ড, বার্থী বাসস্ট্যান্ড ও বাটাজোর এলাকায় পৃথক তিনটি সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের তিনজন নিহত ও চারজন আহত হন। নিহতরা হলেন, উজিরপুর উপজেলার ফিরোজ মাহমুদ (৩৭), তার স্ত্রী মনিরা বেগম ও শিশু কন্যা জান্নাত। ৮ জুন রাত ১২টার দিকে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের গৌরনদীর বাটাজোড় এলাকার কবি বাড়ির সামনে যাত্রীবাহী বাস ও মাহেন্দ্রার মুখোমুখি সংঘর্ষে মাহেন্দ্রা যাত্রী মমতাজ বেগম (৪৮) নিহত হন। এ ঘটনায় আরো দুইজন আহত হয়। নিহত মমতাজ বেগম কালকিনি উপজেলার পূর্ব দর্শনা গ্রামের মোস্তফা মোল্লার স্ত্রী। 

এছাড়া ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার ভূরঘাটা এলাকায়  বাসচাপায় আয়শা (২) নামে এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। নিহত আয়শা ওই এলাকার ইতালি প্রবাসী আবুল ঘরামির মেয়ে। ২২ মে রাতে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের বাবুগঞ্জ উপজেলার রাকুদিয়া নতুনহাট সংলগ্ন এলাকায় মো. সাগর (২২)  নামে এক যুবক নিহত হন। তিনি পটুয়াখালী জেলার দুমকি উপজেলার চেচরাবন্দী এলাকার বাসিন্দা। তার বাবার নাম মো. মিন্টু সরকার। 

এর আগে ৫ মে মঙ্গলবার উজিরপুরে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাসের চাপায় দাদি ও নাতি নিহত হন।  নিহতরা হলেন, পশ্চিম জয়শ্রী গ্রামের মৃত পান্নু কাজীর স্ত্রী রোকসানা ইয়াসমিন (৬৫) এবং তার ছেলে রুবেল কাজীর মেয়ে আরফা (৭)। এদিকে ৮ জুন সোমবার রাত পৌঁনে ১২টার দিকে উজিরপুরে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে শিকারপুর ইউনিয়নের নতুন শিকারপুর চৌরাস্তার উত্তর পাশে দুটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে অন্তত ১২ জন যাত্রী আহত হন। 

এছাড়া বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের রহমতপুর কাঁঠালতলা এলাকায় রোববার সকাল ৭টার দিকে দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই চালক গুরুতর আহত হন। 

বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের ইজিবাইক চালক মনির হোসেন বলেন, বরিশাল থেকে গৌরনদী পর্যন্ত আমরা গাড়ি চালাই। খুব অল্প পথে যাত্রীরা বাসে উঠতে চান না বলেই আমরা এ রুটে গাড়ি চালাই। এ অঞ্চলের যাত্রীদের যাতায়াতের বিকল্প পথ না থাকার কারণেই আমাদের এ পথে চলতে হয়।

একই রুটে নিয়মিত ভারী পণ্য নিয়ে আসা যাওয়া করেন ট্রাক চালক মিলন বিশ্বাস। তিনি বলেন, এই সড়কে বৈধ এবং অবৈধ যানবাহনের সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। যার মধ্যে ছোট যান অর্থাৎ থ্রি-হুইলার জাতীয় যানের সংখ্যাই বেশি।ছোট যানের কারণে আমরা গাড়িই চালাতে পারি না। হুট করেই সামনে চলে আসে। তখন কিছুই করার থাকে না। ছোট গাড়ির চালকদের ব্রেক ঠিকভাবে কাজ করে না, এরা গাড়ি চালানোর নিয়ম জানেনও না, মানেনও না।

বরিশাল জেলা বিআরটিএর সহকারী পরিচালক খালিদ মাহমুদ জানান, গাড়ির সংখ্যা এতবেশি যে, নিয়মিত অভিযান চালিয়েও নানা কারণে প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। এছাড়া বিআরটিএর পক্ষ থেকে চালকদের প্রায়ই প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রশিক্ষণ ও ভাতা নেওয়ার পরও চালকরা প্রশিক্ষণের কথাই ভুলে যাচ্ছে। এজন্য প্রতিনিয়ত ঘটে দুর্ঘটনা।

জেলা বাস মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মনোয়ার হোসেন বলেন, পদ্মা সেতুর কারণে আমাদের যাতায়াত অনেক সহজ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রাস্তা অত্যন্ত সরু হওয়ায় সেই সুবিধার বড় অংশ নষ্ট হচ্ছে। প্রতিনিয়ত পথচারী, যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকরা দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। বিভিন্ন সময় বিভাগীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সভায় বিষয়টি বলা হলেও এখন পর্যন্ত কোন কার্যকরি সুরাহ হয়নি। এ কারণে মহাসড়কে প্রতিনিয়তো সড়ক দুঘর্টনা ঘটছে। তিনি  দ্রুত সড়কটি প্রশস্ত করার দাবি জানান। 

সড়ক বিভাগের তথ্য মতে, বরিশাল বিভাগের ৩টি জাতীয় ও ২টি আঞ্চলিক মহাসড়ক রয়েছে, যার মধ্যে ৩টি জাতীয় মহাসড়কের ১০১ এবং ২টি আঞ্চলিক মহাসড়কের দৈঘ্য ১৬ কিলোমিটার বলে জানিয়েছেন বরিশাল সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নাজমুল ইসলাম।

তিনি বলেন, বরিশাল বিভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কটি। যানবাহনের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় দুর্ঘটনাও বাড়ছে। তিনি আরও বলেন, ভূমি অধিগ্রহনের কাজ চলমান রয়েছে। জমি পেলেই ৬ লেনের উন্নত করার কাজ শুরু করা হবে। এ কাজ সম্পন্ন হলে দুর্ঘটনা অনেক কাংশে কমে আসবে বলেন এই কর্মকর্তা।
 
তবে দক্ষিণাঞ্চলের এই সড়কটি দ্রুত সংস্কার ও প্রশস্ত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, তা না হলে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি আরও বাড়তে পারে।

হাইওয়ে পুলিশের গৌরনদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহসিন হোসেন বলেন, সর্তক করার পরেও মহাসড়ক থেকে থ্রি হুইলার নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। অনেক সময় তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হচ্ছে। তবে অন্যকোন সড়ক না থাকায় মহাসড়কে চলাচল করছে থ্রি হুইলার। 

তিনি আরও বলেন, মহাসড়কটি সরু ও যানবাহন বেড়ে যাওয়ার কারণে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।   

উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ২৫ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে পদ্মা সেতু উদ্বোধন করা হয়। এরপর ২৬ জুন থেকে এরপর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে শত শত যানবাহন এই রুট ব্যবহার করছে। 


 


এইচকেআর
গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন