অমর একুশে গ্রন্থমেলাঃ প্রহর না থাকলেও ছিল শিশুরা

ছুটির দিন। কিন্তু করোনাজনিত পরিস্থিতির কারণে গতবারের মতো এবারের মেলায়ও শিশুপ্রহর রাখা হয়নি। তাই গতকাল এবারের মেলার প্রথম শুক্রবার প্রহরবিহীন সময় কেটেছে শিশুদের। জনপ্রিয় শিশুতোষ অনুষ্ঠান সিসিমপুরের চরিত্র হালুম, টুকটুকি, ইকরিদের নিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বটতলায় শিশুচত্বরে খেলাধুলা ও আড্ডা দিতে না পেরে তাই মন খারাপ হয়েছে শিশু-কিশোরদের।
তবে শিশুপ্রহর না থাকলেও সারাদিনই আনাগোনা ছিল শিশুদের। মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, পছন্দের কার্টুন চরিত্রের সঙ্গে দেখা না হওয়ার কষ্ট শিশুরা মেটানোর চেষ্টা করেছে বই দেখে দেখে। তাদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে নানা কমিক্স চরিত্র, রূপকথা, গল্প, সায়েন্স ফিকশন, অঙ্ক নিয়ে মজার খেলা ও ছড়ার বই।
খিলগাঁও গভর্নমেন্ট হাইস্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র মেসবাহ আহমেদ সকালে এসেছিল বাবার হাত ধরে। শিশুপ্রহর না থাকায় মন তার কিছুটা খারাপ হয়েছে। মেসবাহ বলে, প্রতি বছর শিশুপ্রহরে ইকরি, হালুম, টুকটুকি ও শিকুদের সঙ্গে মজা করতাম। এবার আর তা করতে পারছি না। নতুন বইপত্র নেড়েচেড়ে দেখছি। 'খুব ভালো বন্ধু টুকটুকির' দেখা না পাওয়ায় মন খারাপ নাদিয়া আহমেদেরও।
সিসিমপুর স্টল ইনচার্জ নূর মো. আল রাজি বলেন, এটা আসলেই দুঃখের বিষয়, ইচ্ছে থাকার পরও এটা করতে পারছি না। বাচ্চারা জিজ্ঞেস করছে এটা হবে কিনা। অভিভাবকরাও জানতে চাইছে। বাংলা একাডেমি সুযোগ দিলে শিশুপ্রহর করা হবে।
এ বিষয়ে মেলা আয়োজক কমিটির সদস্য সচিব জালাল আহমেদ সমকালকে বলেন, করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে শিশুপ্রহর রাখা হবে।
সাহিত্য প্রকাশের ব্যবস্থাপক বাবুল সাহা জানালেন, শুক্রবার সকাল ১১টা থেকে মেলা শুরু হলেও সকালে তেমন দর্শনার্থীর ভিড় ছিল না। ভিড় বেড়েছে দুপুরের পর।
লেখক মেজবাহ উদ্দিন জানালেন, অধিকাংশ প্রকাশনীর এডিটিং প্যানেল না থাকায় লেখার মান যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না। ফসল হলে সেখানে আগাছাও থাকে। পাণ্ডুলিপি যথাযথভাবে পরিমার্জন ও সম্পাদন না করায় অনেকের লেখা মানসম্মত হচ্ছে না।
বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশনী সমিতির সভাপতি ফরিদ উদ্দিন বলেন, এবারের বইমেলায় প্রকাশনীর সংখ্যা বেড়েছে, নতুন অনেক লেখকের বইও প্রকাশ পাচ্ছে। কিন্তু মানসম্মত বইয়ের সংখ্যা বাড়েনি। আয়োজক কমিটি শুধু স্টল প্যাভিলিয়নের সংখ্যা বাড়াচ্ছে। কিন্তু প্রকাশকরা যাতে মানসম্মত বই প্রকাশ করেন, সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। তিনি বলেন, বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে এত বড় মেলা আয়োজন হচ্ছে, কিন্তু তারা বাংলা ভাষা ও সাহিত্য গবেষণার কাজটি কেন করছে না, এটি বোধগম্য নয়।
মেলার ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে সমিতির এ নেতা বলেন, মেলা প্রাঙ্গণে এখনও ড্রেসিং আলোকসজ্জার কাজ পুরোপুরি হয়নি। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি এ কাজগুলো করেনি। যথেষ্ট আলো নেই, মাঠের অনেক জায়গা উঁচুনিচু। সেখানে বালু ফেলা প্রয়োজন। শৌচাগারের অবস্থাও নাজুক। গত বৃহস্পতিবার বাংলা একাডেমির ডিজি নিজেই মেলা প্রাঙ্গণ পরিদর্শনের সময় শৌচাগারের নাজুক অবস্থার বিষয়টা তুলে ধরেছেন।
নতুন বই: গতকাল শুক্রবার মেলায় আসা নতুন বইয়ের মধ্যে রয়েছে শাহজাহান কবির বীরপ্রতীকের 'খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা' (মুক্তিযুদ্ধ), আগামী প্রকাশনীর মুহম্মদ ইউসুফ সিদ্দিকের 'মুদ্রিত শিলার মুখরিত লিপি' (ইতিহাস), (উপন্যাস), ঐতিহ্য থেকে মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস (সমাজতত্ত্ব), অক্ষর প্রকাশনী থেকে রফিকুর রশীদের 'শ্রেষ্ঠ গল্প' (গল্প) ইত্যাদি।
লেখকের মঞ্চে: গতকাল লেখকের মঞ্চে 'লেখক বলছি' অনুষ্ঠানে নিজেদের বই নিয়ে আলোচনা করেন আসলাম সানী এবং সাধনা আহমেদ। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করেন কবি রবীন্দ্র গোপ, হারিসুল হক, ওবায়েদ আকাশ এবং রনজু রাইম। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী গোলাম সারোয়ার, বেলায়েত হোসেন এবং রেজিনা ওয়ালী। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করেন জাহান বশিরের পরিচালনায় 'বিশ্বভরা প্রাণ'-এর শিল্পীরা।
মূল মঞ্চের অনুষ্ঠান: গতকাল শুক্রবার অমর একুশে বইমেলার চতুর্থ দিনে মেলা চলেছে সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেল ৩টায় বইমেলার মূল মঞ্চে ছিল 'আন্তর্জাতিক বলয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন' শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন বিশ্বজিৎ সাহা। আলোচনা করেছেন ইকবাল হাসান, তাজুল ইমাম এবং ইউসুফ রেজা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অসীম কুমার দে।
বিকেল ৪টায় বইমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় 'স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী : মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি' শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাহীদ রেজা নূর ও শহীদ ইকবাল। আলোচনায় অংশ নেন প্রশান্ত মৃধা ও আমিনুর রহমান সুলতান। সভাপতিত্ব করেন ভীষ্ফ্মদেব চৌধুরী।
'শতবর্ষে বিদ্রোহী লাখো কণ্ঠে উচ্চারণ': গতকাল শুক্রবার বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চে 'শতবর্ষে বিদ্রোহী লাখো কণ্ঠে উচ্চারণ' শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে 'বঙ্গবন্ধু ও নজরুল' শীর্ষক ডকুমেন্টারির মোড়ক উন্মোচন করা হয়। নজরুল চর্চা কেন্দ্রের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা (অব.) কর্নেল মঈনুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন অধ্যাপক ফেরদৌসী জাহান সিদ্দিকা ও মোহাম্মদ জাকীর হোসেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি নজরুল দৌহিত্রী খিলখিল কাজী। লাখো কণ্ঠে উচ্চারণের উদ্বোধন ঘোষণা করেন অনুষ্ঠানটির প্রধান অতিথি প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক, বাংলা একাডেমির সভাপতি সেলিনা হোসেন।
আজকের আয়োজন: আজ শনিবার অমর একুশে বইমেলার পঞ্চম দিন। মেলা চলবে সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে 'স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী : উন্নয়নের নারী' শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন জোবাইদা নাসরীন। আলোচনায় অংশ নেবেন ফওজিয়া মোসলেম এবং তাসমিমা হোসেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন নাছিমা বেগম এনডিসি।
সূত্রঃ সমকাল
এসএম