বরিশালে দর্জি দোকানে দিগুণ বেড়েছে মজুরি

ঈদ মানেই নতুন পোশাকের উচ্ছ্বাস। সেই উচ্ছ্বাসের রঙিন কাপড় এখন ছড়িয়ে আছে বরিশাল নগরীর দর্জি দোকানগুলোতে। কিন্তু রঙিন এই প্রস্তুতির ভেতরেই রয়েছে হিসাব-নিকাশের চাপ। আনন্দের উৎসব সামনে রেখে অনেক পরিবারের বাজেটের খাতায় এবার নতুন করে যোগ হয়েছে দ্বিগুণ সেলাই মজুরি।
ঈদকেন্দ্রিক নগরীর অলিগলি, বাজার আর আবাসিক এলাকার ছোট-বড় দর্জি দোকানগুলোতে এখন যেন উৎসবের আমেজ। দোকানের ভেতরে ঝুলছে রঙিন কাপড়, টেবিলে ছড়িয়ে আছে মাপের খাতা, মেশিনের শব্দে মুখর চারপাশ। সকাল থেকে গভীর রাত, কোথাও কোথাও ভোর পর্যন্ত চলছে সেলাইয়ের কাজ। তবে এ ব্যস্ততার মাঝেই ক্রেতাদের কপালে নতুন ভাঁজ। কারণ নারীদের পোশাকের মজুরি আগের তুলনায় বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ।
নারীদের সুতি থ্রি-পিস বানাতে যেখানে আগে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা নেওয়া হতো, এখন সেখানে গুণতে হচ্ছে ৬০০ টাকা। জর্জেটের থ্রি-পিসে, যা আগে ৬০০-৬৫০ টাকায় তৈরি হতো, এখন সেই মজুরি চাওয়া হচ্ছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা।
নগরের কাটপট্রি, রূপাতলী, সাগরদী, হাউজিং, হাসপাতাল রোড, বিএম কলেজ রোড ঘুরে কথা বলে দর্জি ও ভোক্তাদের কাছ থেকে উঠে এসেছে এমন চিত্র।
নগরের রূপাতলী নলছিটি প্লাজার একটি ছোট দর্জি দোকানে ঢুকতেই দেখা গেলো, একপাশে তিনজন কর্মচারী মেশিনে ব্যস্ত, সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকজন নারী ক্রেতা মাপ দিচ্ছেন। দোকান মালিক মো. হায়দার ইসলাম বলেন, ঈদের আগে চাপ তো থাকেই, কিন্তু এবার চাপটা বেশি। কর্মচারীদের ওভারটাইম দিতে হচ্ছে, বিদ্যুৎ বিল বেড়েছে, সুতা-আনুষঙ্গিক জিনিসের দামও বেড়েছে। তাই মজুরি না বাড়িয়ে উপায় ছিল না।
একই এলাকার আরেক দর্জি সুমন মিয়া বলেন, আগে ৪০০ টাকায় সুতির থ্রি-পিস বানাতাম। এখন ৬০০ টাকার নিচে সম্ভব নয়। ঈদের পর আবার ৪০০ টাকা করে রাখবো। জর্জেটের কাপড়ে কাজ বেশি তাই ১ হাজার ২৫০ টাকা নিচ্ছে। ঈদের পর সাড়ে ৬০০ টাকায় বানিয়ে দেব।
হাউজিং এলাকার বাসিন্দা তাহমিনা বেগম অবশ্য বলছেন ভিন্ন কথা। কাপড় কিনতেই অনেক খরচ। তার ওপর সেলাইয়ে যদি ৬০০ টাকা লাগে, তাহলে আমাদের মতো নিম্নআয়ের মানুষের জন্য চাপ হয়ে যায়। তবু ঈদ বলে কথা, বাচ্চাদের জন্য তো বানাতেই হবে।
শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) নগরীর সাগরদী এলাকায় গভীর রাতেও দর্জি দোকান খোলা দেখা যায়। দোকানের ভেতরে ঝুলছিল ডেলিভারির অপেক্ষায় থাকা পোশাক। দর্জি আবদুল কাদের বলেন, এখন প্রতিদিন রাত ১টা-২টা পর্যন্ত কাজ করছি। কাজের চাপ এত বেশি যে নতুন অর্ডার নিতে ভয় লাগে। খরচ বাড়ার কারণে মজুরি বাড়াতে হয়েছে।
হাসান আলী নামে আরেক দর্জি জানান, জর্জেট খুব পিচ্ছিল কাপড়। কাটতে-সেলাই করতে সময় বেশি লাগে। আগে ৬৫০ টাকায় কাজ করতাম। এখন ১ হাজার ৩০০ টাকা নিচ্ছি। না হলে খরচই উঠবে না। ঈদের পর আগের দাম অর্থাৎ ৬৫০ টাকা করে রাখবো।
বিএম কলেজছাত্রী নিলা রহমান বলেন, একই ডিজাইনের সুতির থ্রি-পিস বানাতে আগে যেখানে ৩৫০-৪০০ টাকা লাগত, এখন সব দোকানেই ৬০০ টাকা চাইছে। বাজেট মেলাতে কষ্ট হচ্ছে। তবু রেডিমেডে ঠিকমতো ফিটিং পাই না, তাই দর্জির কাছেই আসতে হয়।
রূপাতলী মাওলানা ভাসাণী সড়কের একটি বাসায় ভাড়া থাকেন শাহিনা আক্তার। তিনি বলেন, রোজার আগে সুতির থ্রি-পিস ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকার মধ্যে বানিয়েছি। এখন সেই থ্রি-পিসের মজুরি চাচ্ছে ৬০০ টাকা। আগে এক এক দোকানে এক এক মজুরি চাইতো, এখন সবাই একই মজুরি চাচ্ছে।
কাঠপট্রি এলাকায় একাধিক দর্জি দোকানে গিয়ে দেখা যায় একই চিত্র। ভিড়, ব্যস্ততা, আর বাড়তি মজুরি নেওয়ার অভিযোগ। দর্জি নাসির উদ্দিন বলেন, ৪০০ টাকায় এখন সুতির থ্রি-পিস বানানো সম্ভব নয়। এখন বানাতে হলে ৬০০ টাকা লাগবে। ঈদের কয়েকদিন পর আসলে ৩৫০ টাকায় বানিয়ে দেব।
এদিকে সেলাই মজুরির কারণে অনেকেই এখন রেডিমেড পোশাকের দিকে ঝুঁকছেন। বাসিন্দা আফরোজা আক্তার বলেন, ঈদ উপলক্ষে বাসায় পরার জন্য দুটি থ্রি-পিসের কাপড় কিনেছিলাম। কিন্তু মজুরি চাচ্ছে দ্বিগুণ, তাই তৈরি করিনি। ৮০০ টাকা দিয়ে কাপড় কিনে, মজুরি ৬০০ টাকা দেওয়া সম্ভব নয়। তাই ঠিক করেছি ঈদের পর তৈরি করব। এখন ঈদের জন্য ১ হাজার টাকার মধ্যে রেডিমেড একটা থ্রি-পিস কিনবো।
একটি দর্জি দোকানের সামনে থেকে রিনা বেগম বলেন, আমার রেডিমেড থ্রি-পিস ঠিকমতো ফিট হয় না, তাই সব সময় বানানো থ্রি-পিস পরি। মজুরির খোঁজ নিতে এসেছিলাম। এবার ঈদ সামনে রেখে থ্রি-পিসের মজুরি অনেক বেড়ে গেছে। সবাই সুতি থ্রি-পিসের মজুরি চাচ্ছে ৬০০ টাকা। এত মজুরি দিয়ে বানানো সম্ভব নয়। তাই মার্কেট থেকে রেডিমেড কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
এইচকেআর