ইতালি নেয়ার আশ্বাসে লিবিয়ার ভূমিতে জিম্মিদশায় বরিশালের ৯ যুবক!

বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলায় একদল যুবক ইতালিতে কাজের আশায় জমি বিক্রিসহ ঋণ করে বিপুল অর্থ দিয়েছেন দালালদের হাতে। কিন্তু ইউরোপে পৌঁছার আগেই তাঁদের স্বপ্ন থেমে গেছে লিবিয়ায়। চাকরির প্রলোভনে দালাল চক্রের মাধ্যমে সেখানে গিয়ে উল্টো জিম্মিদশায় নির্যাতনের শিকার হতে হয় তাঁদের। এর মধ্যে মুক্তিপণ দিয়ে কয়েকজন দেশে ফিরলেও এখনও জিম্মি অবস্থায় রয়েছে ৯ যুবক।
এ ঘটনায় ইতালিতে পাঠানোর নামে লিবিয়ায় পাচার, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা ৩৪ ব্যক্তিকে আসামি করে তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই মামলায় আসামিরা হলেন- আগৈলঝাড়া উপজেলার পশ্চিম ডুমুরিয়া গ্রামের মৃত আইউব আলীর ছেলে জামাল মোল্লা, তাঁর ইতালিপ্রবাসী দুই ছেলে জাকির মোল্লা ও সাকিব মোল্লা, জামাল মোল্লার দুই শ্যালক পূর্ব ডুমুরিয়া গ্রামের মৃত বুদাই ব্যাপারীর ছেলে বাবুল ব্যাপারী ও হাবুল বেপারী ওরফে হাবুল মেম্বার।
উপজেলার রাজিহার ইউনিয়নের ছোট ডুমুরিয়া গ্রামের মেহেদী হাসান খান বরিশাল মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে নিজে বাদী হয়ে এসব মামলা দায়ের করেন। ট্রাইব্যুনালের বিচারক অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে আগৈলঝাড়া থানার ওসিকে মামলার নির্দেশ দেন। আসামি জামাল মোল্লা ও তাঁর দুই শ্যালক বাবুল ব্যাপারী এবং হাবুল ব্যাপারী বর্তমানে বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছে। তবে জামালের দুই ছেলে ইতালিতে থাকায় মামলার তদন্ত কিছুটা ধীরগতিতে চলছে বলে জানা গেছে।
বাদীর অভিযোগ, ইতালিতে বৈধভাবে ওয়ার্ক পারমিটের মাধ্যমে চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দেন জামাল মোল্লা। তিনি দাবি করেন, তাঁর ইতালিপ্রবাসী দুই ছেলে জাকির ও সাকিবের মাধ্যমে ইতালিতে কাজের ব্যবস্থা করা সম্ভব। এই আশ্বাসে ভুক্তভোগীরা জমি বিক্রি, ঋণ ও ধারদেনা করে টাকা জোগাড় করেন। প্রথমে তাদের উপস্থিতিতে বাবুল ব্যাপারী ও হাবুল ব্যাপারীর সম্মতিতে জামাল মোল্লার হাতে লক্ষাধিক টাকা দেওয়া হয়। পরে আসামিদের দেওয়া পূবালী ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে ধাপে ধাপে টাকা পাঠানো হয়। সব মিলিয়ে প্রত্যেকে প্রায় ১৮ লাখ টাকা পরিশোধ করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বাদী মেহেদী হাসান জানান, তাঁকে ইতালি পাঠানোর কথা বলে প্রথমে সৌদি আরবে নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে মিসর হয়ে লিবিয়ায় নিয়ে অজ্ঞাত স্থানে আটকে রাখা হয়। সেখানে ঠিকমতো খাবার না দিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। পরে লিবিয়ার পুলিশ দিয়ে গ্রেপ্তার করিয়ে বেনগাজির বাংকিনা কারাগারে পাঠানো হয়। সেখানে প্রায় দেড় মাস বন্দী ছিলেন। পরে ভিডিও কলে পরিবারের সদস্যদের কাছে নিজের করুণ অবস্থার কথা জানান মেহেদী। তবে তাঁর খোঁজ জানতে চাইলে দালালরা পরিবারকে জানায়, তাঁকে ইতালির কোস্টগার্ড রিসিভ করেছে।
পরে মেহেদীর পরিবারের কাছে তাঁর মুক্তির জন্য আরও ৮ লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে তাঁকে হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ধারদেনা করে ওই টাকা পরিশোধের পর তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। দেশে ফিরে মেহেদী জানতে পারেন, একইভাবে আরও অনেক যুবক প্রতারণার শিকার হয়েছেন। ভুক্তভোগীদের স্বজনরা জানান, কয়েকটি জেলার মোট ১০৮ জন দালালের মাধ্যমে ইতালিতে যাওয়ার চেষ্টা করেন। প্রত্যেকে ১৫ থেকে ১৮ লাখ টাকা দিয়ে ‘বডি কন্ট্রাক্টে’ ভূমধ্যসাগর হয়ে ইতালি যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। মেহেদী হাসানের মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আগৈলঝাড়া থানার এসআই মনিরুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।