ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬

Motobad news
শিরোনাম
  • বরিশালে জনসাধারণের চলাচলের পথ দখল, ৩ ব্যক্তিকে অর্থদণ্ড  কুয়াকাটায় পর্যটকের ভাটা, বিপাকে পর্যটন খাত  ভোলায় টানা বৃষ্টিপাতে পানিবন্দি ২৫ হাজার মানুষ  বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালককে অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভ অব্যাহত তথ্যমন্ত্রীর সাথে মিশরের রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাতে যৌথ মিডিয়া ফোরাম গঠনের প্রস্তাব কাজ হারাতে পারেন অসংখ্য শ্রমিক, ভয়াবহ গ্যাস সংকটের মুখে দেশ আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচ ঘিরে বিতর্কে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করল ফিফা পলাতক তিন পুলিশ কর্মকর্তা চাকরিচ্যুত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বরিশাল সফর সফল করার লক্ষ্যে প্রস্তুতিমূলক সভা বরিশালে হকার্স মার্কেটের উদ্বোধন
  • কুয়াকাটায় পর্যটকের ভাটা, বিপাকে পর্যটন খাত 

    কুয়াকাটায় পর্যটকের ভাটা, বিপাকে পর্যটন খাত 
    গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

    মারিয়াম আক্তার, কুয়াকাটা থেকে ফিরে ॥
    এক সময় ছুটির দিনে কুয়াকাটার হোটেলে কক্ষ পাওয়া ছিল সোনার হরিণ। এখন সেই কুয়াকাটাতেই দিনের পর দিন ফাঁকা পড়ে থাকে আবাসিক হোটেলের শত শত কক্ষ। পর্যটক টানতে অনেক হোটেল অর্ধেকেরও কম ভাড়ায় কক্ষ ছেড়ে দিলেও মিলছে না আশানুরূপ সাড়া। ফলে শুধু হোটেল-মোটেল নয়, পর্যটনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পুরো স্থানীয় অর্থনীতিই এখন মন্দার চাপে। রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ট্রলার-স্পিডবোট, পর্যটক গাইড, বিচ ফটোগ্রাফার, স্মারকসামগ্রীর দোকান, ভ্রাম্যমাণ খাদ্য ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে হাজারো শ্রমজীবী মানুষের আয় কমে গেছে উল্লেখযোগ্যভাবে।

    সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের পরিবহন দুর্ভোগ, অপরিচ্ছন্ন সৈকত, পর্যটক হয়রানি এবং নতুন পর্যটন স্পট তৈরি না হওয়ায় দিনে দিনে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটা হারাচ্ছে পর্যটকের আগ্রহ। এতে কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

    পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, কুয়াকাটায় বর্তমানে তিন শতাধিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। কিন্তু বছরের অধিকাংশ সময় এসব আবাসিক হোটেলে মিলছে না পর্যটক। ফলে অধিকাংশ আবাসিক হোটেলগুলোর সব কক্ষ ভাড়া হয়না বহু বছর; অধিকাংশ কক্ষই ফাঁকা থাকছে। তাই শীতকাল ও দুই ঈদ ছাড়া পর্যাপ্ত পর্যটক না থাকায় অধিকাংশ ব্যবসায়ী মাসের পর মাস লোকসান গুনছেন। অনেকেই ব্যাংকঋণের কিস্তি ও কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করতেও হিমশিম খাচ্ছেন।

    ব্যবসায়ীরা জানান, পর্যটক কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু আবাসন খাতে সীমাবদ্ধ নেই। সৈকতকেন্দ্রিক ছোট ছোট ব্যবসাও বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। রেস্তোরাঁ, চায়ের দোকান, স্মারকসামগ্রী বিক্রেতা, ঝিনুক ও হস্তশিল্পের দোকান, শুকনো মাছের ব্যবসায়ী, বিচ ফটোগ্রাফার, মোটরসাইকেল ও অটোরিকশাচালক, ট্রলার ও স্পিডবোট মালিক, স্থানীয় গাইডসহ প্রায় সব শ্রেণির উদ্যোক্তার আয় কমেছে। একই সঙ্গে হাজারো কর্মচারীর কর্মসংস্থানও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

    পর্যটন খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, কুয়াকাটার অন্যতম বড় সমস্যা যোগাযোগব্যবস্থা। ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে ভাঙ্গা পর্যন্ত দ্রুত যাতায়াত সম্ভব হলেও এরপর বরিশাল হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত দীর্ঘ পথের বেশিরভাগই সরু মহাসড়ক। অনেক স্থানে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, বাজার, অস্থায়ী বাসটার্মিনালের কারণে যানজট সৃষ্টি হয়। এতে দীর্ঘ সময় ধরে ভ্রমণ করতে হয় পর্যটকদের। সহজ যোগাযোগের অভাব অনেককে কুয়াকাটার পরিবর্তে অন্য গন্তব্য বেছে নিতে উৎসাহিত করছে। 

    এদিকে কুয়াকাটা বাস টার্মিনালে পৌঁছানোর পরও পর্যটকদের স্বস্তি মিলছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন হোটেলের কর্মচারীদের অতিরিক্ত প্রচারণা, অটোরিকশাচালকদের অতিরিক্ত ভাড়া দাবিসহ নানা ধরনের অনাকাক্সিক্ষত আচরণ অনেক পর্যটকের কাছে বিরক্তিকর অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

    সৈকতের পরিচ্ছন্নতা নিয়েও অসন্তোষ বাড়ছে। বিভিন্ন স্থানে প্লাস্টিক, খাবারের মোড়ক, ভাঙা কাচের বোতলসহ নানা ধরনের বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা যায়। পর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে সৈকতের সৌন্দর্য যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও। পর্যটকদের অভিযোগ, কিছু খাবারের দোকানে অতিরিক্ত দাম নেওয়ার পাশাপাশি নিম্নমানের খাবার পরিবেশনের ঘটনাও ঘটে।

    স্থানীয়রা বলেন, গত কয়েক দশকে উপকূলীয় ভাঙনে কুয়াকাটার সৈকতের উল্লেখযোগ্য অংশ সাগরে বিলীন হয়েছে। ভাঙন প্রতিরোধে উপকূলে ফেলা জিও ব্যাগ অনেক স্থানে সৈকতের স্বাভাবিক সৌন্দর্য নষ্ট করেছে। অসতর্ক পর্যটক এসব জিও ব্যাগে হোঁচট খেয়ে আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

    ব্যবসায়ীরা আরও বলছেন, কুয়াকাটায় নতুন পর্যটন আকর্ষণ খুব একটা তৈরি হয়নি। একই দর্শনীয় স্থান বারবার ঘুরে দেখার কারণে অনেক পর্যটকের আগ্রহ কমে গেছে। বিদেশি পর্যটকদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা এবং আলাদা ব্যবস্থাপনার অভাবও পর্যটন বিকাশে বাধা হয়ে আছে।

    পর্যটকের সংখ্যা প্রত্যাশামতো না বাড়লেও কুয়াকাটায় নতুন নতুন হোটেল নির্মিত হয়েছে। এতে প্রতিযোগিতা বেড়েছে, কিন্তু আয় বাড়েনি। বরং অনেক উদ্যোক্তা নতুন ভবন নির্মাণ শুরু করেও মাঝপথে কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন। কেউ কেউ বিনিয়োগ স্থগিত রেখেছেন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কারণে।

    রাজধানী ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা পর্যটক রাকিব হোসেন বলেন, কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এখনও দারুণ। কিন্তু বাসস্ট্যান্ডে নেমেই অটোচালক ও বিভিন্ন হোটেলের লোকজনের আচরণ খুবই বিরক্তিকর। সৈকতের বিভিন্ন জায়গায় ময়লা-আবর্জনাও চোখে পড়ে। এসব সমস্যার সমাধান হলে পর্যটক আরও বাড়বে।

    খুলনা থেকে আসা পর্যটক সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, আগে কয়েকবার কুয়াকাটায় এসেছি। এবার এসে দেখলাম সৈকতের কিছু অংশে সৌন্দর্য আগের মতো নেই। অনেক খাবারের দোকানে নিম্নমানের খাবারও বিক্রি করতে দেখেছি। পর্যটকদের জন্য আরও পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ নিশ্চিত প্রয়োজন বলে জানান তিনি।

    সৈকতে প্রায় এক দশক ধরে কাজ করা ফটোগ্রাফার মো. বশির বলেন, আগে ঈদের সময় প্রতিদিন চার হাজার টাকার মতো আয় হতো। এবারের ঈদে কোনো দিন ১২শ টাকার বেশি হয়নি। প্রতি বছর পর্যটক কমছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের পেশা টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।

    আল হেরা হোটেলের মালিক নূর আলম বলেন, একসময় কক্ষে জায়গা না পেয়ে পর্যটকদের অপেক্ষা করতে হতো। এখন উল্টো অনেক কক্ষ খালি থাকে। ভাড়া কমিয়েও পর্যটক পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক সময় কর্মচারীদের বেতন দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।

    কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, পর্যটনখাতের বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক উদ্যোক্তা হতাশ। সংকট কাটাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, সৈকতের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং পর্যটকবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

    পটুয়াখালী অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মাসুদ উল আলম বলেন, কুয়াকাটার সার্বিক উন্নয়নে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে একটি মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে কুয়াকাটাকে গড়ে তুলতে অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও পর্যটকসেবার মান বাড়ানোর বিষয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে কুয়াকাটা নতুন করে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।


     


    এইচকেআর
    গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ