সাদা ঝিনুকে ছেয়ে গেছে কুয়াকাটা সৈকত

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের জন্য কুয়াকাটা বরাবরই পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়। তবে এবার সেই চিরচেনা সৌন্দর্যে যুক্ত হয়েছে নতুন এক নান্দনিকতা। সৈকতের বিস্তীর্ণ বালুচরে ছড়িয়ে পড়েছে অসংখ্য সাদা ঝিনুক। নীল সমুদ্রের জল আর সাদা ঝিনুকের মেলবন্ধনে অনেকটা সাদা গালিচার মতো দেখাচ্ছে সৈকত। ভোরের আলো ফুটতেই জোয়ারের পানি সরে গেলে কুয়াকাটার বিভিন্ন অংশে চোখে পড়ে ঝিনুকের এই সমারোহ।
বিশেষ করে তিন নদীর মোহনা, গঙ্গামতী, লেম্বুরচর ও দোলনা পয়েন্টসহ সৈকতের বিভিন্ন এলাকায় ছোট-বড় অসংখ্য ঝিনুক ছড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। কোথাও সারি সারি ঝিনুক, কোথাও আবার অগভীর পানির সঙ্গে মিশে থাকা সাদা খোলস। সবমিলিয়ে সৈকতজুড়ে তৈরি হয়েছে অন্যরকম এক সৌন্দর্য।
কুয়াকাটার ঝিনুকের সৌন্দর্য দেখতে হলে সময়টাও গুরুত্বপূর্ণ। জোয়ারের সময় সৈকতের বড় অংশ পানিতে ডুবে থাকায় ঝিনুকগুলো চোখে পড়ে না। কিন্তু ভাটার পানি নেমে গেলে বালুচরে ফুটে ওঠে ঝিনুকের সাদা আবরণ। সকালের নরম আলোয় সাদা ঝিনুকের ওপর সূর্যের আলো পড়ে তৈরি করে মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। সৈকতে হাঁটতে হাঁটতে পর্যটকরা ঝিনুক দেখছেন, ছবি তুলছেন। আবার কেউবা পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের সঙ্গে স্মৃতি ধরে রাখছেন ক্যামেরায়।
কেন আসে এত ঝিনুক?
স্থানীয়দের ভাষ্য, জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহের সঙ্গে সমুদ্র থেকে বিভিন্ন ধরনের ঝিনুক ও শামুক সৈকতের দিকে ভেসে আসে। জোয়ারের পানিতে এগুলো তীরে পৌঁছানোর পর ভাটার সময় পানি সরে গেলে বালুচরে পড়ে থাকে।
কুয়াকাটার দীর্ঘদিনের বাসিন্দা ও স্থানীয় জেলেদের মতে, প্রতিবছরই কোনো না কোনো সময়ে সৈকতে ঝিনুক দেখা যায়। তবে সব বছর একই পরিমাণে দেখা যায় না। সমুদ্রের ঢেউ, জোয়ার-ভাটার প্রবাহ, আবহাওয়া, স্রোত ও উপকূলের প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে সৈকতে ঝিনুকের উপস্থিতি কম-বেশি হতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে সৈকতের তীরে বসবাসকারী স্থানীয় জেলে মাহাবুব বলেন, ছোটবেলায় সৈকতে হাজার হাজার ঝিনুক ভেসে আসতে দেখেছেন। মাঝখানে কয়েক বছর তুলনামূলকভাবে কম দেখা গেছে। তবে গতবছর থেকে আবার ঝিনুকের উপস্থিতি বাড়ছে। তার মতে, এটি স্থানীয়দের পাশাপাশি পর্যটকদের জন্যও আনন্দের বিষয়।
স্থানীয় মোখলেছুর রহমান ৪০ বছর ধরে এই সৈকতে মাছ ধরার সঙ্গে জড়িত। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, জোয়ার-ভাটার সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে সাগর থেকে ঝিনুক ভেসে আসে। তবে সব বছর একই পরিমাণে দেখা যায় না। এবছর সৈকতের বিভিন্ন অংশে তুলনামূলকভাবে বেশি ঝিনুক দেখা যাচ্ছে।
কোন সময়ে বেশি দেখা যায়?
সৈকতের ঝিনুকের উপস্থিতি কোনো নির্দিষ্ট দিন বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্থায়ী নয়। তবে স্থানীয় পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বর্ষা শেষে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে শীত মৌসুম পর্যন্ত ঝিনুকের দেখা মেলে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর ও শীতের শুরুর দিকের সময়ে জোয়ার-ভাটার অনুকূল পরিস্থিতিতে সৈকতের বিভিন্ন অংশে ঝিনুকের দেখা মিলতে পারে। তবে এটি প্রতিবছর একই সময়ে বা একই পরিমাণে হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সমুদ্রের স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি ও আবহাওয়ার ওপর এর উপস্থিতি অনেকটাই নির্ভরশীল।
বন বিভাগ লেম্বুরবন বিট কর্মকর্তা আমির হামজা বলেন, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে শীত মৌসুম পর্যন্ত সৈকতে ঝিনুকের প্রাচুর্য তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা এসব ঝিনুক ও মোহনার জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পর্যটকদের সচেতন হওয়া জরুরি।
কতদিন থাকে এই সৌন্দর্য?
ঝিনুক সৈকতে এসে একটানা কয়েক মাস একই জায়গায় পড়ে থাকে না। জোয়ার-ভাটার পরিবর্তনের সঙ্গে এগুলোর অবস্থানও বদলে যায়। কোনো দিন একটি নির্দিষ্ট এলাকায় বেশি ঝিনুক দেখা গেলেও পরদিন ঢেউ বা স্রোতের কারণে সেগুলো অন্যত্র সরে যেতে পারে। ফলে কুয়াকাটার ঝিনুকের সৌন্দর্যকে একটি চলমান প্রাকৃতিক দৃশ্য বলা যায়। প্রতিদিন একই জায়গায় একই পরিমাণ ঝিনুক পাওয়া যাবে এমনও নয়। ভাটার সময় সৈকতের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখলেই এই প্রাকৃতিক আয়োজনের দেখা মিলতে পারে।
পর্যটকদের চোখে নতুন আকর্ষণ
কুয়াকাটায় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা আসেন। এর সঙ্গে এবার যোগ হয়েছে ঝিনুকের সৌন্দর্য। পর্যটকদের অনেকেই বলছেন, সমুদ্রের নীল পানির সঙ্গে সাদা ঝিনুকের এমন মেলবন্ধন তাদের কাছে নতুন অভিজ্ঞতা।
খুলনা থেকে আসা সুমাইয়া রিপা বলেন, কুয়াকাটায় এসে এমন দৃশ্য আগে দেখেননি। একসঙ্গে এত ঝিনুক দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন এবং ছবি তুলছেন।
আরেক পর্যটক রাজিব কিষান বলেন, সাদা ঝিনুক আর নীল সমুদ্রের দৃশ্যটি অনেকটা রূপকথার মতো মনে হচ্ছে। এই সৌন্দর্য রক্ষা করা গেলে কুয়াকাটায় পর্যটকদের আনন্দ আরও বাড়বে।
পর্যটনে তৈরি হতে পারে নতুন সম্ভাবনা
কুয়াকাটার পর্যটনকে সাধারণত সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত, সমুদ্রসৈকত, গঙ্গামতী ও লেম্বুরবনকেন্দ্রিকভাবে দেখা হয়। ঝিনুকের এই প্রাকৃতিক সমারোহ পর্যটন আকর্ষণের তালিকায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে মনে করছেন পর্যটনসংশ্লিষ্টরা।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটার (টোয়াক) প্রেসিডেন্ট রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, ঝিনুকের এই প্রাকৃতিক দৃশ্য পর্যটকদের জন্য নতুন আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ করা গেলে এটি কুয়াকাটার পর্যটন প্রচারণায় যুক্ত করা সম্ভব। তবে কেউ যাতে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে নির্বিচারে ঝিনুক সংগ্রহ করতে না পারেন, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
নান্দনিকতার আড়ালে পরিবেশের বার্তা ঝিনুক
শুধু সৈকতের সৌন্দর্যের উপকরণ নয়, উপকূলীয় সামুদ্রিক পরিবেশের একটি অংশ। তাই পর্যটকদের আনন্দের পাশাপাশি এর পরিবেশগত গুরুত্বও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
অব্যবস্থাপনায় ম্লান হচ্ছে কুয়াকাটার পর্যটন সম্ভাবনা
উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন কুয়াকাটার (উপরা) আহ্বায়ক কেএম বাচ্চু বলেন, কুয়াকাটার সৈকতে ঝিনুকের এই প্রাকৃতিক সমারোহ উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জোয়ার ভাটার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এসব ঝিনুক সৈকতে এসে জমা হয়। পর্যটকদের কাছে এটি যেমন নান্দনিক সৌন্দর্যের নতুন আকর্ষণ, তেমনি উপকূলের প্রাকৃতিক পরিবেশেরও একটি অংশ। তাই ঝিনুক কুড়িয়ে নেওয়া, ভেঙে ফেলা বা নষ্ট করা থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে। একই সঙ্গে সৈকতে প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য না ফেলে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। প্রকৃতির এই সৌন্দর্য রক্ষা করা গেলে কুয়াকাটার পর্যটন আকর্ষণ আরও বাড়বে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এর সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবে।
তিনি বলেন, সৈকতে চলাচলকারী যানবাহনের বিষয়েও সতর্কতা প্রয়োজন। ইজিবাইক, অটোরিকশা, ভ্যান ও মোটরসাইকেল যাতে ঝিনুক, বালিয়াড়ি ও সৈকতের জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি না করে, সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
ঝিনুক কুড়ানো নয়, রেখে যাওয়াই সৌন্দর্য
সৈকতে ঝিনুক দেখে অনেক পর্যটকেরই সেগুলো সংগ্রহ করে নিয়ে যাওয়ার আগ্রহ তৈরি হয়। কিন্তু একটি ঝিনুক তুলে নেওয়া হয়তো ব্যক্তিগতভাবে সামান্য ব্যাপার, অথচ হাজারও পর্যটক একই কাজ করলে প্রাকৃতিক এই সৌন্দর্য দ্রুত কমে যেতে পারে। তাই স্থানীয় ও পরিবেশবাদীদের আহ্বান, ঝিনুক দেখুন, ছবি তুলুন, সৌন্দর্য উপভোগ করুন কিন্তু অযথা কুড়িয়ে নিয়ে যাবেন না।
লেম্বুরবন বিট কর্মকর্তা আমির হামজা বলেন, ঝিনুক সংগ্রহ, ভাঙা বা নষ্ট করা এবং সৈকতে আবর্জনা ফেলার বিষয়ে নজরদারি করা হচ্ছে। নিয়মিত টহল ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সংরক্ষণ কার্যক্রম চলছে। তবে বিস্তীর্ণ সৈকত ও সীমিত জনবলের কারণে সবসময় সর্বত্র নজরদারি করা কঠিন।
এইচকেআর