বরিশালে ঐতিহ্যবাহী হাডুডু খেলা দেখতে হাজারো নারী-পুরুষের ভীড়

এক সময় বরিশালের গ্রামাঞ্চলে বিকেলের মাঠ মানেই ছিল হাডুডুর ডাক। খোলা মাঠ, নদীর পাড় কিংবা ফসল কাটা শেষে শুকনো জমিতে তরুণদের কণ্ঠে টানা “হাডুডু হাডুডু” ধ্বনিতে মুখর থাকত চারপাশ। শক্তি, কৌশল আর সাহসের এই গ্রামীণ খেলাই ছিল বিনোদন ও শারীরিক চর্চার প্রধান মাধ্যম। সময়ের পরিবর্তনে আধুনিক খেলাধুলার দাপটে সেই দৃশ্য অনেকটাই ম্লান হয়ে গেলেও, বরিশালের কিছু এলাকায় এখনও আবেগ ও ঐতিহ্যের অংশ হয়ে টিকে আছে হাডুডু।
বাবুগঞ্জ, মুলাদী, উজিরপুর, মেহেন্দিগঞ্জ ও হিজলা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে গ্রামীণ মেলা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান কিংবা বিশেষ দিবস উপলক্ষে আজও আয়োজন করা হয় হাডুডু প্রতিযোগিতা।
এসব খেলায় অংশ নেন মূলত কৃষক, জেলে ও শ্রমজীবী পরিবারের তরুণরা। দর্শকরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাঠে ভিড় করেন, যেন ফিরে যান শৈশবের স্মৃতিতে।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, হাডুডু শুধু খেলা নয়-এটি ছিল শারীরিক সক্ষমতা, বুদ্ধিমত্তা ও সাহসের এক অনন্য পরীক্ষা। এক নিঃশ্বাসে প্রতিপক্ষের এলাকায় ঢুকে স্পর্শ করে নিরাপদে ফিরে আসাই ছিল খেলোয়াড়ের মূল চ্যালেঞ্জ। সামান্য ভুলেই পড়তে হতো প্রতিপক্ষের কবলে।
এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে ব্যতিক্রমধর্মী আয়োজন করেছে বাবুগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল ইদিলকাঠী যুবসমাজ। দেহেরগতি ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি শাহিন বিশ্বাসের উদ্যোগে দুই মাসব্যাপী এই হাডুডু টুর্নামেন্টে অংশ নেয় ছয়টি দল। শনিবার বিকেলে অনুষ্ঠিত হয় টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা। মুখোমুখি হয় ‘মোল্লা কিংস’ ও ‘ওহে তরুণ জাগো’ নামের দুটি দল। খেলায় অংশ নেন ২৫ বছর বয়সী তরুণ থেকে শুরু করে ৬৫ বছরের বয়োজ্যেষ্ঠ খেলোয়াড়রাও।
খেলার একটি বিশেষ দিক ছিল ‘মোল্লা কিংস’ দলে বাবা আব্দুস ছালাম ও ছেলে সুজন একসঙ্গে মাঠে নামেন। আব্দুস ছালাম বলেন, আমি সরকারি চাকরি করতাম, এখন অবসরে। দীর্ঘদিন পর ছেলের সঙ্গে একই দলে খেলতে নেমেছি। এমন আয়োজন ছোট-বড়দের মধ্যে মেলবন্ধন তৈরি করে।
আতশবাজি ও বেলুন উড়িয়ে ফাইনাল খেলার উদ্বোধন করা হয়। খেলা দেখতে আশপাশের এলাকা থেকে নারী-পুরুষ দর্শকদের ঢল নামে। শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি ড্র হলেও মাঠজুড়ে ছিল উৎসাহ, উদ্দীপনা ও আনন্দের ঘনঘটা।
পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে খেলোয়াড়দের উৎসাহ দেন লন্ডনপ্রবাসী চিকিৎসক ডা. আব্দুল আওয়াল। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, বাবুগঞ্জ উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক রকিবুল হাসান খান এবং সমাজসেবক খলিলুর রহমান মোল্লা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন, হাসান মাহমুদ বরকত বিশ্বাস।
ষাটোর্ধ্ব খেলোয়াড় মো. ওয়াদুদ মোল্লা বলেন, এই টুর্নামেন্টে খেলতে পেরে ছোটবেলার দিনগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠেছে।
প্রভাষক ও নাট্যশিল্পী নুরনবী রাসেল বলেন, বর্তমানে বরিশালে হাডুডু খেলার সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ও খেলার মাঠ সংকুচিত হয়ে যাওয়া। অনেক জায়গায় মাঠ দখল হয়ে গেছে ঘরবাড়ি বা স্থাপনায়। পাশাপাশি তরুণদের আগ্রহ ঝুঁকছে ক্রিকেট, ফুটবল কিংবা মোবাইল গেমের দিকে।
তবে আশার কথা, কিছু সামাজিক সংগঠন ও স্থানীয় যুবসমাজ উদ্যোগ নিয়ে হাডুডুকে আবারও জনপ্রিয় করার চেষ্টা করছে। মেহেন্দিগঞ্জ ও উজিরপুরে সম্প্রতি আয়োজিত স্থানীয় হাডুডু টুর্নামেন্টে দর্শকদের ব্যাপক উপস্থিতি তারই প্রমাণ।
ক্রীড়া সংগঠকদের মতে, সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ঐতিহ্যবাহী হাডুডু খেলা আবারও নতুন প্রজন্মের কাছে ফিরে আসতে পারে। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে এই খেলাকে অন্তর্ভুক্ত করা গেলে গ্রামীণ ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি গড়ে উঠবে সুস্থ ও শক্তিশালী প্রজন্ম।
এইচকেআর