‘গুপ্ত’ সংগঠনের ব্যক্তিরা নতুন জালেমরূপে আবির্ভূত হয়েছে: বরিশালে তারেক রহমান

বাংলাদেশে ‘নতুন জালেমের’ আবির্ভাব হয়েছে এবং তারা দেশের মা-বোনদের সম্পর্কে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ও কলঙ্কিত মন্তব্য করেছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, যেই ব্যক্তি বা যেই দল দেশের মা-বোনদের প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা রাখে না, তাদের কাছ থেকে বাংলাদেশ কখনো অগ্রগতি আশা করতে পারে না।
কোনো দলের নাম না নিয়ে তারেক রহমান বলেন, জনগণ তাদের ভিন্ন পরিচয়ে চেনে, গুপ্ত পরিচয়ে চেনে। বর্তমানে বাংলাদেশে এক নতুন জালেমের আবির্ভাব হয়েছে। এই গুপ্ত সংগঠনের ব্যক্তিরা নতুন জালেমরূপে আবির্ভূত হয়েছে।
আজ বুধবার দুপুরে বরিশাল নগরের বান্দ রোডের বেলস পার্কে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তারেক রহমান এসব কথা বলেন। দুপুর ১২টায় তিনি হেলিকপ্টারে করে বরিশাল স্টেডিয়ামে পৌঁছান এবং সেখান থেকে গাড়িবহর নিয়ে জনসভাস্থলে আসেন।
বক্তব্যের শুরুতেই তারেক রহমান জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তিনি বলেন, ‘মঞ্চের সামনে বসে থাকা এই মানুষগুলো তাদের স্বজনদের হারিয়েছে। তারা জীবন দিয়েছে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য। বিগত ১৬ বছরে কেড়ে নেওয়া অধিকার ফিরিয়ে আনতে গিয়ে এই মানুষগুলো হত্যার শিকার হয়েছে, গুমের শিকার হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীকে ‘গুপ্ত সংগঠন’ হিসেবে অভিহিত করে তারেক রহমান বলেন, আজ আমরা অত্যন্ত কষ্টের সঙ্গে দেখছি, অত্যন্ত ঘৃণার সঙ্গে দেখছি—এই যে নতুন জালেম, যাদের মানুষ গোত্র হিসেবে চেনে, তাদের নেতা দুই দিন আগে প্রকাশ্যে বাংলাদেশের নারীদের সম্পর্কে একটি অত্যন্ত কলঙ্কিত শব্দ ব্যবহার করেছেন।
উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, বিবি খাদিজা (রা.) সম্পর্কে আপনারা জানেন। আমাদের প্রিয় নবী করিম (সা.)-এর স্ত্রী বিবি খাদিজাও একজন কর্মজীবী নারী ছিলেন। তার নিজের ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল, যেখানে নবীজী নিজেও কাজ করতেন। এরা নাকি ইসলামের রাজনীতি করে, অথচ নবীজীর স্ত্রী নিজে যেখানে একজন কর্মজীবী নারী ছিলেন, সেখানে কেমন করে একটি রাজনৈতিক দলের নেতা এবং সেই দলটি তাবৎ বাংলাদেশের নারীসমাজকে এমন একটি কলঙ্কিত শব্দে জর্জরিত করল?
তিনি আরও বলেন, বদরের যুদ্ধের কথা আপনারা জানেন। সেই যুদ্ধে হযরত আয়েশা (রা.)-এর নেতৃত্বে যুদ্ধের সরঞ্জামাদি সরবরাহ করা হয়েছিল এবং আহতদের সেবা দেওয়া হয়েছিল। ইসলাম ধর্ম বা আমাদের সামাজিক অবস্থান—সব জায়গাতেই নারীদের একটি শক্তিশালী ভূমিকা আছে। নারীদের পেছনে ফেলে বা ঘরে বন্দি করে রেখে বাংলাদেশ সামনে এগোতে পারবে না।
খালেদা জিয়ার অবদান সম্পর্কে তিনি বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, তখন তিনি নারীদের জন্য দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন।
জামায়াত নেতার বক্তব্যের সমালোচনা করে তারেক রহমান বলেন, তাদের আরেক নেতা, যার বাড়ি কুমিল্লা জেলায়, তিনি কিছুদিন আগে দলীয় এক সমাবেশে কর্মীদের বলেছেন—১২ তারিখ পর্যন্ত আপনারা জনগণের পা ধরবেন, এরপর পরবর্তী পাঁচ বছর জনগণ আপনাদের পা ধরবে। চিন্তা করুন, এই রকম কথা কে বলতে পারে? এর মানে ১২ তারিখের পর থেকে জনগণ তাদের পিছে পিছে ঘুরবে। এই কথা থেকে প্রমাণিত হয় তাদের মানসিকতা কোন পর্যায়ের। তারা জনগণকে নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছে।
তিনি বলেন, ‘এই সব লোক যদি নির্বাচিত হয়, যদি দায়িত্ব পায়, তাহলে জনগণের ভাগ্যের কী দুর্বিষহ অবস্থা হবে, তা আজকেই পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। যাদের মনে এই কথা এবং মনের কথা বাস্তবে বেরিয়ে এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে আপনাদের সজাগ থাকতে হবে। যারা জনগণকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাতে চায়, তাদের উচিত শিক্ষা দিতে হবে।’
নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে বিএনপি প্রধান বলেন, ‘গত কয়েক দিন ধরে পত্রপত্রিকায় খবর দেখছি, তাদের লোকজন ভুয়া সিল ও ব্যালট পেপার ছাপাচ্ছে। মা-বোনদের কাছে গিয়ে এনআইডি ও বিকাশ নম্বর নিচ্ছে। যারা শুরুতেই অনৈতিক কাজ করছে, তারা কীভাবে সৎ মানুষের শাসন উপহার দেবে?’
তিনি বলেন, ‘তারা বলে তারা নাকি সৎ মানুষের শাসন কায়েম করবে। আরে ভাই, নির্বাচনের আগেই তো আপনারা জাল ব্যালট ছাপাচ্ছেন। নির্বাচনের আগেই তো মা-বোনদের বিকাশ নম্বর নিয়ে যাচ্ছেন। অনৈতিক কাজ দিয়ে আপনারা মানুষের ভোট প্রভাবিত করতে চাচ্ছেন। যাদের ভোটের শুরুটাই অনৈতিক, তারা সৎ মানুষের শাসন দিতে পারে না।’
নারীদের অপমান করার পর আইডি হ্যাক হওয়ার দাবির সমালোচনা করে তারেক রহমান বলেন, ‘তারা বলছে তাদের আইডি নাকি হ্যাক হয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো আইডি হ্যাক হয়নি। ধরা পড়ার পর তারা মিথ্যা কথা বলা শুরু করেছে। যারা অপরাধ ঢাকতে মিথ্যা বলে, তারা আর যা-ই হোক, সৎ মানুষের শাসন দিতে পারে না।’
বরিশাল অঞ্চলের উন্নয়নে বিএনপির পরিকল্পনার কথাও ভাষণে তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘১৯৯৩ সালে খালেদা জিয়ার সরকার বরিশালকে বিভাগ ঘোষণা করেছিল। এরপর নদীর পানি অনেক দূর গড়িয়েছে। কিন্তু এখনো অনেক কাজ বাকি। বরিশাল-ভোলা ব্রিজ নির্মাণ করতে হবে, শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজের উন্নয়ন করতে হবে এবং ভোলায় মেডিকেল কলেজ করতে হবে।’
নদীভাঙন সমস্যাকে বড় সংকট উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাপ-দাদার ভিটা, মসজিদ, কবরস্থান নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আমরা যেকোনো মূল্যে বেড়িবাঁধ দিয়ে নদীভাঙন ঠেকাব। এটি আমাদের করতেই হবে।’
বরিশাল অঞ্চলের কৃষি ও মৎস্য সম্পদের কথা উল্লেখ করে বিএনপি প্রধান বলেন, ‘এখানে প্রচুর কৃষি পণ্য ও মাছ উৎপাদিত হয়। কৃষকদের সুবিধার্থে আমরা বিভিন্ন জায়গায় হিমাগার তৈরি করব, যাতে তারা ন্যায্যমূল্য পান।’
তরুণদের কর্মসংস্থান এবং নারীদের স্বাবলম্বী করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘ভোলায় গ্যাস পাওয়া গেছে। সেই গ্যাস কাজে লাগিয়ে শিল্পকারখানা গড়ে তোলা হবে। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রশিক্ষণকেন্দ্রের মাধ্যমে যুবকদের দক্ষ করে গড়ে তোলা হবে, যাতে তারা দেশে-বিদেশে কাজ করতে পারেন এবং ছোট ব্যবসা শুরু করতে পারেন।’
নারীদের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর কথা পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। তারেক রহমান বলেন, ‘গ্রামের খেটে খাওয়া নারী থেকে শুরু করে শহরের কর্মজীবী নারী—সবার কাছে আমরা ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিতে চাই। এর মাধ্যমে তারা রাষ্ট্রীয় সহায়তা পাবেন এবং পুরুষের পাশাপাশি সংসারের হাল ধরতে পারবেন।’
স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ‘হেলথ কেয়ার’ কর্মী নিয়োগের কথাও জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘আমরা ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি করব, যারা গ্রামে গ্রামে গিয়ে মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দেবে, যাতে ছোটখাটো অসুখে তাদের হাসপাতালে ছুটতে না হয়।’
জিয়াউর রহমানের আমলের খাল খনন কর্মসূচির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘১৯৭৮ সালে এই এলাকায় পল্লী বিদ্যুতের লাইন শহীদ জিয়াই চালু করেছিলেন। ইনশা আল্লাহ ১৩ তারিখে বিএনপি সরকার গঠন করলে আমি নিজে খাল খনন করতে আসব। খাল খননের মাধ্যমে বন্যার গতিরোধ করা হবে এবং সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা হবে।’
সমাবেশে উপস্থিত ধানের শীষ ও সমমনা প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘১২ তারিখ পর্যন্ত এদের দেখে রাখার দায়িত্ব আপনাদের। আর বিজয়ী হলে ১৩ তারিখ থেকে আপনাদের দেখে রাখার দায়িত্ব এদের। এরা আপনাদের পায়ে পড়ে থাকবে, এলাকার উন্নয়নে কাজ করবে।’
তিনি বলেন, ‘ওই গুপ্ত সংগঠনের নেতা যেমন বলেছেন ১২ তারিখ পর্যন্ত জনগণের পা ধরতে, আমি তার উল্টোটা বলি। আমি আমার নেতাদের বলেছি, আপনারা ১৩ তারিখ থেকেও আগামী পাঁচ বছর জনগণের পা ধরে থাকবেন। কারণ জনগণের শক্তি যার পেছনে থাকে না, তার পরিণতি কী হয়, তা ৫ আগস্ট জাতি দেখেছে।’
এইচকেআর