জিরো টলারেন্স নীতিতে অটল বরিশাল সিটির প্রশাসক

আদতেই কি, নগরবাসীর অন্যতম প্রাণের দাবী শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহের আরোপিত জঞ্জালখ্যাত ফুটপাত দখলমুক্ত করা হবে? অবশ্য আমার এই প্রশ্ন উত্থাপনের কারণ অনেক। আমরা তো দেখেছি: যদি কেই এই জগদ্দল পাথরের মতো জেঁকে বসা প্রস্তরসমস্যাটি সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছেন। তাকেই তো পিছিয়ে আসতে হয়েছে, অদৃশ্য নানা করণে।
আর আমরা তো জানি, মেয়র শওকত হোসেন হিরনের পর দখলদারিত্বের এই দানব তাড়ানোর মতো সেই আলাদীনের চেরাগটি অন্য কোনও মেয়র কিংবা প্রশাসকের হাতে ঘঁষে উঠতেও দেখতে পাইনি। অথচÑ রাজা যায় রাজা অসেÑ নিয়মের ভিত্তিতে আরও কেউ কেউ বরিশালের নগরপিতা হয়েছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে মেয়র হিরনের মতো বরিশালের উন্নয়নের কথা নিঃস্বার্থভাবে ভাববার আর কোন আলোচিত নগরঅধিপতি পাইনি আমরা।
মেয়র আহসান হাবিব কামাল, মেয়র সাদিক কিংবা মেয়র খোকন সেরনিয়াবাদ এবং সর্বশেষ নগর ভবনের দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিপতি একজন সরকারি কর্মকর্তাÑ মো. রায়হান কাওছার এঁরাতো শেষমেষÑ কেবল মেয়র হিরনের নগরায়ণ ও উন্নয়নকে পুঁজি করে নিজেদের আখের গুছিয়ে গেছেন। আর এযাবৎ, তাঁরই হাতে গড়ে রেখে যাওয়া বরিশালের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত বিবিরপুকুর পাড়Ñ শহরের পার্ক, রাস্তার দুধারের ফুলের বাগান, লেকপাড়, বিভিন্ন পুকুর, পরিচ্ছন্ন রাস্তাঘাট সবই একে একে ধ্বংস করেছেন।
শহরের ফুটপাত এবং পার্ক দখল করে, অবৈধ হকার, ভ্রাম্যমাণ দোকান ও স্থায়ী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সামনের ফুটপাতে গড়ে তোলা অবৈধ স্থাপনার মাধ্যমে দলীয় নেতাদের জন্য চাঁদাবাজী ব্যবসার পসারা সাজিয়েছেন। আর সারাবছরই ঈদ কোরবানি পুজার শুভেচ্ছার নামে, সামাজিক নানা পার্বনের ছুতোয়Ñ নিজেদের রাজনৈতিক দলের কতিপয় তোয়াজি ব্যানার প্রদর্শনের মাধ্যমেÑ রক্তাক্ত মুক্তিসংগ্রামের ঐতিহাসিকতায় গড়ে ওঠাÑ এই শহরের আইকনখ্যাত অশ্বিনীকুমার হল এবং বিবিরপুকুর পাড়ের নান্দনিকতা ঢেকে দেয়া হয়েছে তোয়াজবাজির বিজ্ঞাপনে।
অন্যদিকে শহরের সকল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যকে অবহেলা আর অয়ত্নের মাধ্যমে রাস্তার পাশের সকল ফুলের গাছগুলো মেরে ফেলেছেন। প্রাকৃতিকভাবে বয়ে চলা অগণিত খালের প্রবাহ বন্ধ করে দিয়ে কালভার্ট, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শহরের জলাবদ্ধতা সমস্যাকে ক্রমাগতভাবে প্রকট করে তুলেছেন। নাগরিকদের ভোটে নির্বাচিত হয়েÑ উন্নয়নের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক দায়বদ্ধতাকে মেনে বিগত কোনও মেয়রই মানবসেবা ও নাগরিক সুবিধাদির ক্ষেত্রে বদ্ধপরিকর ছিলেন না কেউই।
হয়তো বললে অত্যুক্তি হবেনা, ৫ আগষ্টের পর, বরিশাল সিটি করপোরেশন নগর ভবনের দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিপতি হয়ে আসা সরকারি কর্মকর্তাÑ মো. রায়হান কাওছার এক্ষেত্রে কিছুটা ব্যাতিক্রমি ছিলেন বটে। একমাত্র তিনিই বোধহয় সামান্য হলেওÑ আমাদের নাগরিক অনেক গলারকাঁটা তুলে ফেলতে, সিটি করপোরেশনের নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে সরকারের জমি, খাল, পার্কের জমি দখলমুক্তির চেষ্টা করেছেন।
বর্ষা মৌসুমের আগেভাগেই খাল পুন:খনন ও ব্যাপক ড্রেন পরিষ্কারের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা নিরসনে সতর্ক ছিলেন। একই সাথে বাজার চাঁদাবাজি ও ফুটপাত দখল বন্ধের নানা হিতৈষি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কাজ করে, তিনি অন্তত এটি বুঝিয়ে দিতে উদ্যত হয়েছিলেন যে, এই সিটির সড়ক, ফুটপাত, খাল-নদী, স্যুয়ারেজ, পার্ক, লেক সর্বোপরি সিটি করপোরেশন কিছুই কারো পিতৃসম্পত্তি না। না দলীয় ব্যানারের, না সরকারের, না স্বেচ্ছাচারী কোনও আপনি মোড়ল মাতব্বরেরও নয়।
ফলে, সিটির কিছু শিল্পপতি ও ক্লাশরাজনৈতিক দখলদারদের আমলা নির্ভরতা, দলীয় প্রভাব ইত্যাদি হামটি-ডামটির তোয়াক্কা না করে, কার্যকরী কিছু পদক্ষেপের মাধ্যমে তার প্রশাসনিক কর্মদক্ষতা ও ঈর্ষণীয় অগ্রসর চিন্তার দূরদর্শীতারÑ পুরোটাই যেনো মহৎ উদ্দেশ্যের এবং অনন্য ন্যায়পালের উদ্যোগের মতোই মহান পদক্ষেপ হয়ে উঠেছিল। কিন্ত গরীবদের পেটে লাথি দিচ্ছে’ বলে একদল সুবিধাবাদী মানবতার ফেওিয়ালাদের সমালোচনা, চাঁদাবাজদের ম্যানেজ প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক নেতাদের অস্ফালন ও ক্ষমতার অভিপ্সা, প্রতিষ্ঠার দ্বন্দ্ব এবং সিটি করপোরেশনের অসৎ কর্মকতা ও কর্মচারীদের ব্যক্তিগত স্বার্থের লিপ্সায়Ñ নগরবাসীর জনকল্যাণে মো. রায়হান কাওছারের কর্মকাণ্ডও থেমে যেতে হয়েছে।
তবে আতি সম্প্রতি, বর্তমান বিএনপি সরকারের মনোনিত অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নির্বাচিত হয়ে আসার পর পুনরায় আবার যেনÑ হতভাগা বরিশালকে পরিচ্ছন্ন ও সৌন্দর্যমণ্ডিত শহর, নগরীর যাবতীয় নাগরিক সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যেÑ নি:স্বার্থভাবে কাজ করে ব্যাপক প্রশংসিত হয়ে উঠছেন।
কারণ, আমরা তো জানি, শিল্পসাহিত্য ও বাঙালি সংস্কৃতির বৃহত্তর স্পেসে, রুটস লাইফ রাজনীতির ধারাবাহিকতায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে আসা এই ডায়নামিক মানুষটিÑ পুনরায় এই শহরকে তিনি প্রাচ্যের ভেনিসের সেই নাগরিক সৌন্দর্যকে বাংলাদেশের অন্য যে কোনও জেলার থেকে অন্যতম করে গড়ে তুলতে বদ্ধ পরিকর।
হয়তো সকল মহলের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে হলেও, ফুটপাতের বহুঅবৈধ সকল স্থাপনা ভেঙ্গে দিয়ে নগরীর বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে সন্ত্রাসি ব্যবস্থাপনায় গড়ে ওঠা অবৈধ দখলমুক্ত করার লক্ষ্যে জিরো টলারেন্স নীতিতে, তার সমস্ত ব্যতিক্রমী ভাল কাজের মাধ্যমেÑ নানাভবেই আমাদের বরিশালবাসীর জন্য পুরোপুরি পজেটিভ হয়ে উঠবেন। আর তাতেই বরিশালবাসীর হৃদয়ের মণিকোঠায় চির অম্লান থাকবেন আপনি। লেখক : কবি ও দৈনিক মতবাদের যুগ্ম সম্পাদক।