ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Motobad news

বরিশাল বিভাগে মাদকে ঝুঁকছে তরুণরা, ৬ মাসে ১৫৭৫টি মামলা 

বরিশাল বিভাগে মাদকে ঝুঁকছে তরুণরা, ৬ মাসে ১৫৭৫টি মামলা 
ফাইল ছবি
গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

বরিশাল বিভাগে মাদকসংক্রান্ত মামলা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বিভাগের ছয় জেলায় ১ হাজার ৫৭৫টি মাদক মামলা হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে হয়েছিল ৮৭৭টি। এক বছরের ব্যবধানে মামলা বেড়েছে ৬৯৮টি, যা প্রায় ৮০ শতাংশ। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক এবং মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসা নেওয়া ব্যক্তিদের উল্লেখযোগ্য অংশ কিশোর ও তরুণ হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে।

বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বরিশাল জেলায় ৩৮৪টি, পটুয়াখালীতে ২৯৯, ভোলায় ৩৪৮, পিরোজপুরে ২৭৩, বরগুনায় ১২৩ এবং ঝালকাঠিতে ১৪৮টি মাদক মামলা হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে বরিশালে ২৩০টি, পটুয়াখালীতে ২২১, ভোলায় ৯৬, পিরোজপুরে ১৬৪, বরগুনায় ১১০ এবং ঝালকাঠিতে ৫৬টি মামলা হয়েছিল।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি মামলা বেড়েছে ভোলায়। সেখানে গত বছরের প্রথম ছয় মাসে ৯৬টি মামলা হলেও এ বছর হয়েছে ৩৪৮টি। অর্থাৎ মামলা বেড়েছে ২৫২টি যা প্রায় ২৬৩ শতাংশ। ঝালকাঠিতে ৫৬টি থেকে বেড়ে হয়েছে ১৪৮টি, বৃদ্ধি প্রায় ১৬৪ শতাংশ।

বরিশাল জেলায় মামলা বেড়েছে ১৫৪টি। ২৩০টি থেকে বেড়ে এ বছর হয়েছে ৩৮৪টি। পিরোজপুরে ১৬৪ থেকে বেড়ে ২৭৩টি এবং পটুয়াখালীতে ২২১ থেকে বেড়ে ২৯৯টি মামলা হয়েছে। বরগুনায় মামলা ১১০ থেকে বেড়ে হয়েছে ১২৩টি। বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের চার থানায় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৬৩৮টি মাদক মামলা হয়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বরিশাল জেলা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুন থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত ৯০৭টি মাদক মামলা হয়েছে। এক বছরে সরকারি ও বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসনকেন্দ্রে ৬৪১ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, চিকিৎসা নেওয়া ব্যক্তিদের বড় অংশই কিশোর ও তরুণ।

বরিশাল রেঞ্জ পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাদকসংক্রান্ত মামলায় আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কিশোর ও তরুণদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। তাদের একটি অংশ মাদক সেবনের পাশাপাশি সরবরাহ ও বিক্রিতেও জড়িয়ে পড়ছে। মাদকের সহজলভ্যতা, বন্ধুমহলের প্রভাব, কৌতূহল, পারিবারিক অস্থিরতা, হতাশা ও দ্রুত অর্থ উপার্জনের আকাঙ্ক্ষাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন তারা।

বরিশালের দি নিউ লাইফ মাদকাসক্তি ও মানসিক রোগ নিরাময়কেন্দ্রের পরিচালক মর্তুজা জুয়েল বলেন, তাদের কেন্দ্রে প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে চারজন নতুন মাদকাসক্ত চিকিৎসার জন্য আসেন। বর্তমানে প্রায় ১০০ রোগী ভর্তি আছেন, যাদের প্রায় ৯০ শতাংশই তরুণ।

তিনি বলেন, আসক্তির পেছনে ব্যক্তিভেদে কারণ আলাদা। কারও ক্ষেত্রে বন্ধুমহল, কারও ক্ষেত্রে পারিবারিক সমস্যা, আবার কেউ কৌতূহল থেকে মাদক গ্রহণ শুরু করেন। কারণ চিহ্নিত করে কাউন্সেলিং ও চিকিৎসার মাধ্যমে তাদের সুস্থ করে পরিবারে ফেরানোর চেষ্টা করা হয়।

সেভ দ্য লাইফ মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রের পরিচালক মো. সাখাওয়াত হোসেন মিঠু বলেন, তাদের কেন্দ্রে ভর্তি অধিকাংশ রোগীর বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশের পাশাপাশি সঙ্গদোষও অনেককে মাদকের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ ও বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের সাবেক আবাসিক চিকিৎসক ডা. মিজানুর রহমান বলেন, মাদকাসক্তিকে শুধু অপরাধ হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান হবে না। এটি একই সঙ্গে মানসিক, সামাজিক ও জনস্বাস্থ্যগত সমস্যা। তাই আসক্ত ব্যক্তিদের বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসার পাশাপাশি পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. তপন কুমার সাহা বলেন, পারিবারিক অস্থিরতা, হতাশা, একাকিত্ব ও সঙ্গদোষের কারণে অনেক তরুণ মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়েন। একজন ব্যক্তি কেন মাদক গ্রহণ শুরু করেছেন, তা চিহ্নিত করে সময়মতো কাউন্সেলিং, চিকিৎসা ও পরিবারের সহযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি।

বরিশাল বিভাগীয় পরিবেশ ও প্রতিবেশ সুরক্ষা কমিটির আহ্বায়ক শুভংকর চক্রবর্তী বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়। পরিবারকে সন্তানদের প্রতি মনোযোগী হওয়ার পাশাপাশি তরুণদের খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও ইতিবাচক সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার সুযোগ বাড়াতে হবে।

শিশু সংগঠন খেলাঘর আসরের জেলা সভাপতি ও জেলা শিশুবিষয়ক সাবেক কর্মকর্তা পঙ্কজ রায় চৌধুরী বলেন, মাদকের বিস্তার ঠেকাতে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি আসক্ত ব্যক্তিদের কার্যকর চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. তানভীর হোসেন খান বলেন, সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির আলোকে মাদকবিরোধী অভিযান চলছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে মাদক পাচার ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। তবে শুধু আইন প্রয়োগ করে মাদক নির্মূল সম্ভব নয়; পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকেও সচেতনতা বাড়াতে হবে।

বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহ্ বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অবস্থান জিরো টলারেন্স। নিয়মিত অভিযান ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে এ সমস্যা সমাধানে পরিবার ও সমাজেরও দায়িত্ব রয়েছে।

বরিশাল রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. জুলফিকার আলী হায়দার বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অবস্থান কঠোর থাকবে। গত রবিবার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভাগের সব জেলার পুলিশ সুপারদের নিয়ে প্রথম মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে বিভাগের সার্বিক অপরাধ পরিস্থিতির পাশাপাশি মাদকসংক্রান্ত কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা হয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করা হবে।
 


এইচকেআর
গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন