বরিশালে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানে গা-ঢাকা দিচ্ছে অপরাধীরা, তিনদিনে গ্রেফতার ৩৮ জন

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মো. সালাহ উদ্দিন আহমদের কঠোর নির্দেশনার পর সারাদেশের ন্যায় বরিশালেও নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ (বিএমপি)।
মাদকের বিস্তার রোধ এবং মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) থেকে নগরের বিভিন্ন স্থানে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা হয়।
এদিকে অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়লে মাদকসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকে সতর্ক হয়ে আত্মগোপনে চলে যায় বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। তবে অভিযানে গত তিনদিনে ৩৮ জনকে আটক করেছে পুলিশ। এছাড়া ২৫৩ পিস ইয়াবা, সাড়ে ৪০০ গ্রাম গাঁজা, মাদক বিক্রির নগদ ১ লাখ ৩৯ হাজার টাকা ও ৩টি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
সবশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় মেট্রোপলিটন পুলিশের ৪ টি থানা ও গোয়েন্দা শাখা নগরীর বিভিন্ন স্থান থেকে ১২৫ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট ও ২৫০ গ্রাম গাঁজাসহ ৩ জন, গ্রেফতারি পরোয়ানায় ১ জন, অন্যান্য আইনে ৬ জনসহ মোট ১০ জনকে আটক করা হয়েছে।
এর আগে মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারি পুলিশ কমিশনার (কাউনিয়া জোন) পবিত্র কুমার হালদারের নেতৃত্বে কাউনিয়া থানার একটি বিশেষ আভিযানিক টিম বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টা থেকে প্রায় ৩ ঘন্টা ধরে নগরীর পান্থ সড়ক, রোকেয়া আজিম সড়ক ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী ও সন্দেহভাজন অপরাধীদের বিরুদ্ধে আকস্মিক সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে।
এসময় অনলাইন জুয়ার সাথে সম্পৃক্ততা ও মাদক সেবনরত অবস্থায় বিভিন্ন স্থান থেকে ৯ জনকে আটক করা হয়। একই সাথে অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) বেলাল হোসাইনের নেতৃত্বে কোতোয়ালি মডেল থানার একটি বিশেষ আভিযানিক টিম প্রায় দুই ঘন্টা নগরীর লঞ্চঘাট, ডিসি ঘাট ও পোর্ট রোড সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী ও সন্দেহভাজন অপরাধীদের বিরুদ্ধে আকস্মিক সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করেন। এছাড়া গত মঙ্গলবার ৯ জনসহ নগরের পলাশপুর, মোহাম্মদপুর ও আল মাদানী সড়ক থেকে ১০৫ পিস ইয়াবা, ২০০ গ্রাম গাঁজা, মাদক বিক্রয়ের নগদ ১৩৯৮০০ টাকা ও ৩টি মোটরসাইকেল উদ্ধারপূর্ব ৮ জনকে আটক করে কাউনিয়া থানা পুলিশ।
এদিকে বৃহস্পতিবার রাতে নগরের কাউনিয়া এলাকার জানকি সিংহ রোড, ব্রাঞ্চ রোড, পিছনের স্কুল রোড ও ছোট মিয়ার গলি সহ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ২৩ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট ও মাদক বিক্রয়ের ৬১৮০টাকাসহ ২জনকে আটক করে কাউনিয়া থানা পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মহানগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে মাদকবিরোধী তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। মাদকদ্রব্যের সরবরাহ, বিক্রয় ও সেবন বন্ধে সন্দেহভাজন স্থানগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। মাদকের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না—এমন কঠোর বার্তাও দিয়েছে পুলিশ।
এদিকে পুলিশের এ সাঁড়াশি অভিযানকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের প্রত্যাশা, বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, মাদক নির্মূলে নিয়মিত ও ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে মাদক কারবারিদের আইনের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে মাদকের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পুলিশের এ অভিযান অব্যাহত থাকলে মাদক কারবারিদের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি স্থানীয় তরুণ সমাজকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।
বরিশাল বিভাগীয় পরিবেশ ও প্রতিবেশ সুরক্ষা কমিটির আহ্বায়ক শুভংকর চক্রবর্তী বলেন, হঠাৎ অভিযান লোক দেখানো হয়ে যায়। এতে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। এ কর্মসূচি বছর ব্যাপি থাকতে হবে।
তিনি বলেন, মাদক অভিযানে ছোট খাটো ব্যবসায়ীরা ধরা পড়ছে। কিন্তু রাঘব বোয়ালরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোয়ার বাইরে। তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি পরিবারকে সন্তানদের প্রতি মনোযোগী হওয়া এবং তরুণদের খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও ইতিবাচক সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার সুযোগ বাড়াতে হবে।
পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বরিশাল জেলায় ৩৮৪টি মাদক মামলা দায়ের হয়েছে। এর ভিতরে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের চার থানায় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৬৩৮টি মাদক মামলা হয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুন থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত ৯০৭টি মাদক মামলা হয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. তানভীর হোসেন খান বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে মাদক পাচার ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহ্ বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অবস্থান জিরো টলারেন্স। নিয়মিত অভিযান ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, শনিবার (২৯ আগস্ট) রাজারবাগ পুলিশ অডিটোরিয়ামে ত্রৈমাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভা শেষে সন্ত্রাস দমনে সারা দেশে বিশেষ অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
এইচকেআর