ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Motobad news

ভোলায় হাসপাতালে তীব্র সংকটে ওষুধ-সরঞ্জাম, শিশু ওয়ার্ডে পাঁচ গুণ রোগী

ভোলায় হাসপাতালে তীব্র সংকটে ওষুধ-সরঞ্জাম, শিশু ওয়ার্ডে পাঁচ গুণ রোগী
গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

৬০ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে রোগী ভর্তি থাকছেন প্রায় ৩০০ জন। জায়গা না পেয়ে কেউ মেঝেতে, কেউ বেডের পাশে চাদর পেতে সন্তানকে নিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এর মধ্যে কয়েক দিন ধরে হাসপাতাল থেকে প্রয়োজনীয় ওষুধ, স্যালাইন, ইনজেকশন, ক্যানোলা ও সিরিঞ্জ না পাওয়ায় বাইরে থেকে এসব কিনতে হচ্ছে রোগীর স্বজনদের। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের পরিবারের সদস্যরা।

ভোলা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নিউমোনিয়া ও ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত শিশুদের চাপ বাড়ার মধ্যেই দেখা দিয়েছে চিকিৎসাসামগ্রীর এই সংকট। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, রোগীর সংখ্যা ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। নতুন করে ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী সংগ্রহের টেন্ডার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

৬০ বেডে প্রায় ৩০০ শিশু
ভোলা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক সূত্রে জানা গেছে, শিশুদের জন্য হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে বেড রয়েছে ৬০টি। চলতি সেপ্টেম্বরের ১৫ তারিখ পর্যন্ত নিউমোনিয়া ও ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত প্রায় দেড় হাজার শিশু ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে।

বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ শিশু হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড, মেঝে ও স্ক্যানুতে ভর্তি থাকছে। রোগীর অতিরিক্ত চাপের কারণে প্রায় এক মাস ধরে বেড সংকটও তীব্র হয়েছে। কোনো কোনো বেডে তিন থেকে চারজন শিশুকে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, শিশু ওয়ার্ডের পাশাপাশি স্ক্যানুর সামনে, ওয়ার্ডের প্রবেশপথ এবং বেডের আশপাশের মেঝেতেও শিশুদের রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কোথাও চাদর পেতে, আবার কোথাও মেঝেতে বসিয়েই সন্তানকে চিকিৎসা করাচ্ছেন স্বজনরা।

দৌলতখান উপজেলার চর খলিফা ইউনিয়নের দিদারুল্লাহ গ্রাম থেকে আসা মিতু বেগম বলেন, হাসপাতালে এসে বেড পাইনি। তাই বেডের পাশে চাদর পেতে সন্তানকে রেখে চিকিৎসা করাচ্ছি। অনেক কষ্ট হচ্ছে, তারপরও বাধ্য হয়ে থাকতে হচ্ছে।

আমার সন্তানের নিউমোনিয়া হওয়ায় চার দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছি। ডাক্তার দেখার পর ওষুধ ও স্যালাইন লিখে দেন। বেডে যাওয়ার পর নার্সরা জানান, হাসপাতালে এসব নেই, বাইরে থেকে কিনে আনতে হবে। 

ভোলা সদরের আলীনগর থেকে আসা রিপা বেগম বলেন, ‘কোনো বেড না পেয়ে শিশু ওয়ার্ডের সামনে মেঝেতে সন্তানকে রেখে চিকিৎসা করাচ্ছি। মানুষ চলাচল করে, চারপাশে ময়লা থাকে, ঠিকমতো পরিষ্কারও করা হয় না। তারপরও চিকিৎসার জন্য এখানে থাকতে হচ্ছে।’

ওষুধ-স্যালাইনও কিনতে হচ্ছে বাইরে
রোগীর চাপের পাশাপাশি হাসপাতালে দেখা দিয়েছে ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর সংকট। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ওষুধ, স্যালাইন, ইনজেকশন, ক্যানোলা, সিরিঞ্জসহ বিভিন্ন সামগ্রী প্রয়োজন হলেও এর বেশিরভাগই বাইরে থেকে কিনে আনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ স্বজনদের।

চার দিন ধরে সন্তানকে হাসপাতালে চিকিৎসা করাচ্ছেন মো. রাশেদ। তিনি বলেন, আমার সন্তানের নিউমোনিয়া হওয়ায় চার দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছি। ডাক্তার দেখার পর ওষুধ ও স্যালাইন লিখে দেন। বেডে যাওয়ার পর নার্সরা জানান, হাসপাতালে এসব নেই, বাইরে থেকে কিনে আনতে হবে। ক্যানোলা ও ক্যানোলা লাগানোর টেপও কিনে আনতে হয়েছে।

তিনি বলেন, চার দিন ধরে সবকিছু বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়েছে। শুধু নেবুলাইজেশন মেশিনে গ্যাস ও গ্যাস দেওয়ার ওষুধ দুই দিন হাসপাতাল থেকে বিনা মূল্যে পেয়েছি। তবে সিরিঞ্জও বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে।

চরসামাইয়া ইউনিয়ন থেকে আসা সুমাইয়া আক্তার বলেন, আমার স্বামী দিনমজুরের কাজ করেন। আমরা নিম্ন আয়ের মানুষ। সন্তানকে বিনা মূল্যে চিকিৎসা করানোর জন্য সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করেছি। কিন্তু ডাক্তার দেখানো এবং নেবুলাইজেশনের গ্যাস ছাড়া প্রায় সবকিছুই বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে।

তিনি বলেন, ওষুধ, স্যালাইন, সিরিঞ্জ, মাস্ক—সবই কিনতে হয়েছে। আমাদের মতো সীমিত আয়ের মানুষের জন্য এসব কেনা খুব কষ্টের। তারপরও সন্তানের চিকিৎসার জন্য বাধ্য হয়ে কিনেছি।

সুমাইয়া আরও বলেন, টাকা দিয়ে যদি সব কিনে সন্তানের চিকিৎসা করাতে হয়, তাহলে সরকারি হাসপাতালে আসছি কেন? গরিব মানুষ, বিনা মূল্যে চিকিৎসা পাব—এই আশায় এখানে এসেছি। কিন্তু সেটা আর হলো কই।

মেঝেতে চিকিৎসা, ফ্যানেরও সংকট
বেড সংকটের কারণে হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে মেঝেতে শিশুদের রেখে চিকিৎসা নেওয়ার পাশাপাশি গরমেও ভোগান্তিতে পড়েছেন রোগী ও স্বজনরা। লিফটের সামনে মেঝেতে বসে ছয় মাস বয়সী সন্তানকে চিকিৎসা করাচ্ছেন তিথি রানী।

তিনি বলেন, ‘চার দিন ধরে ছয় মাসের সন্তানকে রেখে চিকিৎসা করাচ্ছি। কোথাও জায়গা পাইনি। সব জায়গাতেই শিশু রোগী। এখানে বসে চিকিৎসা করাচ্ছি, কিন্তু ফ্যান নেই। সারাদিন হাতপাখা দিয়ে বাচ্চাকে বাতাস করছি।’

তিথি রানী আরও বলেন, সরকারি হাসপাতালে আসছি, কিন্তু সবকিছুই বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। ভোলা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে এসে চরমভাবে বিপাকে পড়েছি।

রোগীর চাপের কারণে শিশু ওয়ার্ডের নির্ধারিত বেডের বাইরে মেঝেতেও চিকিৎসা দিতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। অতিরিক্ত রোগীর জন্য দ্রুত ফ্যানের সংখ্যা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও জানানো হয়েছে।

ভোলা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. তৈয়বুর রহমান বলেন, প্রতিদিন ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। গড়ে প্রায় ৩০০ শিশু রোগী হাসপাতালে ভর্তি থাকছে। রোগী বেশি হওয়ায় ওষুধ, স্যালাইন, ইনজেকশন, ক্যানোলাসহ বিভিন্ন চিকিৎসাসামগ্রীর সংকট রয়েছে।

তিনি বলেন, কিছু দিনের মধ্যে এই সমস্যা সমাধান হবে। টেন্ডার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

বেড সংকটের বিষয়ে ডা. তৈয়বুর রহমান বলেন, আমাদের বেড রয়েছে মাত্র ৬০টি। কিন্তু রোগী ভর্তি থাকছে প্রায় ৩০০। এ কারণে বেড সংকট তীব্র। মেঝেতে বসেই শিশু রোগীদের কষ্ট করে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, রোগীদের ভোগান্তি কমাতে দ্রুত ফ্যানের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।


 


এইচকেআর
গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন