ঢাকা সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬

Motobad news

দেশের ৬৩ দশমিক ৫১ শতাংশ নারী অনলাইন সহিংসতার শিকার

দেশের ৬৩ দশমিক ৫১ শতাংশ নারী অনলাইন সহিংসতার শিকার
গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

দেশের ৬৩ দশমিক ৫১ শতাংশ নারী অনলাইন সহিংসতার শিকার। গত বছরের তুলনায় এ বছর এই সহিংসতা ১৩ দশমমিক ৩২ শতাংশ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা একশনএইড বাংলাদেশের সমীক্ষায় এসব তথ্য এসেছে। ১৬ দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক নারীনির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ উদযাপন উপলক্ষে রবিবার (২৭ নভেম্বর) সমীক্ষার এই ফল প্রকাশ করা হয়। এ উপলক্ষে ঢাকায় ব্র্যাক সেন্টার ইন-এ ‘অনলাইনে নারীর প্রতি সহিংসতা : বাধা এবং উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক আলোচনা সভা আয়োজন করে একশনএইড বাংলাদেশ।

দেশে অনলাইন সহিংসতার হার জানার জন্য একশনএইড বাংলাদেশ এই সমীক্ষাটি পরিচালনা করে। সমীক্ষাটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নারীদের ওপর সহিংসতা, হয়রানি ও এর কারণ চিহ্নিত করা হয়। তাছাড়া এ বিষয়ে সচেতনতার জন্য বিভিন্ন উপায় উপস্থাপন করা হয়।

সাতক্ষীরা , সুনামগঞ্জ , পটুয়াখালী, বান্দরবান , কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট—এই ছয় জেলায় একটি অনলাইন জরিপের মাধ্যমে সমীক্ষা পরিচালিত হয় , যেখানে ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ৩৫৯ জন নারী অংশগ্রহণ করেন।

সমীক্ষায় বলা হয়, ২০২২ সালে বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মধ্যে নারীরা বেশির ভাগই ফেসবুকে (৪৭.৬০%), মেসেঞ্জারে (৩৫.৩৭%), ইনস্টাগ্রামে (৬.১১%), ইমোতে (৩.০৬%), হোয়াটসঅ্যাপে (১.৭৫%) ও ইউটিউবে (১.৩১%) অনলাইন সহিংসতার সম্মুখীন হয়। 'অন্যান্য' মাধ্যমে ৪.৮০% নারী বলেছেন, তারা ভিডিও কল, মোবাইল ফোন এবং এসএমএসের মাধ্যমে হয়রানির সম্মুখীন হয়েছেন। 

এই বছরের সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৮০.৩৫% নারী অনলাইন সহিংসতার মধ্যে ঘৃণ্য এবং আপত্তিকর যৌনতাপূর্ণ মন্তব্য, ৫৩.২৮% নারী ইনবক্সে যৌনতাপূর্ণ ছবি এবং যৌন সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাব, ১৯.১৭% নারী বৈষম্যমূলক মন্তব্যের শিকার হয়েছেন। ১৭.৪৭% উত্তরদাতারা বলেছেন, তাদের নামে অন্য কেউ অনলাইনে নকল আইডি তৈরির ফলে হয়রানির শিকার হয়েছেন, ১৬.১৬% বলেছেন তাদের কার্যকলাপ সব সময় সাইবার স্পেসে অনুসরণ করা হয় এবং ১৩.১০% সমকামীদের অধিকার নিয়ে কথা বলার জন্য ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হয়েছেন, ১১.৭৯% বলেছেন তাদের ব্যক্তিগত ছবি অনুমতি ছাড়াই সোশ্যাল মিডিয়াতে পোস্ট করা হয়েছে এবং ১১.৭৯% যৌন নিপীড়নের হুমকি পেয়েছেন।

৩.০৬% উত্তরদাতার মতে, যৌন নিপীড়নের সময় তাদের ছবি তোলা বা ভিডিও রেকর্ড করা হয়েছিল এবং সেগুলো পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা হয়েছিল। ২.৬২% উত্তরদাতা বলেছেন তাদের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি গোপনে পোস্ট করা হয় এবং পরে তাদের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের হুমকি দিয়ে অর্থের জন্য ব্ল্যাকমেইল করা হয়। ১.৭৫% বলেছেন তাদের ছবি সম্পাদনা করে পর্নোগ্রাফি সাইটে প্রকাশ করা হয়।

সমীক্ষামতে, অনলাইন সহিংসতার কারণে নারীদের জীবনে সবচেয়ে গুরুতর প্রভাব হলো মানসিক আঘাত, হতাশা এবং উদ্বেগ (৬৫.০৭%), দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রভাব হলো সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় থাকা বা মতামত প্রকাশ করার ক্ষেত্রে আস্থা হারানো (৪২.৭৯%)। ২৫.৩৩% ট্রমার শিকার হয়েছেন এবং ২৪.৮৯% মর্যাদা হারিয়েছেন। সমীক্ষায় আরও প্রকাশ করা হয়েছে, অনলাইন সহিংসতা এবং হয়রানির কারণে সৃষ্ট মানসিক যন্ত্রণা নারীর আত্মবিশ্বাস এবং স্বাধীনতাকে মারাত্মকভাবে সংকুচিত করছে।

সমীক্ষায় বলা হয়, ১৪.৯১% নারী অনলাইন সহিংসতার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দিয়েছেন এবং ৮৫%-এরও বেশি নারী কোনো অভিযোগ জমা না দিয়ে নীরব ছিলেন। যদিও তারা বিভিন্ন উপায়ে অনলাইনে হয়রানির শিকার হয়েছেন। অভিযোগকারীদের মধ্যে ৪৪.১২% সোশ্যাল মিডিয়ায় রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে, ২০.৫৯% পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন-এর ফেসবুক পেজের মাধ্যমে, ১১.৭৬% জাতীয় জরুরি পরিষেবা (999)-এর মাধ্যমে, ১১.৭৬% নিকটস্থ থানায়, ৫.৮৮% সাইবার ক্রাইমের ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনে, সিটিটিসি ও ডিএমপির মাধ্যমে অভিযোগ দায়ের করেছেন।

সমীক্ষায় আরও প্রকাশ করা হয়, বেশির ভাগ নারী মনে করেন বিদ্যমান অভিযোগের প্রক্রিয়াগুলি কার্যকর নয়। তাই তারা (২৮.৮৭%) কোনো অভিযোগ জমা দিতে আগ্রহ দেখাননি । ৬৪.৭১% উত্তরদাতা জমা দেওয়া অভিযোগের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিকার বা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখেননি। সামাজিক কলঙ্ক, দোষারোপ এবং গোপনীয়তা হারানোর ভয়ে ৭৫.৭৭% নারী অনলাইনের মাধ্যমে বেনামে অভিযোগ করতে চান।

৫৬.৫৫% উত্তরদাতা আরও বলেছেন, তারা অনলাইনে সহিংসতা এবং নারীর প্রতি হয়রানির বিষয়ে কোনো সচেতনতামূলক প্রচারণা দেখেননি। ৭৩.০৯% বলেছেন, তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা পর্যবেক্ষণ করেছেন, ৩৫.৩৪% টিভি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে, ২০.০৮% ইনফ্লুয়েন্সারের মাধ্যমে এবং ৭.৬৩% সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সচেতনতামূলক কার্যক্রম দেখেছেন।  

সমীক্ষা মতে, ৩৬.৭৯% প্রচারাভিযান বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং কর্পোরেট, ৩৩.৪৯% বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং ২২.১৭% সরকারি প্রতিষ্ঠান দ্বারা সম্পন্ন করা হয়েছে।

সমীক্ষায় উত্তরদাতারা অনলাইন হয়রানি, অপব্যবহার এবং ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং দ্রুত শাস্তির পরামর্শ দিয়েছেন । এছাড়া অনলাইন এবং অফলাইন উভয় মাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা, প্রশিক্ষণ এবং নিরাপদ ডিজিটাল মিডিয়া ব্যবহার সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতন করা এবং রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করার প্রতি অভিমত দিয়েছেন সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারীরা।

সমীক্ষায় বলা হয়, নারীরা অনলাইন ব্যবহার এবং সুরক্ষা প্রোটোকল সম্পর্কে সচেতন নয়, যদিও তারা অনলাইন সহিংসতার সম্মুখীন হচ্ছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কিশোর-কিশোরীরা মোবাইল ফোনের মালিক নয়। তারা তাদের বাবা-মা বা বড় ভাই-বোনের ফোন ব্যবহার করতে অভ্যস্ত, যা তাদের হয়রানি নিয়ে কারও কাছে মুখ খুলতে না পারার একটি প্রধান কারণ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে গ্রামীণ নারীরা ডিজিটাল সাক্ষরতায় পারদর্শী নয়, এমনকি তারা জানেন না কোথায় অভিযোগ জমা দিতে হবে এবং অনলাইন হয়রানি এবং সহিংসতা সংক্রান্ত কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রযুক্তিগতভাবে কী করতে হবে।

একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা নতুন কিছু নয় এবং এটি এখনো বিভিন্ন মাধ্যমে বিদ্যমান রয়েছে। পরিবার, সামজ, রাষ্ট্র- প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে নারীনির্যাতন হচ্ছে এবং এর নানা রকম বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে। এর নতুন এক মাধ্যম  হলো অনলাইন। এই প্রযুক্তির যুগে অনলাইনে নারীদের প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে কিশোরী ও ১৮ বছরের নিচের কন্যা শিশুরা এর শিকার বেশি হচ্ছে । সবাই একত্রিত হয়ে কাজ করলে নারীর প্রতি সহিংসতা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।

অনলাইন সহিংসতা নিরসনে আইনি প্রক্রিয়া জোরদারের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সহায়তা বেশি দরকার বলে অভিমত প্রকাশ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের সহকারী অধ্যাপক তাসলিমা ইয়াসমিন। 

আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার বিজয়ী এবং সাইবার টিনস ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সাদাত রহমান বলেন, বাংলাদেশে অনলাইন হয়রানির কারণে গত দুই বছরে ১১ জন তরুণী আত্মহত্যা করেছেন। কিশোর-কিশোরীরা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সম্পর্কে সচেতন, কিন্তু তারা জানে না কিভাবে সহায়তা পেতে হয়।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের সহায়তা ব্যবস্থাকে সহজলভ্য করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।


এএজে
গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন