ঢাকা সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪

Motobad news

ট্রেন পুড়িয়ে রাজনৈতিক এই হত্যাকাণ্ডের দায় কার?

  ট্রেন পুড়িয়ে রাজনৈতিক এই হত্যাকাণ্ডের  দায় কার?
গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

 -----বিপ্লব রায়, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, দৈনিক মতবাদ

           ভোর হতে না হতেই ট্রেনে পুড়ে মায়ের কোলে এক শিশুসহ চারজনের মৃত্যুর খবর শুনে শরীর শিউরে ওঠেনি, এমন মানুষ হয়তো খুব বেশি না। কারণ, যারা রাজনীতির নামে ট্রেনটিতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে, তাদের এতে কষ্ট পাওয়ার কথা না। বরং তাদের সাফল্য। কোন পশু এই অপকর্ম করেছে, তা হয়তো কখনোই সঠিক ভাবে জানা যাবে না। কারণ,  রাজনৈতিক হত্যা রাজনৈতিক ভাবেই বিচার হয়। আসল অপরাধীকে বাদ দিয়ে নতুন ভাবে জজমিয়া নাটকও সাজানো হতে পারে। তাই প্রচারযন্ত্রে প্রচারিত কারো স্বীকারোক্তি এখন আর বিশ্বাসযোগ্য নয়। সবই সাজানো। সবই বলানো। কিছু সত্য থাকলেও তার আর বিশ্বাস করে না কেউ।

 

     বিএনপি-জামায়াত জোটের ডাকা মঙ্গলবারের সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ভোরে রাজধানীর তেজগাঁও স্টেশনে নেত্রকোণা থেকে আসা মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেনটিতে নৃশংসভাবে এই হত্যাকাণ্ড  ঘটলো। আহারে মৃত্যু! আহারে তোমাদের এই ঘৃণ্য রাজনীতি। এ ধরনের নৃশংসতা করতে যাদের মন একটুও কাঁপেনি, তাদের ঘরে হয়তো মা-বোন কিংবা স্ত্রী-সন্তান কেউ নেই। নিশ্চিত যন্ত্রদানব।
  একই ভাবে যদি  সঠিক ভাবে এর বিচার না করে রাজনৈতিক ভাবে ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবে কেউ ব্যবহার করে, তারাও একই ভাবে অমানুষের তুল্য।

 ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরি বিভাগের মর্গে রাখা ছিল পুড়ে অঙ্গার হওয়া চারজনের মরদেহের সারি।  মর্গের বাইরে দাঁড়িয়ে সেদিকে অপলক তাকিয়ে আছেন শিশু ইয়াছিনের বাবা মিজানুর রহমান। স্ত্রী-সন্তান হারিয়ে তিনি বাকরুদ্ধ। 

   তিনি বলেন, ‘আমি চিৎকার করে কাঁদতে চাইছি। কিন্তু পারছি না। আমার ভেতরে কী চলছে, এটা বোঝাতে পারব না। আমার তো সবই শেষ হয়ে গেল। কী অপরাধে আমার সব শেষ হয়ে গেল জানি না। আমি কারও কাছে বিচার চাইব না। এখন একটাই চাওয়া, আমার স্ত্রী-সন্তানকে যেন আর কাটাছেঁড়া করা না হয়। শুধু অক্ষত লাশ ফেরত চাই।’(প্রথম আলো অনলাইন-১৮ ডিসেম্বর’২০২৩)।

ঢাকার তেজগাঁও এলাকায় হার্ডওয়্যারের ব্যবসা করেন মিজানুর। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে থাকেন পশ্চিম তেজতুরী বাজার এলাকায়। বড় ছেলে রিয়াদ হাসান ফাহিম স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। ছেলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর ৩ ডিসেম্বর দুই সন্তান নিয়ে তাঁর স্ত্রী নাদিরা আক্তার গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনায় যান। সেখান থেকেই মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসে করে ঢাকায় ফিরছিলেন তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান। নাদিরার কলেজপড়ুয়া ছোট ভাই হাবিবুর রহমানও সঙ্গে ছিল। ট্রেনে আগুন লাগার পর ফাহিমকে নিয়ে হাবিবুর ট্রেন থেকে নেমে যান। তবে নাদিরা ও ইয়াছিন আটকা পড়ে আগুনের লেলিহান শিখায় প্রাণ হারান।

এই আগুন শর্টসার্কিটের আগুন না। এই আগুন হচ্ছে রাজনীতির আগুন। মানুষ পুড়িয়ে অঙ্গার করে ক্ষমতায় যাওয়ার আগুন। দেশের সম্পদ পুড়িয়ে ধ্বংস করে ফেলার আগুন।   

  যারা রাজনীতির নামে জনগণের কথা বলে, তাদের এটাই আসল চরিত্র। না হলে সোনার বাংলাদেশে আগুন জ্বলবে কেন? কে নিবে দায় এর? কেউ নিবে না। সব দোষ এ দেশের নিরিহ মানুষগুলোর ভাগ্যের। যারা দেশ ছেড়ে ইউরোপ-আমেরিকায় গিয়ে নিশ্চিন্ত জীবন যাপন করতে পারবে না। তাইতো, কথিত এই রাজনৈতিক হত্যাকারীরা শিশু ইয়াসিনদের পুড়িয়ে মেরে নিজেদের ভাগ্য গড়ার স্বপ্ন দেখে।

 ইয়াছিন নামের তিন বছরের যে শিশুটি আজ আগুনে অঙ্গার হলো তার কী অপরাধ? সে তো মায়ের কোলে নিরাপদে ঘুমিয়ে ছিল। তার মা নাদিরা আক্তার পপি, দূর গাঁয়ের এই পল্লী বধূ কি রাজনীতির কিছু জানেন? তাকে মরতে হলো কেন? 

  ক্ষমতাসীন দলের কর্ণধররা গণহারে সবকিছুতেই শুধু বিরোধীদের দিকে আঙ্গুল তুলে দেন। কিন্তু এ দেশের প্রভাবশালী রাজনৈতিক সব দলেরই হাত রক্তে রঞ্জিত। বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় থাকার সময় আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করতে ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান, একুশে আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা, রমনা বটমূলে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে নির্বিচারে মানুষ হত্যার বহু ঘটনা এদেশে ঘটেছে। তখনও ক্ষমতাসীনরা তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগকেই এসব ঘটনায় দায়ী করে একের পর এক বিবৃতি দিয়েছে।

একই রকম ঘটনার শেষ নেই ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও। লগি বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে মানুষ হত্যা করেছে আওয়ামী লীগ। আর গত ১৫ বছর দেশ শাসনের নামে শোষনের আগুনে এখনো জ¦লছে মানুষ। বাজারে সব পণ্যের দামে আগুন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপিরা বেসুরো গলায় জনগণকে সমৃদ্ধির জয়গান শোনতে বাধ্য করছে। এরচেয়ে প্রহসন আর কিছু হতে পারে না।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসেবে ২০২২ সালের প্রথম চার মাসে সারাদেশে রাজনৈতিক সংঘাত ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ২০১টি। এইসব ঘটনায় আহত হয়েছেন দুই হাজার ২৬২ জন। নিহত হয়েছেন ৪১ জন।

এটা ২০২০ সালে এক বছরে নিহতের চেয়ে বেশি। ওই বছর নিহত হয়েছিলেন ৩১ জন। ২০২১ সাল থেকে নিহতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ২০২১ সালে রাজনৈতিক সংঘর্ষে নিহত হন ১৫৭ জন। এর কারণ হিসবে ২০২১  সালের পুরো বছরই স্থানীয় সরকারের  নানা পর্যায়ের নির্বাচনকে দায়ী করা হয়।


এই হিসেব দিতে গেলে কয়েক রাত ভোর হবে। কিন্তু শেষ হবে না। তবুও তারা সবাই ধোয়া তুলশী পাতা। কারণ, হতভাগ্য এই দেশে যারা যখন ক্ষমতায় থাকে, তারাই সবচেয়ে বড় দেশপ্রেমিক, সবচেয়ে বেশি গণতান্ত্রিক। আর সবচেয়ে খারাপ থাকে বিরোধী দলের লোকজন।

রাজনীতিবিদরা জবাব দিন- কেন এই নিরীহ মানুষগুলোকে পুড়িয়ে মারতে হবে? কেন দেশের সম্পদ নষ্ট করতে হবে? আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারার এই পথ-পন্থা ছাড়া কি সরকার হঠানোর আর কোনো ভাষা নেই? হরতাল-অবরোধের নামে মানুষ হত্যা করে তারা কার জন্য রাজনীতি করছেন? রাজনীতি যদি মানুষের জন্যই হয় তাহলে কেন মানুষকেই হত্যা করছেন? এসব প্রশ্নের জবাব একদিন দিতেই হবে আপনাদের। আর এই অপরাধের ভার সারাজীবন আপনাদের বংশ পরম্পরায় বইতে হবে। কারণ, আপনারা লোভী, কাপুরুষ, প্রতিশ্রæতি ভঙ্গকারী, দেশের সম্পদ লুন্ঠনকারী। আপনাদের ক্ষমা নেই।

 


এমএন
গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন