ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৫ অগাস্ট ২০২১

Motobad news

২৬ বছর পর কারামুক্ত পেয়ারাকে বাঁচার স্বপ্ন দেখালেন জেলা প্রশাসক

২৬ বছর পর কারামুক্ত পেয়ারাকে বাঁচার স্বপ্ন দেখালেন জেলা প্রশাসক
ছবি: বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রধান ফটকে কারামুক্ত নারীদের সেলাই মেশিন তুলে দেন জেলা প্রশাসক

হত্যা মামলায় ১৯৯৫ সাল থেকে কারাভোগের পর মুক্তি পেয়েছেন পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার মিরুখালী গ্রামের মৃত আনিস মৃধার মেয়ে পেয়ারা আক্তার। শিশুকাল থেকে দীর্ঘ ২৬ বছর কারাভোগের পর গত ১০ জুন বরিশালের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসকের শুপারিশে বিশেষ বিবেচনায় সাজা মৌকুফ করে চার বছর আগেই বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি। আপন চাচাতো বোনকে পানিতে ফেলে হত্যার অপরাধে তাকে ৩০ বছর কারাদণ্ড দেয় আদালত।

কারামুক্তির পরে বৃদ্ধা মাকে নিয়ে অসহায় জীবনযাপন করছিলেন তিনি। তার সম্বলহীন দুই ভাই অর্থাভাবের কারণে বৃদ্ধা মা এবং কারামুক্ত বোনের পাশে দাঁড়াতে পারেনি। তাই কারামুক্ত পেয়ারা আক্তারের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন বরিশালের জেলা প্রশাসক মো. জসীম উদ্দীন হায়দার।

তিনি বরিশাল সমাজসেবা কার্যালয়ের সহযোগিতায় অপরাধী সংশোধন ও পুনর্বাসন সমিতির পক্ষ থেকে পেয়ারাকে কর্মসংস্থানের জন্য একটি সেলাই মেশিন উপহার দিয়েছেন। পাশাপাশি তাকে একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দিবেন বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের প্রবেশন অফিসার সাজ্জাদ পারভেজ।

একই সময় হত্যাসহ বিভিন্ন বিভিন্ন মামলায় কারামুক্ত এবং জামিনে থাকা তিন নারী-পুরুষকে কর্মসংস্থানের জন্য সেলাই মেশিন ও ভ্যান গাড়ি উপহার দিয়েন তারা। বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রধান ফটকে (জেল গেট) আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের হাতে এই সহায়তা তুলে দেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট।

এসময় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট গৌতম বাড়ৈ, জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সুব্রত বিশ্বাস দাস, সিনিয়র জেল সুপার প্রশান্ত কুমার দাস, জেলা প্রশাসনের প্রবেশন অফিসার সাজ্জাদ পারভেজ প্রমুখ।

২৬ বছর সাজাভোগ করে কারামুক্ত পেয়ারা আক্তার ঘটনার বর্ননা দিতে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘জমি জমা নিয়ে চাচাতো চাচা জহুরুল হক ও চাচাতো ভাই সত্তার মৃধার সাথে আমাদের পরিবারের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। ঘটনার সময় আমি মিরুখালীর একটি প্রাইমারী স্কুলের পঞ্চম শ্রেণিতে পরতাম। ওই সময় চাচাতো বোন মেহজাবিন পানিতে ডুবে মারা যায়। যে ঘটনা আমি নিজেই জানতাম না।

ঘটনার দিন আমার স্কুলে একটি অনুষ্ঠান ছিল। তাই প্রতিদিনের ন্যায় ওইদিন ভোরে সেজে-গুজে স্কুলে চলে যাই। হঠাৎ থানা থেকে এক দারোগা এসে আমাকে বলে তুমি তোমার বোনকে পানিতে ফেলে দিয়েছো। আমি অস্বীকার করলে তিনি আমাকে থানায় নিয়ে বিভিন্ন ভয়-ভীতি দেখিয়ে বোনকে পানিতে ফেলে হত্যা করেছি বলে স্বীকারক্তি আদায় করে। তবে আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট আমাকে বলেছিলেন, ‘তোমার কোন ভয় নেই, তুমি আমার কাছে বলতে পারো’। কিন্তু আমি পুলিশের ভয়ে তাদের শেখানো কথাগুলোই ম্যাজিস্ট্রেটকে বলে দেই।

তিনি বলেন, ‘ওই স্বীকারক্তির কারণেই বিচারক আমাকে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। সাজার হওয়ার আগে দুবছর আমি পিরোজপুর জেলা কারাগারে ছিলাম। সাজার পরে আমাকে ১৯৯৭ সালের ২৪ এপ্রিল বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে আসা হয়। কারাগারের চার দেয়ালের মাঝে একাকি নিঃসঙ্গ জীবন কাটিয়েছি দীর্ঘ ২৬টি বছর। জীবন-যৌবনসহ হারিয়েছি সকল সাদ-আল্লাদ। আমার দুই ভাই আদালতে নির্দোশ প্রমাণ করতে আমাদের সহায়-সম্বল সব বিক্রি করে দিয়েছে। তাই কারামুক্তির পর বাকি জীবন নিয়েও ছিলাম দুশ্চিন্তায়।’

পেয়ারা বলেন, ‘বরিশালের জেলা প্রশাসক স্যার আমাকে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। আমার সাজার মেয়াদ কমিয়ে আমাকে মুক্তির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। সেলাই মেশিন দিয়ে কর্মস্থানের ব্যবস্থা করেছেন। এখন একটি চাকরির ব্যবস্থাও করে দিবেন বলে আশ্বস্থ করেছেন। এতো কিছু পাবো তা স্বপ্নেও ভাবিনি। আমি আবার নতুন করে জীবন সংগ্রাম শুরু করতে চাই। জেলা প্রশাসক ও সমাজসেবা কর্মকর্তাদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি এখন একটু মাথা গোজার ঠাই পেতে চাই। যেখানে অসহায় বৃদ্ধা মাকে নিয়ে থাকতে পারবো।’

এ প্রসঙ্গে বরিশালের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দীন হায়দার বলেন, ‘অপরাধী হয়ে কেউ জন্মায় না। তারা তাদের কৃতকর্মে হয়তো বা জেলে চলে আসে। আবার কেউ কেউ আছে বিনা অপরাধে জেল খাটে। আমরা অনেক বার এর প্রমাণ পেয়েছি। যথাযথ প্রমাণের অভাবে হয়তো তাদেরকে জেল খাটতে হয়েছে।

পেয়ারা আক্তারের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘পেয়ারা আক্তার ২৬ বছর জেল খেটেছে। এখন তার থাকা এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থা করছি আমরা। তিনি যেন আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন। এছাড়াও জেলখানার হাজতিদের সেলাই মেশিন, ভ্যান ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যারা অপরাধের সাথে জড়িত ছিল তাদের আমরা সু-পথে ফিরিয়ে আনবো। সবার সহযোগিতা ও বৃত্তবানদের এ কাজে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

উল্লেখ্য, পেয়ারা আক্তার ছাড়াও চুরির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে স্বাধীনতা দিবসে সাধারণ ক্ষমতায় কারামুক্ত বরিশালের হিজলা উপজেলার গুয়াবাড়িয়া এলাকার মৃত আবুল কালামের ছেলে মো. আব্দুর রহমানকে একটি ভ্যানগাড়ি ও স্বামী হত্যা মামলার আসামী জামিনে থাকা হিজলা উপজেলার শ্রীপুর এলাকার বাসিন্দা শহীদ মোল্লার স্ত্রী খালেদা বেগম এবং বরিশাল নগরীর উত্তর আমানতগঞ্জ এলাকার আবুল সিকদারের মেয়ে চেক জালিয়াতি মামলায় জামিনে থাকা আসামি আশা আক্তারকে অপরাধী সংশোধন ও পুনর্বাসন সমিতির পক্ষ থেকে একটি করে সেলাই মেশিন প্রদান করা হয়েছে।


কেআর