কালরাত্রির রক্তঋণ ও বিশ্ববিবেকের দায়: ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস

বাহাউদ্দিন গোলাপ:
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের সেই কৃষ্ণপক্ষীয় বিভীষিকা কেবল একটি পঞ্জিকার তারিখ নয়, বরং তা মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক অমোঘ চপেটাঘাত এবং বিশ্ববিবেকের ললাটে এক আমৃত্যু কলঙ্কতিলক। এই পৈশাচিকতার নেপথ্যে ছিল সত্তরের নির্বাচনে বাঙালির নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেটকে অস্বীকার করার এক সুগভীর ষড়যন্ত্র। যখন আলোচনার টেবিলে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কালক্ষেপণ চলছিল, তখন মূলত ১৮ মার্চ ঢাকা সেনানিবাসে জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা ও রাও ফরমান আলীর গোপন বৈঠকে চূড়ান্ত হয়েছিল ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর ব্লু-প্রিন্ট। সেই মধ্যরাতে সাঁজোয়া যানের কর্কশ ঘর্ঘরানিতে বিদীর্ণ হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে পিলখানা আর রাজারবাগের প্রতিটি ইঞ্চি মাটি।
ইতিহাসের অকাট্য দলিল ও পরবর্তীকালে প্রকাশিত ‘হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট’ সাক্ষ্য দেয়, এই অভিযান ছিল সুপরিকল্পিতভাবে একটি নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীকে নির্মূল করার পদ্ধতিগত প্রয়াস। রাও ফরমান আলীর ডায়েরিতে পাওয়া সেই কুখ্যাত উক্তি— “পূর্ব পাকিস্তানের সবুজ ভূখণ্ড লাল রঙে রাঙিয়ে দেওয়া হবে”—প্রমাণ করে যে এটি কোনো আকস্মিক সামরিক সংঘাত ছিল না, বরং ছিল ১৯৪৮ সালের জাতিসংঘের ‘জেনোসাইড কনভেনশন’-এর ২য় অনুচ্ছেদে বর্ণিত একটি জাতিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার সুনির্দিষ্ট ‘অভিপ্রায়’।
ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা কিংবা ড. ফজলুর রহমানের মতো বরেণ্য শিক্ষকদের নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং জগন্নাথ হলের মাঠে সেই পৈশাচিক গণকবর ছিল একটি জাতিকে চিরতরে মেধাশূন্য করার এক জঘন্য মহড়া। এমনকি রোকেয়া হলের নারী শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো পৈশাচিকতা এবং পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারের সরু গলিতে নিরীহ হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর চালানো নারকীয় হত্যাযজ্ঞ প্রমাণ করে যে, পাকিস্তানি জান্তার লক্ষ্য ছিল পাইকারি হারে মানুষ হত্যা করে এক মহাভীতি তৈরি করা।
পঁচিশের সেই কালরাত্রিতে কেবল নিরীহ মানুষ হত্যাই নয়, বরং পিলখানা ও রাজারবাগে সশস্ত্র প্রতিরোধের যে সূচনা হয়েছিল, তা ছিল আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সোপান। আধুনিক সমরাস্ত্রের সামনে থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল দিয়ে বাঙালি পুলিশ ও ইপিআর সদস্যরা যে অসীম সাহসিকতায় রুখে দাঁড়িয়েছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। অন্যদিকে, এই ভয়াবহতা যখন চরমে, তখনই ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়ক থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। কিন্তু বন্দী হওয়ার পূর্বমুহূর্তে, ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে প্রেরিত তাঁর সেই ঐতিহাসিক স্বাধীনতার ঘোষণাটিই হয়ে উঠেছিল মুক্তিকামী মানুষের একমাত্র রণধ্বনি।
বঙ্গবন্ধুর সেই অমোঘ বার্তা— “ইহাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ হইতে বাংলাদেশ স্বাধীন”—মুহূর্তেই দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। তৎকালীন মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার কে ব্লাড তাঁর প্রেরিত ঐতিহাসিক ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’-এ এই হত্যাযজ্ঞকে ‘সিলেক্টিভ জেনোসাইড’ হিসেবে অভিহিত করে নিজ সরকারকে ধিক্কার জানিয়েছিলেন। তৎকালীন ব্রিটিশ সাংবাদিক পিটার হ্যাজেলহার্স্ট থেকে শুরু করে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিকোলাস হুইটম্যানের রিপোর্ট—সবখানেই এই সুসংগঠিত গণহত্যার দালিলিক প্রমাণ বিদ্যমান। বিশ্বখ্যাত দার্শনিক জঁ-পল সার্ত্র এই বর্বরতাকে মানবতার বিরুদ্ধে চরম অপরাধ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন এবং ফরাসি মনীষী আঁদ্রে মারলো বাংলাদেশের এই ন্যায্য লড়াইয়ে অস্ত্র ধরার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। ‘জেনোসাইড ওয়াচ’ এবং ‘আইএজিএস’ (IAGS) ইতিমধ্যে একে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও জাতিসংঘের দাপ্তরিক তালিকায় এর অনুপস্থিতি আজও বৈশ্বিক মানবাধিকারের অঙ্গীকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সুদীর্ঘ ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও আজ অবধি সেই কালরাত্রির বীভৎসতা আন্তর্জাতিকভাবে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে তার প্রাপ্য বিশ্বজনীন স্বীকৃতি পায়নি, যা বৈশ্বিক রাজনীতির এক বিমর্ষ অধ্যায়। যেখানে রুয়ান্ডা, বসনিয়া কিংবা কম্বোডিয়ার গণহত্যা বিশ্বস্বীকৃত, সেখানে মাত্র নয় মাসে ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ আর ২৫ মার্চের সেই প্রলয়ংকরী তান্ডব কেন আজও স্বীকৃতির অপেক্ষায় থাকবে—সেই বৈষম্যের অবসান হওয়া আজ সময়ের অনিবার্য দাবি।
ইতিহাসের সেই বিভীষিকাময় অধ্যায়কে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না দেওয়া মানেই হচ্ছে প্রকারান্তরে সেই পৈশাচিকতাকেই প্রশ্রয় দেওয়া এবং হানা আরেন্ডট-এর সেই ‘ব্যানালিটি অফ ইভিল’ বা মন্দের যান্ত্রিক রূপকেই জয়ী করা। আজকের এই শোকাবহ দিনে আমাদের কণ্ঠস্বর আরও শানিত হোক সেইসব অগণিত শহীদের স্মৃতির প্রতি, যাদের বুকের তপ্ত রক্তে ভিজে উঠেছিল ভোরের সূর্য। বঙ্গবন্ধুর সেই অদম্য সাহস আর শহীদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই রচিত হয়েছিল আমাদের বিজয়ের সোপান। ইতিহাসের এই রক্তঋণ শোধের পথে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনই হতে পারে তাঁদের প্রতি আমাদের শ্রেষ্ঠতম নিবেদন। এই রক্তস্নাত ইতিহাস যেন কেবল আমাদের জাতীয় হৃদস্পন্দনে সীমাবদ্ধ না থেকে বিশ্বদরবারের দালিলিক নথিতেও জেনোসাইডের অমোঘ দলিল হিসেবে চিরভাস্বর হয়ে থাকে, যেন পৃথিবীর কোনো প্রান্তেই আর কোনো শাসকগোষ্ঠী এমন পরিকল্পিত বিনাশী তান্ডব চালানোর সাহস না পায়।
বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়)