সুস্থ সমাজ গড়তে ডিজিটাল ডিটক্স

মো. হাসনাইন ॥
আজকের বিশ্বে ডিজিটাল ডিভাইস আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সার্বক্ষণিক ইন্টারনেট সংযোগ আমাদের কাজের ধরণ এবং যোগাযোগের পদ্ধতিকে বদলে দিয়েছে। এমনকি বিনোদনের ধরণে এসেছে আমূল পরিবর্তন। যদিও এসব অগ্রগতি আমাদের জীবনকে সহজ ও কার্যকর করেছে, তবুও এতে রয়েছে অনেক নেতিবাচক প্রভাব।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্তি বলতে বোঝায় এমন একটি অবস্থা, যখন একজন ব্যক্তি অতিরিক্ত সময় এসব প্ল্যাটফর্মে ব্যয় করে এবং নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়। এই আসক্তির প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা ও আকর্ষণীয় কনটেন্ট। স্মার্টফোনের মাধ্যমে যে কোনো সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রবেশ করা যায়। এছাড়া লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার পাওয়ার মাধ্যমে মানুষ এক ধরনের মানসিক তৃপ্তি পায়, যা বারবার এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে উৎসাহিত করে। অনেক ক্ষেত্রে একাকীত্ব, মানসিক চাপ বা অবসাদ থেকে মুক্তি পেতেও মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অতিরিক্ত সময় কাটায়। বিশেষ করে আজকের প্রজন্মের বড় একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্ত হয়ে পড়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্তির নানা ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে। প্রথমত, এটি মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অন্যদের জীবনের সাথে নিজের জীবন তুলনা করার প্রবণতা থেকে হতাশা ও আত্মবিশ্বাসের অভাব তৈরি হয়। দ্বিতীয়ত, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে ঘুমের সমস্যা, চোখের ক্ষতি এবং শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়। তৃতীয়ত, এটি মানুষের সামাজিক সম্পর্ককে দুর্বল করে, কারণ বাস্তব জীবনের যোগাযোগ কমে যায়। এই আসক্তির ফলে ব্যক্তি বাস্তব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ, পড়াশোনা, এমনকি সম্পর্কগুলোও অবহেলা করতে শুরু করে। ধীরে ধীরে এটি একটি মানসিক অভ্যাসে পরিণত হয়, যা থেকে বের হয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। এখানেই ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ ধারণাটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ডিজিটাল ডিটক্স বলতে স্মার্টফোন, কম্পিউটার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মতো ডিজিটাল ডিভাইস থেকে সচেতনভাবে কিছু সময়ের জন্য বিরতি নেওয়াকে বোঝায়। এটি মানুষকে ভার্চুয়াল জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাস্তব জীবনের সাথে পুনরায় সংযোগ স্থাপনে সহায়তা করে। এর লক্ষ্য প্রযুক্তিকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া নয়, বরং অনলাইন ও অফলাইন জীবনের মধ্যে একটি স্বাস্থ্যকর ভারসাম্য তৈরি করা।
এক যুগ আগেও শিশু কিশোরদের খেলার সাথী ছিল পাড়া প্রতিবেশীর শিশু-কিশোর, নানা ধরনের মাটির হাঁড়ি-পাতিল ও পুতুল। হরেক রকমের খেলা খেলে পার করত নিজেদের শৈশব-কৈশোরকাল। বর্তমানে শিশুদের খেলার সঙ্গী স্মার্টফোন। ভিডিও গেমস ও কার্টুন দেখতে ব্যস্ত তারা। অনেক অভিভাবক শিশুদের কান্না থামাতে তাদের হাতে স্মার্টফোন ধরিয়ে দেয়। এভাবেই শিশুরা একটা সময় অনলাইনে আসক্ত হয়ে পড়ে এবং তারা পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়ে যায়।
উদ্বেগের বিষয় হলো ডেইলি স্টার পত্রিকায় প্রকাশিত সম্প্রতি আইসিডিডিআর,বি’র নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার শিশুরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সময় ডিজিটাল স্ক্রিনে (মোবাইল, টিভি, ট্যাব বা কম্পিউটার) তাকিয়ে থাকে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, অতিরিক্ত এই স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে শিশুদের পর্যাপ্ত ঘুম ব্যাহত হচ্ছে এবং তারা স্থূলতা ও বিভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে।
২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকার ছয়টি স্কুলের ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৪২০ জন শিশুর ওপর এই গবেষণাটি চালানো হয়।
গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি জার্নাল অব মেডিকেল ইন্টারনেট রিসার্চ (জেএমআইআর) হিউম্যান ফ্যাক্টরসে প্রকাশিত হয়েছে। ফলাফলে দেখা গেছে, গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের মধ্যে ৮৩ শতাংশই বিনোদনের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করছে। এর নেতিবাচক প্রভাব হিসেবে প্রতি ৩ জন শিশুর মধ্যে ১ জন চোখের সমস্যায় ভুগছে। প্রায় ৮০ শতাংশ শিশু নিয়মিত মাথাব্যথার কথা জানিয়েছে। শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় সময়ের চেয়ে ১ থেকে ৩ ঘণ্টা কম ঘুম হচ্ছে। প্রতি ৫ জন শিশুর মধ্যে ২ জন এক বা একাধিক মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত।
গবেষকরা জানান, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার বিভিন্নভাবে শিশুদের ক্ষতি করতে পারে। রাতে স্ক্রিন ব্যবহার মস্তিষ্ককে উত্তেজিত করে ঘুমের স্বাভাবিক চক্রকে ব্যাহত করে। এছাড়া দীর্ঘক্ষণ বসে থাকায় শারীরিক পরিশ্রম ও খেলাধুলা কমে গিয়ে স্থূলতার ঝুঁকি বাড়ায়। এছাড়া, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে শিশুদের অন্যদের সঙ্গে সরাসরি মেলামেশা কমে যায়, যা তাদের মন-মেজাজ, অনুভূতি এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে।
ইন্টারনেটে নিরাপত্তা নিয়ে শিশুরা কী ভাবে, তাদের পরিস্থিতি কী, এসব জানতে ইউনিসেফ সারা দেশে একটি জরিপ চালায়। ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী ১১ হাজার ৮২১ ছেলেমেয়ে জরিপে অংশ নেয়। জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের ৮১ দশমিক ২ শতাংশ শিশু-কিশোর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিদিন সময় কাটায়। এদের ৯০ শতাংশই মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করে।
শিশু-কিশোররা ইন্টারনেটের ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের সঙ্গে সাইবার অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে। বেসরকারি এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ৬০ শতাংশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে। ছদ্মবেশে বখাটেপনা, ইভটিজিং করা থেকে শুরু করে সামাজিক মাধ্যমে সচরাচর হচ্ছে হ্যাকিং এবং ঘটছে ব্ল্যাকমেলের মতো ঘটনাও। জরিপে আরও দেখা যায়, প্রতি ২০ সেকেন্ডে এই ধরনের একটি অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে, যার ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে ব্যক্তি থেকে শুরু করে পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে।
ডিজিটাল ডিটক্সের অন্যতম প্রধান উপকারিতা হলো মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করলে মানুষ প্রায়ই অন্যদের জীবনের সাজানো-গোছানো দিকগুলোর সাথে নিজের জীবন তুলনা করে, যা হতাশার কারণ হতে পারে। কিছু সময়ের জন্য বিরতি নেওয়া এই চাপ কমাতে সাহায্য করে এবং আত্মসচেতনতা ও সন্তুষ্টি বৃদ্ধি করে। পাশাপাশি এটি মনকে বিশ্রাম দেয়, ফলে মনোযোগ ও কর্মক্ষমতা বাড়ে।
এই পদ্ধতির আরেকটি সুবিধা হলো শারীরিক সুস্থতা বৃদ্ধি। অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে ঘুমের সমস্যা, চোখের ক্লান্তি এবং অলস জীবনযাপন দেখা যায়। ডিভাইস ব্যবহারে কমিয়ে মানুষ ব্যায়াম, বই পড়া বা বাইরে সময় কাটানোর মতো স্বাস্থ্যকর কাজে যুক্ত হতে পারে। এতে শারীরিক স্বাস্থ্যের উন্নতির পাশাপাশি সামগ্রিক সুখও বৃদ্ধি পায়।
ডিজিটাল ডিটক্স ব্যক্তিগত সম্পর্ককে আরও মজবুত করে। অনেক সময় মানুষ শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকলেও মানসিকভাবে অনুপস্থিত থাকে, কারণ তারা বারবার ফোন চেক করে। ডিভাইস থেকে দূরে থাকলে পরিবার ও বন্ধুদের সাথে আরও অর্থবহভাবে সময় কাটানো যায়, যা সম্পর্ককে গভীর করে এবং যোগাযোগ উন্নত করে।
তবে আধুনিক যুগে ডিজিটাল ডিটক্স পালন করা সহজ নয়। অনেক পেশায় সার্বক্ষণিক অনলাইন উপস্থিতি প্রয়োজন হয় এবং সামাজিক যোগাযোগও অনেকাংশে ডিজিটাল মাধ্যমে হয়। তাই পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরিবর্তে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি বেশি বাস্তবসম্মত। যেমন-স্ক্রিন টাইম সীমিত করা, নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা বা নির্দিষ্ট একটি সময়ে নিজেকে ফোন-মুক্ত রাখা কার্যকর উপায় হতে পারে। ইতিবাচক দিক হলো তরুণদের ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, ২৮ শতাংশ তরুণ একবার ডিজিটাল ডিটক্সের চেষ্টা করেছে, তবে তা বজায় রাখতে পেরেছে কেবল ১২ শতাংশ।
সবশেষে বলা যায়, ডিজিটাল আসক্তি কেবল একটি ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, বরং এটি আমাদের আগামীর গোটা তরুণ প্রজন্মমের জন্য বড় একটি অশনি সংকেত। এই সংকট থেকে মুক্ত হতে হলে শুধু ব্যক্তি বা পরিবার নয়, পুরো সমাজকে সচেতন হতে হবে। সেক্ষেত্রে ডিজিটাল ডিটক্স আমাদেরকে একটু বিরতি নেওয়ার, নিজেকে পুনরুজ্জীবিত করার এবং সময় ও মনোযোগের উপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ দেয়। ছোট ছোট কিন্তু ধারাবাহিক পরিবর্তনের মাধ্যমে আমরা প্রযুক্তির সুবিধা ভোগ করতে পারি এবং এর নেতিবাচক প্রভাব থেকেও মুক্ত থাকতে পারি। এভাবেই আমাদের শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীরা পাবে একটি সুস্থ এবং স্বাভাবিক জীবন। আর তাদের হাত ধরেই নির্মিত হবে ভবিষ্যতের উন্নত বাংলাদেশ।
(পিআইডি ফিচার)
লেখক: মো. হাসনাইন, সহকারী তথ্য অফিসার, পিআইডি, বরিশাল।
এইচকেআর