ঢাকা শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

Motobad news
শিরোনাম
  • কীর্তনখোলা নদীতে দুর্ঘটনার শিকার ৩০০ টন গমবাহী কার্গো  বাবুগঞ্জে ভুয়া নারী চিকিৎসককে দেড় লাখ টাকা জরিমানা  গাজীপুরে পুলিশ ও বিএনপি নেতা নিহত, ট্রাকচালক বরিশালে গ্রেপ্তার মেঘনা নদীতে মা ইলিশ ধরতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ জেলের মৃত্যু এবার পাঠ্যবইয়ে নৌকাকাণ্ডে অভিযুক্ত ইকবাল হায়দার ওএসডি  ছেলের মৃত্যুর কারণ জানেন না বাবা, মাঝেমধ্যে ‘আশঙ্কার’ কথা বলতেন তাহসিফ  বরিশাল নগরীতে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় আইনজীবী নিহত রাজাপুরে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যুবককে হত্যার অভিযোগ স্পেনে দ্রুতগতির দুই ট্রেনের সংঘর্ষে অন্তত ৪৬ জন নিহত মাসুদ সাঈদীর ইস্তাম্বুলসহ কুয়াকাটায় তিন হোটেলের নির্মাণকাজ বন্ধ 
  • চরমোনাই রাজারচরে দাঁড়িয়ে আছে সাড়ে ৩শ বছরের ‘অক্সিজেন ব্যাংক’

     চরমোনাই রাজারচরে দাঁড়িয়ে আছে সাড়ে ৩শ বছরের ‘অক্সিজেন ব্যাংক’
    ছবি: সংগৃহীত 
    গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

    প্রথম দেখায় মনে হবে আমাজন বা সুন্দরবনের কোনো গহীন অরণ্য। আদিগন্ত বিস্তৃত ডালপালা আর শেকড়ের জালে ঢাকা পড়ে গেছে আস্ত একটা আকাশ। কিন্তু ভুল ভাঙবে একটু কাছে গেলেই।

    এটি কোনো জঙ্গল নয়; দুটি বড় ফুটবল মাঠের সমান জায়গা জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মাত্র গাছ! সাড়ে পাঁচ একর জমিতে বুক টান করে দাঁড়িয়ে থাকা এই একটি গাছের ডালপালা আর শেকড়ের সুশীতল ছায়ায় যুগের পর যুগ ধরে বসতি গেড়েছে দুটি গ্রামের কয়েকশ মানুষ।

    বরিশাল সদর উপজেলার চরমোনাই ইউনিয়নের রাজারচর গ্রামে অবস্থিত এই প্রাকৃতিক বিস্ময়। উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের খাতায় এটি 'পাকুড়' গাছ হলেও, স্থানীয়দের কাছে পরম শ্রদ্ধার ‘বটগাছ’। সাড়ে ৩০০ বছরেরও বেশি পুরোনো এই মহীরুহের মূল কাণ্ড কোনটা, আর আকাশ থেকে নেমে আসা শেকড় (ঝুড়ি) কোনগুলো, তা চেনার সাধ্য নেই স্বয়ং বিজ্ঞানীদেরও।

    রাজারচরের এই গাছটি শুধু প্রকৃতির আশ্চর্যই নয়, এটি দুই ধর্মের মানুষের পরম সম্প্রীতির এক মিলনমেলা। গাছের বিশাল চত্বরে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা যেমন ভক্তিভরে পূজা-অর্চনা করেন, তেমনি মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও গাছটিকে দেখছেন গভীর শ্রদ্ধার চোখে। অমোঘ এক সামাজিক নিয়মে এই গাছের একটা পাতাও কেউ ছেঁড়েন না, জ্বালানির জন্য ভাঙেন না শুকনো একটা ডালও। আর এই ভালোবাসার প্রতিদানেই গাছটি বুক পেতে আগলে রেখেছে সবাইকে।

    গাছটিকে ঘিরে লোকমুখে প্রচলিত আছে শত বছরের রোমাঞ্চকর সব গল্প। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের লোকবিশ্বাস, বহু বছর আগে মাটি ফুঁড়ে এখানে এক শিবলিঙ্গ উদিত হয়েছিল, যা বর্তমানে গাছেরই কোনো এক শাখার আবডালে লুকিয়ে আছে। প্রতিবছর অক্ষয় তৃতীয়া কিংবা কালী পূজায় এই গাছতলার মন্দিরে বসে উৎসবের মেলা। মানত পূরণ হলে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে আসেন চুল বিসর্জন দিতে কিংবা মন্দিরে দান করতে।

    গাছের ডাল ভাঙলে ‘অমঙ্গল’ হয়, এমন এক অলৌকিক বিশ্বাস তাড়া করে সবাইকে। স্থানীয় বাসিন্দা নমিতা বলেন, বহু বছর আগে এক লোক নিজের জমিতে গাছের ডাল চলে আসায় তা কাটার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ডাল কাটার পরপরই তিনি অদ্ভুত এক রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। সেই থেকে আমরা গাছের মগডালে উঠে সৌন্দর্য দেখার সাহসও পাই না, মাটিতে পড়া পাতাও কুড়িয়ে নিই না।

    গ্রামের অশীতিপর বৃদ্ধ মো. মোস্তফা শোনালেন আরও এক রূপকথা। তাঁর দাদুর মুখে শোনা, একসময় এই গাছের পাশ দিয়ে বয়ে চলা খালে পূর্ণিমার রাতে সোনার হাঁড়ি-পাতিল ভেসে উঠত। একবার এক লোভী মানুষ সেই পাতিল চুরি করার পর অলৌকিকভাবে মারা যান এবং সেই থেকে খালটিও শুকিয়ে যায়। এসব গল্পের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি না থাকলেও, এই লোককথাগুলোই মূলত গাছটিকে মানুষের কুঠার থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে শত বছর ধরে।

    মানুষের কোনো রকম অত্যাচার না থাকায় গাছটি ডানা মেলেছে তার আপন খেয়ালে। পরিবেশপ্রেমী এলবার্ট রিপন বল্লভ বলেন, প্রকৃতি আমাদের এক অফুরন্ত সৌন্দর্য উপহার দিয়েছে। মানুষের কোনো হস্তক্ষেপ না থাকায় এটি নিজের ধারায় অপরূপ হয়ে উঠেছে। কার্বন নিঃসরণের এই জমানায়, যখন পৃথিবী ধুঁকছে, তখন এই গাছটি একটি আস্ত অক্সিজেনের খনি। এখানে পাখিরা পায় অভয়ারণ্য, আর মানুষ পায় বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার অফুরন্ত বাতাস।

    বরিশাল নগরীর বেলতলা থেকে খেয়া পার হয়ে এই রাজারচর গ্রামে পৌঁছাতে সময় লাগে মাত্র ৪০ থেকে ৪৫ মিনিট। প্রতিদিন এই অলৌকিক বৃক্ষরাজী দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভিড় জমাচ্ছেন শত শত পর্যটক। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই পর্যটন সম্ভাবনাময় স্থানে যাওয়ার রাস্তাঘাটের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। যাতায়াত ব্যবস্থার বেহাল দশার কারণে দূর-দূরান্ত থেকে আসা সাধারণ মানুষকে পড়তে হয় চরম বিপাকে।

    রাজারচরবাসীর দাবি, সরকারি উদ্যোগে এখানে দ্রুত একটি পাকা রাস্তা ও পর্যটনবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা হোক। যদি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা যায়, তবে এটি হতে পারে বরিশালের অন্যতম শীর্ষ আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র। প্রকৃতির এই পরম বিস্ময় হাজার বছর ধরে বেঁচে থাকুক পাখি, মানুষ আর পৃথিবীর ফুসফুস হয়ে।


    এইচকেআর
    গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ