গরমে অস্থির জনজীবন, বিদ্যুতের জন্য কাটছে নির্ঘুম রাত

গরমে দেশজুড়ে ভয়াবহ লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের দুর্ভোগ বেড়েছে। অনেক এলাকায় দিনের পাশাপাশি রাতেও নিয়মিত লোডশেডিং হচ্ছে।
সরকারি সংস্থার তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম থাকায় পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। রাজধানী ঢাকায় তুলনামূলকভাবে লোডশেডিং কম থাকলেও গ্রামাঞ্চলের চিত্র একেবারেই ভিন্ন।
গ্রামের অনেক এলাকায় টানা কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিদ্যুৎ আসার কিছুক্ষণ পর আবারও চলে যাচ্ছে। এতে তীব্র গরমের মধ্যে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। ঘরে ফ্যান ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালাতে না পারায় ভোগান্তিতে পড়ছেন মানুষ।
বিশেষ করে রাতের লোডশেডিংয়ে দুর্ভোগ আরও বাড়ছে। সারাদিনের প্রচণ্ড গরমের পর রাতে ঘুমানোর সময়ও বিদ্যুৎ না থাকায় অনেকে ঘরের বাইরে বা খোলা জায়গায় অবস্থান করছেন। কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ আসার অপেক্ষায় রাত জেগে থাকতে হচ্ছে পরিবারের সদস্যদের।
দেশের গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দারা বলছেন, দিনের বেলায় বিদ্যুৎ না থাকলে কোনোভাবে সময় পার করা গেলেও রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় কষ্ট বেড়ে যায়। তীব্র গরমে শিশুদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় পানির পাম্প চালানোও সম্ভব হচ্ছে না অনেক এলাকায়। ফলে বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি পানির সমস্যাও তৈরি হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম থাকায় জাতীয় গ্রিডে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের মধ্যে সমন্বয় করা হচ্ছে।
রাজধানীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ তুলনামূলক স্বাভাবিক থাকলেও ঢাকার বাইরে পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও গ্রামীণ এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষ দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতির দাবি জানিয়েছেন।
মাগুরার বাসিন্দা ইখলাসুর রহমান বলেন, ‘বিদ্যুৎ কখন আসে আর কখন যায় বুঝতে পারি না। এত লোডশেডিং আগে হয় নাই। রাতে ঘুমাতে পারি না। বিদ্যুৎ আসে আর যায়। গরমে খুবই করুণ অবস্থা আমাদের।’
বরিশালের আঁখি আক্তার বলেন, বাচ্চাদের নিয়ে লোডশেডিংয়ে যন্ত্রণায় আছি। আমাদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। সমস্যার সমাধান কবে হবে জানি না।
সারাদেশে বাড়ছে ক্ষোভ, নিরাপত্তা শঙ্কায় পুলিশের দ্বারস্থ বিদ্যুৎকর্মীরা
গোপালগঞ্জ শহরে তীব্র লোডশেডিংয়ের মধ্যে দিনে-রাতে মিলিয়ে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার খবর এসেছে। এতে গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হওয়ায় ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) তাদের কার্যালয় ও উপকেন্দ্রে হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করে পুলিশের সহযোগিতা চেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বিদ্যুৎ স্থাপনা ও উপকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা জোরদারের জন্য পুলিশকে চিঠি দিয়েছে।
নীলফামারীর ডোমারে দীর্ঘ ও অনিয়মিত লোডশেডিং নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার পর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডোমার জোনাল অফিস থানায় লিখিত আবেদন করেছে। এতে ডোমার জোনাল অফিস, আন্ধারুর মোড় উপকেন্দ্র এবং চিলাহাটি অভিযোগ কেন্দ্রে রাতের বেলায় নিয়মিত পুলিশ টহল ও নিরাপত্তা দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, অফিসে সাদা পোশাকে সদস্য মোতায়েন এবং টহল অব্যাহত রয়েছে।
দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিদ্যুৎ অফিসে হামলা হচ্ছে- জানতে চাইলে ডোমার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাবিবুল্লাহ বলেন, বিদ্যুৎ অফিসের নিরাপত্তার জন্য সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশের নিয়মিত টহল অব্যাহত রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নীলফামারী জেলার পুলিশ সুপার মো. ফরহাদ হোসেন খাঁন বলেন, বিদ্যুৎ অফিসে হামলার অভিযোগের বিষয়টি আমার জানা নেই। আমার এলাকার পরিবেশ পরিস্থিতি স্বাভাবিক।
বিদ্যুৎ চাহিদা বনাম উৎপাদন
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য বলছে, গতকাল ১১ আগস্ট ডে পিকে বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ১৩৯ দশমিক ৯৫ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৪ হাজার ৭৫ দশমিক ৯৫ মেগাওয়াট। সন্ধ্যা পিকে চাহিদা ছিল ১৮ হাজার ৫১৯ দশমিক ১৮ মেগাওয়াট, এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৫ হাজার ৭০৬ দশমিক ৪ মেগাওয়াট।
১০ আগস্ট ডে পিকে বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৭৯৬ দশমিক ৬৯ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৩ হাজার ৩৩৫ দশমিক ৬৯ মেগাওয়াট। সন্ধ্যায় চাহিদা ছিল ১৮ হাজার ১৫৬ দশমিক ৮২ মেগাওয়াট। বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৫ হাজার ৩১২ দশমিক ৮২ মেগাওয়াট।
‘দেউলিয়া’ বিদ্যুৎ সেক্টর সামলাতে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে সরকার
৯ আগস্ট ডে পিকে বিদ্যুৎ চাহিদা ১৬ হাজার ৭৯৬ দশমিক ৬৯ মেগাওয়াটের বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৩ হাজার ৩৩৫ দশমিক ৬৯ মেগাওয়াট। সন্ধ্যা পিকে ১৮ হাজার ১৫৬ দশমিক ৮২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৫ হাজার ৩১২ দশমিক ৮২ মেগাওয়াট।
কেন এই লোডশেডিং?
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ জ্বালানি সংকট। বিশেষ করে গ্যাসের সরবরাহ কম থাকায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। সম্প্রতি একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এফএসআরইউর কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ থাকে, পরে একটি বয়লার চালু হলেও এলএনজি সরবরাহে ভাটা পড়েছে। এতে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন কমেছে। পাশাপাশি কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সরবরাহের সমস্যা এবং বিভিন্ন কেন্দ্র কারিগরি কারণে বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের সরবরাহ কমেছে।
এ সমস্যার তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান নেই। সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে সরকারকে এগোতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হলো উদ্যোগগুলো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা। - বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত
অন্যদিকে তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। ফ্যান, এসি, পানি তোলার পাম্পসহ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ায় চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান আরও বড় হয়েছে।
ফলে উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও সরবরাহের ঘাটতির কারণে সব কেন্দ্র পূর্ণ ক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না, আর এর প্রভাব পড়ছে লোডশেডিংয়ে।
সংকটে দুঃখপ্রকাশ প্রতিমন্ত্রীর
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এ সত্য আমরা অস্বীকার করছি না। এই সংকটের দায় এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই। কারণ জনগণ ভোট দিয়ে এই সরকারকে নির্বাচিত করেছে। তাই যারা প্রতিনিয়ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে ভুগছেন, সরকারের পক্ষ থেকে তাদের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখপ্রকাশ করছি।’
বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি, প্রতিমন্ত্রীর দুঃখপ্রকাশ
তিনি বলেন, ‘বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করেছেন, এ সমস্যার তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান নেই। সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে সরকারকে এগোতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হলো উদ্যোগগুলো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা।’
বিদ্যুৎ সংকটের কারণ তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালানোর মতো পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ করতে পারছি না। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে পারলে বর্তমান সংকট হতো না।’
পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে: বিপিডিবি
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে। গ্যাস, কয়লা সবকিছুতেই সংকট। সরকার চেষ্টা করছে। আমরা প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে পারছি না। তবে আমরা উন্নতি করছি। গতকালের উৎপাদন আগের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে। তবে ঠিক কবে নাগাদ পরিস্থিতি ঠিক হচ্ছে তা এখনই বলা যাচ্ছে না।’
যা বলছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে। অন্যদিকে বাসাবাড়িতে, শিল্পে সব জায়গায় সংকট। সরকারকে খুব দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশি গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, আমাদের জ্বালানি সংকটের সমাধানে আরেকটা স্টোরেজ রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) প্রয়োজন। সরকারকে খুব দ্রুত এটি স্থাপনে পদক্ষেপ নিতে হবে। এর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশেষ জোর দিতে হবে।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির অপারেশন ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, তিতাসের কাছে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর চাহিদা ২৩০ মিলিয়ন ঘনফুট, আমরা ২০৪ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো দিতে পারছি। এলএনজি সরবরাহ কম থাকার কারণে আমরা দিতে পারছি না।
এইচকেআর