পটুয়াখালীতে কোটি টাকার মিল্ক চিলিং সেন্টার তালাবদ্ধ, বিপাকে খামারিরা

খামারিদের উৎপাদিত দুধ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কোটি টাকা ব্যয়ে পটুয়াখালীতে নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক মিল্ক চিলিং সেন্টার। তবে ভবন নির্মাণের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও চালু হয়নি কেন্দ্রটির মুল কার্যক্রম। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপন না হওয়ায় তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে গুরুত্বপূর্ণ এই অবকাঠামো।
ফলে দুধ উৎপাদন করেও কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাচ্ছেন না জেলার খামারিরা। সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় দুধ দ্রুত বিক্রি করতে হচ্ছে। আবার বাজারে চাহিদা কম থাকলে অনেক সময় কম দামেও দুধ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। আবার সময়মতো ক্রেতা না মিললে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও থাকছে উৎপাদিত দুধের।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেন্দ্রটি চালু হলে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় দুধ সংরক্ষণ করা সম্ভব হতো। এতে দুধের গুণগত মান বজায় রাখার পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনায়ও কিছুটা স্থিতিশীলতা আসত। কিন্তু নির্মাণ শেষ হলেও কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় সেই সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন খামারিরা।
পটুয়াখালী শহরে লাইভস্টক অ্যান্ড ডেইরি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (এলডিডিপি) আওতায় নির্মাণ করা হয় মিল্ক চিলিং সেন্টারটি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্থানীয় খামারিদের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করে তা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা এবং পরে বাজারজাত করার কথা ছিল। প্রতিদিন প্রায় এক হাজার লিটার দুধ সংরক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে কেন্দ্রটির। কিন্তু বাস্তবে সেই কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি।
স্থানীয় খামারিদের অভিযোগ, কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হলেও সেগুলো এখনো যথাযথভাবে স্থাপন করে চালু করা হয়নি। কাজ অসম্পূর্ণ রেখে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিল তুলে নিয়েছে এমন অভিযোগও রয়েছে তাদের। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য জানা যায়নি।
পটুয়াখালীর পুরান বাজারের দুধ ব্যবসায়ী শাহ আলম মিয়া বলেন, দুধ উৎপাদনের পর দ্রুত বিক্রি করতে না পারলে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে বাজারে চাহিদা কম থাকলে খামারিরা বাধ্য হয়ে কম দামে দুধ বিক্রি করেন। মিল্ক চিলিং সেন্টারটি চালু হলে দুধ সংরক্ষণের সুযোগ তৈরি হবে এবং এ সংকট অনেকটাই কমবে।
খামারি রিপন শরীফ বলেন, গরুর খাবার, শ্রমিক ও চিকিৎসাসহ প্রতিদিনই খামারে নানা ধরনের খরচ হয়। কিন্তু উৎপাদিত দুধের ন্যায্যমূল্য না পেলে খামার টিকিয়ে রাখা কঠিন। সরকারি অর্থে নির্মিত কেন্দ্রটি দ্রুত চালু হলে খামারিরা উপকৃত হবেন এবং দুধ উৎপাদনেও উৎসাহ বাড়বে।
লোহালিয়া ইউনিয়নের খামারি মুসলিম শিকদার বলেন, দ্রুত প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপন করে কেন্দ্রটি চালু করা দরকার। এতে দুধ সংরক্ষণের সুযোগ যেমন তৈরি হবে, তেমনি উৎপাদিত দুধের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পথও সহজ হবে।
ডেইরি ফার্ম অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালাম আরিফ বলেন, এলডিডিপির এই প্রকল্প পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে প্রান্তিক পর্যায়ের দুধ উৎপাদনকারী কৃষক-খামারিরা বড় ধরনের সুবিধা পেতেন। কেন্দ্রের মেশিন এখানে স্থাপন করা হলেও এখন পর্যন্ত তা চালু না হওয়ায় স্থানীয় মানুষ কোনো সুবিধাই পাচ্ছেন না।
জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পটুয়াখালীতে বছরে প্রায় এক লাখ ৫৬ হাজার মেট্রিক টন দুধ উৎপাদন হয়। জেলায় দুধ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় এক লাখ ৭৬ হাজার মেট্রিক টন হলেও স্থানীয় চাহিদা রয়েছে প্রায় এক লাখ ৮১ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে ঘাটতি রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এ অবস্থায় দুধ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা গেলে স্থানীয় দুগ্ধ খাত আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ছোট ও প্রান্তিক খামারিরা নিয়মিত ও ন্যায্যমূল্য পেলে উৎপাদন বাড়াতে আগ্রহী হবেন।
তবে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামোটি চালু না হওয়ায় সেই সম্ভাবনাই এখন প্রশ্নের মুখে।
এলডিডিপি প্রকল্পে প্রায় পাঁচ হাজার ৩৮৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা ব্যয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়। প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে। কিন্তু প্রকল্পের আওতায় নির্মিত পটুয়াখালীর এই মিল্ক চিলিং সেন্টার এখনো খামারিদের কাজে আসেনি।
পটুয়াখালী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, মিল্ক চিলিং সেন্টারের যন্ত্রপাতি এখনো স্থাপন করা হয়নি। বিষয়টি প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার জানানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
এইচকেআর