বরিশালে ৯ মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত ১১ হাজারের বেশি, মৃত্যু ১৮

পরিত্যক্ত জলাশয়, ময়লা নর্দমা আর জমে থাকা পানিতে মশার প্রজনন বাড়লেও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এর মধ্যে বদলে গেছে বরিশাল বিভাগের ডেঙ্গুর হটস্পটও।
গত বছর বরগুনায় সংক্রমণ বেশি থাকলেও এবার সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে পিরোজপুর ও ঝালকাঠিতে। চলতি বছরের ৯ মাসে বিভাগের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন সাড়ে ১১ হাজারের বেশি মানুষ। মারা গেছেন ১৮ জন।
তবে সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকেও চিকিৎসা নিচ্ছেন আক্রান্তদের বড় একটি অংশ। ফলে সরকারি হিসাবের বাইরে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
‘শেবাচিমে পা রাখার জায়গা নেই’
বরিশালের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু নিয়ে চিকিৎসাধীন নূরুল আমিন এসেছেন পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া থেকে।
নূরুলের বাবা রুস্তম আলী বলেন, ছেলের জ্বর হলে প্রথমে তাকে মঠবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা জানান, তার রক্তে প্লাটিলেট কমে গেছে। পরে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, শের-ই-বাংলায় নিয়ে যাওয়ার পর সেখানকার পরিস্থিতি দেখে বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করেছি। শের-ই-বাংলা মেডিকেলে পা রাখার জায়গা নেই।
নূরুল আমিনের মতো অসংখ্য রোগী এখন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, অতিরিক্ত চাপের কারণে সরকারি হাসপাতালে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
কলাপাড়া থেকে আসা ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী খলিল বলেন , প্রথমে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হই। সেখানে বেড খালি নেই, পরিবেশ-পরিস্থিতি ভালো না। তাই এক দিন সেখানে থেকে বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের সঙ্গে অন্য রোগীদের একই ওয়ার্ডে, এমনকি একই বেডেও রাখা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মশারি ব্যবহার না করায় হাসপাতালে থাকা রোগীরাও মশার কামড়ের ঝুঁকিতে থাকছেন।
সংক্রমণ বেশি পিরোজপুর ও ঝালকাঠিতে
বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছয় জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ১১ হাজার ৬০০ জনের বেশি। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন পিরোজপুরে ২ হাজার ৯৭০ জন। দ্বিতীয় অবস্থানে ঝালকাঠি, সেখানে আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ২৩৪ জন।
ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে মারা গেছেন ১৫ জন। এ ছাড়া পটুয়াখালী, পিরোজপুর ও ঝালকাঠিতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজন করে মারা গেছেন।
গত বছর বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছিল প্রায় ২০ হাজার। ওই বছর মারা গিয়েছিলেন ৪৫ জন।
মশক নিধনে বাড়ছে বাজেট, কমছে না আতঙ্ক
বরিশাল সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশক নিধনে বরিশাল সিটি করপোরেশনের ব্যয়ও বাড়ছে। দুই বছরের ব্যবধানে কীটনাশক কেনার বাজেট বেড়েছে প্রায় ১ কোটি টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাতে বাজেট ছিল ৩ কোটি ৪ লাখ ২১ হাজার ৬০০ টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ৩ কোটি ৮৩ লাখ ৪৫ হাজার ৪৫০ টাকা। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাখা হয়েছে ৪ কোটি টাকা। তবে বাজেট বাড়ানোর পাশাপাশি মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
‘এক বেডের বিপরীতে থাকতে হয় ৪-৬ জনকে’
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মিডিয়া ফোকাল পার্সন, আবাসিক সার্জন ডা. মাজহারুল রেজোয়ান রেজা বলেন, এখন ডেঙ্গুর মৌসুম। মশা নিধন করা না গেলে সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, আমরা নিজেরা সচেতন না হলে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। শেবাচিমে রোগীর চাপ অবশ্যই বেশি। এক বেডের বিপরীতে চার থেকে ছয়জনকেও থাকতে হয়।
রোগীর চাপ সামাল দিতে আলাদা ডেডিকেটেড ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। এ নিয়ে হাসপাতালের সভায় আলোচনা হয়েছে।
সচেতনতা ছাড়া নিয়ন্ত্রণ কঠিন
বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. রেফায়েতুল হায়দার বলেন, ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভাগে ডেঙ্গুতে ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিয়েছেন সাড়ে ১১ হাজারের বেশি রোগী।
তিনি বলেন, সচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া ডেঙ্গু প্রতিরোধে শতভাগ সফলতা অর্জন সম্ভব নয়। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ডেঙ্গু প্রতিরোধে কাজ চলছে এবং হাসপাতালগুলোতে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু মশক নিধনের বাজেট বাড়ানো কিংবা হাসপাতালে রোগী ব্যবস্থাপনা দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বাড়ি, ছাদ, নালা, পরিত্যক্ত জলাশয় ও আশপাশের জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করলেই সংক্রমণ কমানো সম্ভব।
এইচকেআর