শান্তিতে ঘুমাও, তোমার স্মৃতি চিরজাগরিত!

কমল সেনগুপ্ত ॥
কিছু মানুষের চিরপ্রস্থান কেবল একটি মৃত্যুর সংবাদ নয়, বরং তা সমাজের বুক চিরে বয়ে যাওয়া এক অন্তহীন আর্তনাদ। ২০০৪ সালের ২রা অক্টোবর সকালে যখন সেই বজ্রাঘাতের মতো খবরটি এসে পৌঁছাল, দক্ষিণাঞ্চলের আকাশ-বাতাস যেন ভারী হয়ে কেঁদে উঠেছিল। সেদিন আকস্মিক এক সংবাদে পরিণত হয়েছিলেন যিনি, আমৃত্যু তিনি অন্যের খবর কুড়িয়ে বেড়ানো মানুষ, আমাদের পরম শ্রদ্ধার মাইনুল হাসান।
৫৪ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনের ৩২টি বছর যিনি কেবল সত্যের অনুসন্ধান আর মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁর এমন আকস্মিক বিদায় আজও সবাই মেনে নিতে পারেননি।
১৯৫০ সালের ৪ঠা অক্টোবর জন্ম নেওয়া এই মানুষটি মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গণের মুখপত্র সাপ্তাহিক বিপ্লবী বাংলাদেশ-এর হাত ধরে ১৯৭২ সালে সাংবাদিকতা শুরু করেছিলেন। এরপর দৈনিক ইত্তেফাক, বিএসএস, দৈনিক গণকণ্ঠ, বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি আমৃত্যু দৈনিক ইত্তেফাকের সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার এবং চ্যানেল আই, বিবিসি ও রয়টার্সের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন।
দীর্ঘ ৩৩ বছরের রক্তঘাম ঝরানো পথচলায় তিনি কেবল একজন সংবাদকর্মীই ছিলেন না, পুরো সাংবাদিক সমাজের পরম অভিভাবক হয়ে উঠেছিলেন। সাহসী সাংবাদিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯১ সালে ইউনেস্কো ক্লাব স্বর্ণপদকসহ নানা সম্মাননায় ভূষিত হলেও সাধারণ মানুষের ভালোবাসাই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
সাংগঠনিক নেতৃত্ব আর সাংস্কৃতিক মননে তিনি ছিলেন এক অনন্য প্রদীপ। বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন। বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনে শীর্ষ নেতৃত্ব দেওয়া ছাড়াও শিশু সংগঠন 'চাঁদেরহাট' এর মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের শিশু আন্দোলনে তিনি রেখে গেছেন অমিয় ছাপ।
বিটিভির পর্দায় বরিশালের লোকসংস্কৃতিকে ফুটিয়ে তুলতে তাঁর প্রচেষ্টা আজও স্মৃতির পাতায় উজ্জ্বল। ব্যক্তিগত জীবনে মৃত্যুর মাত্র তিন বছর আগে সাংবাদিক শাহিনা আজমিনের সঙ্গে ঘর বাঁধলেও ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে কিডনির জটিলতায় আক্রান্ত হন। ২০০৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর কিডনি ফাউন্ডেশনে ভর্তি হওয়ার পর সমস্ত আকুতি আর চিকিৎসকদের চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ২ অক্টোবর সেই চিরতরে চলে যাওয়ার সকালটি নেমে এসেছিল।
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত যিনি অন্যের সংবাদ খুঁজে ফিরেছেন, আজ তিনি নিজেই ইতিহাসের এক দীর্ঘ ও বেদনাভরা পাতা। মাইনুল হাসান হয়তো আজ আমাদের চোখের অতীতে হারিয়ে গেছেন, কিন্তু দক্ষিণাঞ্চলের বাতাসে, মেঘে আর সাংবাদিকদের হৃদয়ে তিনি এক চিরন্তন প্রেরণা হয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন। মৃত্যুদিনে অনন্ত শ্রদ্ধা।
এইচকেআর