যুগের পর যুগ বিএম কলেজের সৌন্দর্য বাড়িয়ে চলেছে নাগলিঙ্গম গাছ

ইমরান ফরাজী:
কিছু গাছ কেবল ছায়া দেয় না, সময়ের গল্পও বলে। কিছু বৃক্ষ শুধু প্রকৃতির অংশ নয়, একটি প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য, স্মৃতি ও আবেগের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে।
বরিশালের ঐতিহ্যবাহী ক্যাম্পাসে যুগের পর যুগ ধরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা নাগলিঙ্গম গাছটি তেমনই এক নীরব ইতিহাসের সাক্ষী। প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিক্ষার্থীর পদচারণা, স্বপ্ন, সংগ্রাম, ভালোবাসা, সাফল্য আর বিদায়বেলার আবেগকে বুকে ধারণ করে আজও এটি কলেজের সৌন্দর্যের অন্যতম প্রতীক।
সবুজে ঘেরা বিস্তীর্ণ ক্যাম্পাসে ঋতুর আবর্তনে যখন নাগলিঙ্গম গাছের কাণ্ডজুড়ে একে একে ফুটে ওঠে অসংখ্য দৃষ্টিনন্দন ফুল, তখন যেন প্রকৃতি নিজেই রচনা করে এক জীবন্ত শিল্পকর্ম। গোলাপি, লাল, কমলা ও হলুদের মনোমুগ্ধকর সমন্বয়ে ফুটে থাকা ফুলগুলো দূর থেকেই দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে।
ফুলের গঠনও বিস্ময়কর—অনেকের কাছে তা শিবলিঙ্গ ও সাপের ফণার প্রতিচ্ছবির মতো মনে হয়। সেই বৈশিষ্ট্য থেকেই এসেছে এর নাম 'নাগলিঙ্গম'। সুগন্ধে ভরা এই বিরল ফুল শুধু সৌন্দর্যই ছড়ায় না, প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছেও এক বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
প্রতিবছর ফুল ফোটার মৌসুমে গাছটির নিচে ভিড় জমে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীদের। কেউ মুগ্ধ চোখে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য উপভোগ করেন, কেউ স্মার্টফোনের ক্যামেরায় বন্দি করেন সেই মুহূর্ত, আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাগ করে নেন প্রিয় ক্যাম্পাসের এই অনন্য রূপ। অনেক প্রাক্তন শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন পর কলেজে ফিরে এসে খোঁজ নেন সেই চিরচেনা নাগলিঙ্গম গাছটির, কারণ তাদের ছাত্রজীবনের অসংখ্য স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই বৃক্ষকে ঘিরে।
ক্যাম্পাসের প্রবীণদের মতে, বহু দশক ধরে নাগলিঙ্গম গাছটি কলেজের নান্দনিক সৌন্দর্যের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। অসংখ্য ঝড়-ঝঞ্ঝা, বর্ষা, খরা ও সময়ের পরিবর্তন অতিক্রম করেও এটি আজও একই দৃঢ়তায় দাঁড়িয়ে আছে। যেন নীরবে শেখায়—শিকড় যত গভীর হয়, সময়ের ঝড় তত সহজে তাকে নাড়াতে পারে না।
শুধু একটি বৃক্ষ নয়, নাগলিঙ্গম গাছটি যেন বিএম কলেজের ইতিহাসেরই এক জীবন্ত অধ্যায়। নীরব এই বৃক্ষ সাক্ষী হয়েছে অসংখ্য ব্যাচের আগমন ও বিদায়ের, সাংস্কৃতিক আয়োজনের, আন্দোলন-সংগ্রামের এবং তারুণ্যের অগণিত গল্পের। তাই এটি কেবল প্রকৃতির সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, বরং কলেজের ঐতিহ্য ও পরিচয়েরও এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
প্রকৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এই অনন্য সমন্বয় সংরক্ষণে সচেতন মহল বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, এমন বিরল ও শতবর্ষী ঐতিহ্যের সাক্ষী বৃক্ষগুলো সংরক্ষণ করা মানে শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়, একটি প্রতিষ্ঠানের স্মৃতি ও ইতিহাসকেও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাঁচিয়ে রাখা।
সময়ের স্রোতে মানুষ বদলায়, ব্যাচ বদলায়, ক্যাম্পাসে আসে নতুন মুখ। কিন্তু নাগলিঙ্গম গাছটি আজও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে নীরবে বলে যায়—ঐতিহ্য কখনও পুরোনো হয় না; যত্নে লালন করলে প্রকৃতির সৌন্দর্য যুগের পর যুগ মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে।
এইচকেআর