আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের প্রভাবে ঢাক-ঢোল কারিগরদের ব্যবসায় ভাটা

কেএম আজাদ রহমান, আগৈলঝাড়া ॥
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাউৎসব মানেই ঢাক-ঢোলের শব্দ, ধুপের গন্ধ, শঙ্খ-আরতি আর উল্লুদধনী,প্রসাদ বিতরণসহ নানা আয়োজন।
আর মাত্র ২ দিন বাকি থাকলেও দুর্গা উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ঢাক-ঢোল ও হারমোনিয়াম তৈরি ও মেরামত কাজের আগৈলঝাড়ার কারিগররা ভুগছে হতাশায় তবে নুতন অর্ডার না থাকলেও শেষ সময়ে এসে ঢাক-ঢোলসহ বাদ্যযন্ত্র জোড়া-তালী দিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।
আগৈলঝাড়ায় সর্বাধিক পূজা মন্ডপ থাকলেও ঢাক-ঢোল হারমোনিয়াম তৈরীর কারিগরদের নেই তুলনামূলক কাজের চাপ। বরিশাল জেলার মধ্যে আগৈলঝাড়া উপজেলায় সর্বাধিক ১৬১টি মন্দিরে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। উপজেলার রত্নপুর ইউনিয়নের বারপাইকা বাজারে এলাকাবাসীর স্বেচ্ছাশ্রমে দুই মাষে সর্বাধিক ব্যয়ে সর্ববৃহৎ দুর্গাপূজার বিশেষ আয়োজন করা হয়েছে, দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করতে সাজ-সজ্জায় রয়েছে বিশেষ নতুনত্বের ছোঁয়া।
আগৈলঝাড়া উপজেলা রোডের ঢাক-ঢোল হারমোনিয়াম তৈরি ও মেরামতের কারিগর শ্যামল দাস ও সুনীল মণ্ডল সহ একাধিক বাদ্যযন্ত্র প্রস্তুতকারী এ পেশায় রয়েছ। এসকল ব্যবসায়ীরা বছরের অন্যন্য সময় গুলোতে থাকেন শারদীয় দুর্গাউৎসবে ঢাক-ঢোল, তবলা হারমনিয়াম তৈরীর নতুন অর্ডার ও মেরামত কাজের চাপের অপেক্ষায় থাকেন।
পুরাতন বাদ্যযন্ত্র মেরামতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের চাপ বৃদ্ধির আশঙ্কায় প্রস্তুতি নিলেও ইলেকট্রনিক্স বাদ্যযন্ত্রের প্রভাবে তাদের ব্যবসায় ভাটা করেছে। শারদীয় দুর্গোৎসবের আর মাত্র ২ দিন বাকি থাকলেও তাদের দোকানে এসব বাদ্যযন্ত্রের চামড়া পরিবর্তন, চাক পাল্টানো, খোল বদল, ছাউনি, নুতন দড়ি-টানাসহ সামান্ন মেরামতের কাজ থাকলেও তেমন কোন নতুন অর্ডার নেই বলে জানিয়েছে তারা।
উপজেলা রোডে ৪০ বছর যাবত ঢাক-ঢোল তৈরী ও মেরামতের কারিগর শ্যামল দাস (৬০) জানান ৫-৬টি পুরাতন ঢাক মেরামত করছি, নতুন তৈরীর কোন অর্ডার পাইনি, ২টি ঢাক মন্দিরে ৫ দিনের জন্য ভাড়া দিয়েছি, নতুন একটি ঢাক তৈরী করতে ১ হাজার ৫শত টাকা মুজুরীসহ ১০-১২ হাজার টাকা খরচ পরে, কাঠ ও স্টিলের একজোড়া বায়া-তবলার দাম ৭ হাজার টাকা।
পুরনো ঢাক-ঢোল মেরামতের কাজের উপর নির্ভর করে মজুরি নিয়ে থাকি, ঢাক-ঢোল তৈরীর চামড়া,চাক,দড়ি, আংটা, ছাউনিসহ অন্যন্য সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির কারনে এ পেশায় টিকে থাকা এখন কঠিন হয়ে পরেছে।
তিনি আরো জানান আমার বাবাও এ পেশায় ছিল, পূর্বে এ পেশায় অনিল দাস, নির্মল দাস, হরি দাস, নারায়ন দাসসহ অনেকেই এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছে। এরপরেও ঢাক ঢোল তৈরী ও মেরামতের মালামালের মূল্যবৃদ্ধি হওয়ায় এখন আর ব্যবসায়ে পোশায় না, একারনে নতুন করে কেউ এ পেশায় আসেও না, আমার ছেলে রুমন দাসও অন্য পেশায় চলে গেছে তবে কাজের চাপ বাড়লে আমাকে সহযোগিতা করতে আসে রুমন।
ইলেকট্রনিক্স আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের কারণে আমাদের ঢাক-ঢোলে'র চাহিদা নেই বললেই চলে, আমি কোন রকমে টিকে আছি, বাপ-দাদার এ পেশায় মৃত্যুর আগ পর্যন্ত থাকতে চাই।
উপজেলার বাকাল গ্রামের গণেশ মণ্ডলের ছেলে হারমোনিয়াম তৈরীর কারিগর সুনীল মণ্ডল (৬৫) ২৩ বছর কাজ করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় হারমোনিয়াম কোম্পানি যতিন এ্যান্ড কোং এ, এরপর তার নিজের প্রতিষ্ঠান মিউজিক মাঠ এ, এক সময় তার দোকানে হারমোনিয়াম তৈরির কারিগর হিসেবে কাজ করেছেন নলিনী বৈরাগী, নিতাই রায়, মৃনাল বিশ্বাস, সুজিত ঘরামিসহ ৫ জন।
বয়সের ভাড় তাকে (সুনীল মণ্ডল) স্পর্শ করতে না পারায় যত্ন সহকারে নিজে নিপুন হাতে নিখুত ভাবে তৈরি ও মেরামত করে চলছেন হারমোনিয়াম সহ অন্যন্য বাদ্যযন্ত্র। দুর্গাপূজার পূর্বেই অর্ডার নেয়া ২টি নুতন ও ৪টি পুরাতন হারমোনিয়াম তৈরি ও মেরামত করে প্রস্তুত করছেন তিনি কাস্টমারকে ডেলিভারি দেওয়ার জন্য, প্রকার ভেদে প্রতিটি নুতন হারমোনিয়াম ২৫ থেকে ৮০ হাজার টাকা এবং মুজুরী নিচ্ছেন ৬ থেকে ২০ হাজার টাকা।
সেগুন কাঠ, ক্রাশিন কাঠ, রিড (বাশি) পিতলের তার, সোলুলাইট, প্লাস্টিক, বার্নিশ, গামসহ অন্যন্য মালামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে অনেকেই হারমোনিয়াম তৈরির ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও খরচ বেশী হওয়াশ তৈরী করে না।
সারা বছর অপেক্ষায় থাকি পূজায় ভালো অর্ডার হবে কিন্তু হারমোনিয়াম সহ অন্যন্য বাদ্যযন্ত্রের দাম বেশী একারনে হাতে বানানো বাদ্যযন্ত্র না কিনে অনেকেই এখন আধুনিক ইলেকট্রনিক্স বাদ্যযন্ত্র ভারায় এনে পূজাসহ যে কোন অনুষ্ঠান করেন। নতুন করে কেউ এ পেশায় না আসার কারনে কালের আবর্তে এ পেশার কারিগররা এক সময় হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেছেন বাদ্যযন্ত্রের অভিজ্ঞ কারিগর সুনীল মণ্ডল।
এইচকেআর