ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৫ অগাস্ট ২০২১

Motobad news

করোনা যুদ্ধে ওরা ১১ জন

করোনা যুদ্ধে ওরা ১১ জন

রাত দুটো কিংবা ভোর পাঁচটা। যখনই অক্সিজেন প্রয়োজন, পাশে আছে 'ঝালকাঠি মিডিয়া ফোরাম অক্সিজেন জোন' এবং নলছিটি উপজেলার 'বেগম সামসুন্নাহার ফাউন্ডেশন'। সংগঠন দুটির প্রতিষ্ঠাতা যথাক্রমে মো. মনির হোসেন ও মো. শাহাদাত ফকির। দুজনেই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হলেও তাদের অর্জিত অর্থ দিয়েই শুরু করেছেন ফ্রি অক্সিজেন সেবা।

গত ৭ জুলাই ঝালকাঠি শহরের কলেজ খেয়াঘাটে অবস্থিত নিজের মুদির দোকান থেকেই মনির তার সংগঠনের মাধ্যমে ফ্রি অক্সিজেন সেবা চালু করেন। বর্তমানে ঝালকাঠি মিডিয়া ফোরাম অক্সিজেন জোনে ১১ জন স্বেচ্ছাসেবী কাজ করেন। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান রায়হান অক্সিজেন সংকটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।

২৪ ঘণ্টার মধ্যে যখনই অক্সিজেনের জন্য ফোন আসে, রায়হানের মোটরসাইকেল প্রস্তুত। পিপি, মাস্ক ও গ্লাভস পরে অক্সিজেন সিলিন্ডার, পাইপ ও অক্সিমিটার নিয়ে ছুটে যান রোগীর ঠিকানায়। রায়হানের সঙ্গে কাজ করছেন মনির হোসেন ও আব্দুর রহমান।

তাদের এই কার্যক্রম দেখে শহরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী কাদের খান তার বসার একটি কক্ষটি ছেড়ে দিয়েছেন অক্সিজেন সিলিন্ডার রাখার জন্য। 

মো. মনির হোসেন জানান, আনুষঙ্গিক খরচ বাদেও তার সংগঠন এ পর্যন্ত ১ লাখ ২০ হজার টাকার অক্সিজেন সেবা করোনা রোগীদের দিয়েছে। প্রথমে ধার-দেনা করেন তিনি আর রায়হান ৪৫ হাজার টকা খরচ করেন। পরে কয়েকজন কাছের মানুষের সহযোগিতায় বর্তমানে এই সেবা এগিয়ে যাচ্ছে।

সংগঠনের ১ দশমিক ৩৬ মিলিমিটারের ১১টি অক্সিজেন সিলিন্ডার মজুত আছে। রোগীদের অক্সিজেন সেবা দেওয়ার পাশাপাশি শহরের অন্তত ৭ টি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে অক্সিজেন সাপোর্ট, অক্সিমিটার, স্যাভলন ও মাস্ক প্রদান করেছে 'ঝালকাঠি মিডিয়া ফোরাম অক্সিজেন জোন'।

মো. মনির জানান, ঝালকাঠিতে যখন দেখেছি অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে কসাইয়ের মতো ব্যবসা হচ্ছে, তখনই ভেবেছি যেকোনো উপায়ে অক্সিজেন সেবা দিতে হবে বিনামূল্যে। এরপর থেকে অক্সিজেন নিয়ে আর কেউ বাণিজ্য করতে পারছে না।

সংগঠনের আরেক সদস্য আব্দুর রহমান জানান, রোগীদের দেওয়ার জন্য অন্য সংগঠনকেও অক্সিজেন সিলিন্ডার আমরা দিচ্ছি। রিফিল করতে সহযোগিতা করছি। মনির ভাইকে দেখেছি, করোনার এক রোগীকে গাড়ি থেকে কোলে করে হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে পৌঁছে দিয়েছেন। অন্য সংগঠনকে সাপোর্ট দেওয়া ছাড়াও আমাদের সংগঠন সরাসরি ২৩ জন রোগীর বাসায় অক্সিজেন পৌঁছে দিয়েছে।

বুধবার ঈদের দিন দুপুর একটায়ও শহরের কলাবাগানের এক রোগীর বাসায় অক্সিজেন নিয়ে যেতে হয়েছে বলে জানান মো. মনির।

অন্যদিকে নলছিটি উপজেলার মো. শাহাদাত ফকির মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন আরো আগেই। তার উদ্যোগে ও মুফতিদের সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠিত 'শাবাব ফাউন্ডেশন' করোনায় মৃতদের গোসল ও দাফন করে আসছে। এ ছাড়া পুরো রমজান মাস কেনা দামে চাল বিক্রি করে সারা বাংলাদেশকে শাহাদাত দেখিয়েছেন, চাইলেই সম্ভব।

এবার তিনি প্রথমে চেয়েছিলেন একটি গরু কোরবানি করে সবাইকে মাংস দেবেন। কিন্তু অক্সিজেন সংকটের কারণে বিনামূল্যে অক্সিজেন সেবা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ১ লাখ টকা খরচ করেন অক্সিজেন সিলিন্ডার, পাইপ, গ্লাভস, অক্সিমিটার, স্যাভলন, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, পিপি, মাস্ক, সিলিন্ডার রিফিল ও আনুষঙ্গিক বাবদ।

তার এই কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন হাসিবুল হাসান শান্ত নামের একজন স্বেচ্ছাসেবী। মাঝরাতেও ট্রলারে নদী পার হয়ে অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে ছুটে যান প্রত্যন্ত এলাকায়। 

শাহাদাত ফকির জানান, তারা এ পর্যন্ত ১০ রোগীকে অক্সিজেন সেবা দিলেও এর মধ্যে কয়েকজন রোগীর বাড়ি বেশ দূরে। পরিস্থিতি অনুযায়ী দোকান বন্ধ করে সিলিন্ডার রিফিল করতে নদী পাড়ি দিয়ে ঝালকাঠি সদরে গিয়েছেন তিনি নিজেই। এমনও হয়েছে সেই অক্সিজেন যে রোগীর জন্য নিয়ে যাচ্ছিলেন, কিন্তু পৌঁছবার আগেই রোগী মারা গিয়েছে।

তিনি জানান, তার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছেন খালিদ সাইফুল্লাহ'র নেতৃত্বে 'তারুণ্যের নলছিটি' নামের একটি সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবীরা।


এসএমএইচ