ঢাকা শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

Motobad news

রহমতের দশকে আত্মশুদ্ধির ডাক: আজ দ্বিতীয় 

রহমতের দশকে আত্মশুদ্ধির ডাক: আজ দ্বিতীয় 
গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

পবিত্র রমজানুল মোবারকের আজ দ্বিতীয় দিন। অসীম রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের সওগাত নিয়ে আসা এই মাস মুমিনের জীবনে এক পরম আধ্যাত্মিক বসন্ত। গতকাল আমরা প্রথম রোজার মাধ্যমে যে ইবাদতের সূচনা করেছি, আজ দ্বিতীয় দিনে তা আরও সুসংহত করার পালা। রমজানের প্রথম ১০ দিন রহমতের জন্য নির্ধারিত, যার প্রতিটি ক্ষণ মহান আল্লাহর অসীম দয়া ও করুণার বহিঃপ্রকাশ। এই দিনগুলো আমাদের শিক্ষা দেয় কীভাবে কঠোর ধৈর্য ও সংযমের মাধ্যমে স্রষ্টার নৈকট্য লাভ করা যায়।

রহমতের স্বরূপ ও কুরআনের নির্দেশনা
‘রহমত’ শব্দের অর্থ হলো দয়া, করুণা বা স্নেহ। মহান আল্লাহ তাআলা পরম দয়ালু। তাঁর সৃষ্টির প্রতিটি অণু-পরমাণু তাঁর রহমতে সিক্ত। তবে রমজানের এই বিশেষ সময়ে রহমতের দুয়ারগুলো এমনভাবে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, যা অন্য কোনো মাসে হয় না। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: 

‎رَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ ۚ فَسَأَكْتُبُهَا لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَالَّذِينَ هُم بِآيَاتِنَا يُؤْمِنُونَ
অর্থ: “আর আমার রহমত (দয়া) প্রতিটি বস্তুকে পরিবেষ্টিত করে আছে। সুতরাং আমি তা তাদের জন্য নির্ধারিত করব যারা তাকওয়া (খোদাভীতি) অবলম্বন করে, যাকাত প্রদান করে এবং যারা আমার নিদর্শনাবলীতে বিশ্বাস স্থাপন করে।” (সূরা আল-আরাফ: ১৫৬)

রমজানের দ্বিতীয় দিনে এসে একজন রোজাদারের প্রধান চিন্তা হওয়া উচিত—আমি কি আল্লাহর সেই বিশেষ রহমত পাওয়ার উপযুক্ত কাজগুলো করতে পারছি? আমার রোজা কি কেবল উপবাসে সীমাবদ্ধ, নাকি এতে প্রকৃত খোদাভীতি মিশে আছে?

সিয়ামের আধ্যাত্মিক ও মানবিক দর্শন
সিয়াম সাধনা কেবল সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও জৈবিক চাহিদা বর্জন নয়; বরং এটি আত্মার এক নিবিড় প্রশিক্ষণ। আজ দ্বিতীয় দিনের রোজায় যখন শরীরের ক্লান্তি ও ক্ষুধার তীব্রতা বাড়ে, তখন একজন মুমিন অনুভব করতে পারেন পৃথিবীতে কত লক্ষ লক্ষ মানুষ অনাহারে দিন কাটায়। এই অনুভূতিই মুমিনের হৃদয়ে মানবিকতা ও সহমর্মিতা জাগ্রত করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:

‎الصِّيَامُ جُنَّةٌ فَلاَ يَرْفُثْ وَلاَ يَجْهَلْ
অর্থ: “রোজা হলো (জাহান্নাম ও পাপ থেকে বাঁচার) ঢাল। সুতরাং রোজা রেখে কেউ যেন অশ্লীল কথা না বলে এবং জাহেলিয়াতের মতো আচরণ না করে।” (সহিহ বুখারি)

রমজানের এই দ্বিতীয় দিনে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—আমাদের চোখ, কান, মুখ এবং অন্তরকে যাবতীয় পাপাচার থেকে পবিত্র রাখা। মিথ্যা বলা, গীবত করা বা কারও মনে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকাই হলো রোজার প্রকৃত সার্থকতা।

আজকের আমল ও বিশেষ প্রার্থনা

রহমতের এই দিনগুলোতে মুমিনের প্রধান হাতিয়ার হলো ‘দোয়া’। মহানবী (সা.) বলেছেন, “ইফতারের সময় রোজাদারের দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না।” তাই সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতারের আগমুহূর্তে আল্লাহর দরবারে রোনাজারি করা একান্ত প্রয়োজন।

রহমতের এই দিনে আমরা বেশি বেশি এই দোয়াটি পড়তে পারি:

‎يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ بِرَحْمَتِكَ أَسْتَغِيثُ ، أَصْلِحْ لِي شَأْنِي كُلَّهُ ، وَلَا تَكِلْنِي إِلَى نَفْسِي طَرْفَةَ عَيْنٍ
উচ্চারণ: ইয়া হাইয়্যু ইয়া কাইয়্যুমু বিরাহমাতিকা আস্তাগীস, আসলিহ লী শা’নী কুল্লাহু, ওয়ালা তাকিলনী ইলা নাফসী তারফাতা আইন।
অর্থ: হে চিরঞ্জীব, হে চিরস্থায়ী! আমি আপনার রহমতের উসিলায় সাহায্য প্রার্থনা করছি। আপনি আমার সকল কাজ সংশোধন করে দিন এবং এক পলকের জন্যও আমাকে আমার নিজের (নফসের) ওপর ছেড়ে দেবেন না। (নাসাঈ)

দানশীলতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের শিক্ষা
রমজান আমাদের ত্যাগের মহিমা শেখায়। নবী করীম (সা.) রমজানে প্রবহমান বাতাসের চেয়েও বেশি দানশীল হয়ে যেতেন। আজ দ্বিতীয় দিনে আমাদের আশেপাশে তাকিয়ে দেখা উচিত—আমাদের কোনো প্রতিবেশী অনাহারে আছেন কি না। আমাদের ইফতারের একটি ছোট অংশ যদি অভাবী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারে, তবেই আল্লাহর বিশেষ রহমত আমাদের ওপর বর্ষিত হবে। মনে রাখতে হবে, মানুষের সেবা ও উপকারের মাধ্যমেই আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করা সম্ভব।

রমজান আমাদের সামনে তাকওয়া বা খোদাভীতির এক সুবর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে। দ্বিতীয় দিনের এই মাহেন্দ্রক্ষণে আমাদের অলসতা ঝেড়ে ফেলে ইবাদতে মগ্ন হওয়া উচিত। কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং প্রতিটি আমলের পেছনে থাকতে হবে নিখাদ ইখলাস বা আন্তরিকতা। মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের রমজানের প্রতিটি দিনকে রহমতের চাদরে আবৃত রাখুন এবং আমাদের এই ক্ষুদ্র ইবাদতকে কবুল করে জান্নাতের মেহমান হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমীন।

লেখক, মাওলানা মির্জা নাইমুল হাসান বেগ।


এইচকেআর
গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন