পুরানপাড়ার ময়লাখোলা শহরের বাইরে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত

বরিশাল সিটি করপোরেশনের ময়লাখোলা এলাকা। যেই এলাকার সন্তানদের বিয়ে হয় না ভালো জায়গায়। বেড়াতে আসেন না আত্মীয়-স্বজন। বছরজুড়েই নানা রোগে আক্রান্ত থাকে শিশুরা।
সুস্থ জীবনে ফিরতে অনেক মানুষ ঘরবাড়ি বেচে দিয়ে অন্যত্র চলে গেছে। অথচ বিশাল ময়লার ভাগার অপসারণে উদ্যোগ নেয়নি সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের।
ফলে গত ২৩ বছর ধরে ময়লা, দুর্গন্ধ, মশা-মাছি আর রোগ-জীবাণুর আক্রমণে জনজীবন অতিষ্ট হয়ে পড়েছে বরিশাল নগরীর ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পুরানপাড়া এলাকাবাসীর।
তবে সময় পেলে পুরানপাড়ার এই ময়লার ভাগার সিটির বাইরে স্থানান্তর করবেন বলে জানিয়েছেন, বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন। এরই মধ্যে ময়লাখোলার জন্য জায়গা কেনার বিষয়টি সিটি করপোরেশনের মাসিক সভায় অনুমোদন হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার (০৩ এপ্রিল) বিকেলে নগরীর পুরানপাড়া ময়লাখোলা এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে ভুক্তভোগী এলাকাবাসীকে এমন প্রতিশ্রুতিই দিয়েছেন তিনি। নগর প্রশাসনের এমন আশ্বাসে আশার আলো দেখতে শুরু করেছেন এলাকাবাসী।
বরিশাল সিটি করপোরেশন সূত্রে জানাগেছে, ২০০৩ সালে ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পুরানপাড়া এলাকায় প্রায় ছয় একর জায়গাজুড়ে প্রতিষ্ঠিত করা হয় ডাম্পিং স্টেশন। যেখানে বরিশাল সিটির ৩০টি ওয়ার্ডের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে ময়লা ফেলায় ২০০ ফুটের বেশি উঁচু বর্জ্যের পাহাড় তৈরি হয়েছে। যা আধুনিক কোন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ছাড়াই উন্মুক্তভাবে রাখা হচ্ছে। যার ফলে দুর্গন্ধ ও দূষণে পুরানপাড়া, সাপানিয়া, রাঢ়িমহল ও কাউনিয়া কাউনিয়া হাউজিংসহ ১০টি এলাকার অন্তত ২৫ হাজার মানুষ অমানবিক জীবনযাপন করছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাস্তার পাশে যেখানে সামান্য ময়লা-আবর্জনার কারণে মানুষের নাক-মুখ চেপে হাঁটতে হয়, সেখানে বছরের পর বছর বিশাল ময়লাখোলার পাশে বসবাস করতে হচ্ছে তাদের। ময়লা আর মশা-মাছিল কারণে দিন-রাত সবসময় ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে রাখতে হচ্ছে। ময়লার ভাগার হয়েই এলাকাবাসীর চলাচল করতে হচ্ছে।
তারা বলেন, ময়লার তীব্র দুর্গন্ধ এবং মশা-মাছির উপদ্রবে এলাকার মানুষ চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে আছে। শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এলাকার শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ। বর্ষার মৌসুমে মানুষ রাস্তায়ও বেড় হতে পারে না।
স্থানীয়রা আরও বলেন, ময়লাখোলার পাশে বাড়ি হওয়ায় এলাকার ছেলে-মেয়েদের বিয়ে হচ্ছে না। বিয়ের প্রস্তাব আসলেও ময়লার দুর্গন্ধে ভেঙে যাচ্ছে। আত্মীয়-স্বজনরাও বেড়াতে আসে না। এ কারণে গত ২৩ বছরে দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে অনেক পরিবার ভিটামাটি ছেড়ে অন্য এলাকায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। তাছাড়া রাত নামলেই ময়লাখোলা এলাকা মাদকসেবী, কারবারি আর অপরাধীদের আখড়ায় পরিণত হয়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ- গত ২৩ বছর ধরে ময়লার ভাগারটি অপসারণের দাবি জানিয়ে আসছেন তারা। বিক্ষোভ-মানববন্ধনসহ নানা পন্থায় আন্দোলন করেছেন তারা। কিন্তু কার্যত কিছুই হয়নি। যখন যে মেয়র এসেছেন শুধু আশ্বাসের বাণীই শুনিয়েছেন।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা মো. ইউসুফ আলী বলেন, পুরানপাড়া ডাম্পিং স্টেশনে প্রতিদিন ১৯০ থেকে ২০০ টন ময়লা-আবর্জনা ফেলা হয়। ডাম্পিং স্টেশনটি এখন পুরোপুরি ব্যবহার অনুপযোগী। এটির মেয়াদ নেই। যত দ্রুত সম্ভব জমি অধিগ্রহণ করে নতুন ডাম্পিং স্টেশন চালু করা দরকার। না হলে এসময় শহরের ময়লা-আবর্জনা ফেলার আর জায়গা থাকবে না।
এদিকে- শুক্রবার বিকেলে এলাকাবাসির অনুরোধে ময়লাখোলা এলাকা পরিদর্শন করেছেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন। এসময় তিনি প্রত্যক্ষ করেন এলাকাবাসির চরম দূরভোগ এবং জনস্বাস্থ্যঝুঁকির বাস্তব চিত্র।
এসময় সিটি প্রশাসক বিলকিস জাহান শিরীন সাংবাদিকদের বলেন, যেখানে আমি ১০ মিনিট দাঁড়াতে পারছি না দুর্গন্ধে, সেখানে ছোট ছোট বাচ্চারা খেলাধুলা করছে। এটা দেখে নিজের মুখ ঢাকতেও লজ্জা লাগছে। শিশুরা বিভিন্ন রোগ-জীবাণুতে আক্রান্ত হচ্ছে।
তিনি বলেন, এই ময়লার ভাগার শহরের ভেতর থেকে সরাতে হবে। শহরের বাইরে জমি কিনে সেখানে স্থানান্তর হবে। সিটি করপোরেশনের গত মার্চ মাসের যে মাসিক সভা হয়েছে তাতে সিটির বাইরে জমি কিনে সেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে। এই এলাকাটাকে বসবাসের উপযোগী করে তোলার জন্য যে সমস্যাগুলো রয়েছে সেগুলো সমাধান করা হবে।
এসময় শিরীন বলেন, গত ১৭ বছর যারা ছিল তারা সিটি করপোরেশনের জনগণের জন্য কিছুই করেনাই। শহরের ময়লা-আবর্জনা রিসাইক্লিন করে আয়ের উৎস সৃষ্টি করা যায় কিনা সেটারও চিন্তা আমাদের আছে। এজন্য সবার প্রথম বরিশাল সিটি করপোরেশনের একটি মাস্টার প্ল্যান দরকার। যে প্ল্যান অনুযায়ী আগামী দিনে যেই কাজটাই করবো সেটা যেন প্ল্যানের ভিতর থেকেই করি, যেটা মানুষের জন্য কাজে লাগবে।
এইচকেআর