ডুবে যাওয়া নৌকার মাঝিকেই দুষছেন বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার লইস্কার বিলে বালুবাহী ট্রলারের ধাক্কায় যাত্রীবাহী নৌকাডুবে ২৩ জনের মৃত্যুর ঘটনায় ডুবে যাওয়া নৌকার মাঝিকেই দুষছেন বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা। এছাড়া দুর্ঘটনার পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করেছে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি।
শুক্রবার বিকেলের ওই দুর্ঘটনার পর পাঁচদিনে দুর্ঘটনা কবলিত নৌকার মাঝি ও বেঁচে যাওয়া যাত্রীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের অন্তত ৩০ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করেছেন কমিটির সদস্যরা। মাঝির দোষেই নৌকাটি ডুবে ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন একাধিক যাত্রী।
বেঁচে যাওয়া যাত্রী জামাল মিয়া জানান, তার বাড়ি হবিগঞ্জে। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের কান্দিপাড়ায় বসবাস করেন। ঘটনার দিন বিজয়নগরের মুকুন্দপুরে ব্যবসায় কাজে গিয়েছিলেন। কাজ শেষে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে চম্পকনগর ঘাট থেকে নৌকায় ওঠেন। তিনি নৌকার উপরের অংশে ছিলেন। দূর থেকে দুটি বড় নৌকা (বাল্কহেড) আসতে দেখে তার নৌকার মাঝিকে ডান পাশ দিয়ে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু মাঝি সেটি আমলে না নিয়ে তাদের চুপ থাকতে বলে বাম পাশ দিয়ে যায়। ওই সময় প্রথমে একটি বালুবাহী ট্রলারের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। পরে আরো দুটি বড় নৌকা এসে পেছন থেকে বালুবাহী ট্রলারকে ধাক্কা দেয়। ওই সময় চম্পকনগর থেকে আসা নৌকায় কমপক্ষে দুইশ জন যাত্রী ছিলেন। নৌকার মাঝি প্রথমেই ঠিক দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী চললে এ দুর্ঘটনা ঘটতো না।
তদন্ত দলের সদস্য ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর) মোজাম্মেল হোসেন রেজা জানান, এখন পর্যন্ত বেঁচে যাওয়া যাত্রীসহ ৩০ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে। সবার দেওয়া তথ্য-উপাত্ত মিলিয়ে নৌ-দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করা হবে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনা রোধে কমিটির পক্ষ থেকে কয়েক দফা সুপারিশ করা হবে। আগামী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে জেলা প্রশাসকের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
তিনি আরো জানান, দুর্ঘটনার একাধিক কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। নৌকার মাঝি অদক্ষ ছিল। ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা হচ্ছিল। আরো একাধিক কারণ পাওয়া গেছে। দ্রুত সংশ্লিষ্ট দফতরে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মো. রুহুল আমীন জানান, বিজয়নগরের চম্পকনগর ঘাটের এক মুড়িওয়ালার জানিয়েছেন- যাত্রীবাহী নৌকাটি ৪টা ৩০ মিনিটে চম্পকনগর ঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও নৌকাটি ৪টা ৫০ মিনিটে ছেড়ে যায়। দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছার আগেই সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে, আলোর স্বল্পতা দেখা দেয়। নৌকাটির কোনো ফিটনেস ছিল না, লাইফ সাপোর্ট ছিল না। এমনকি চালকের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো প্রশিক্ষণ ছিল না।এসব কারণ সামনে রেখেই তদন্ত করা হচ্ছে। একাধিক কারণ পাওয়া গেছে। এ মুহূর্তে দুর্ঘটনার জন্য কাউকে দায়ী করা যাচ্ছে না। সবগুলো বিষয়ে তদন্ত করে প্রকৃত কারণ উল্লেখ করে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
তিনি আরো জানান, দুর্ঘটনা এড়াতে প্রতিবেদনের মধ্যে বেশকিছু সুপারিশ থাকবে। এর মধ্যে চম্পকনগর এবং আনন্দবাজার ঘাটে চলাচলকারী সব যাত্রীবাহী নৌকায় লাইফ সাপোর্টের ব্যবস্থা রাখতে হবে। কোনোভাবেই অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করা যাবে না- বিষয়টি ঘাটের দায়িত্বরতরা নিশ্চিত করবে। এর দায়-দায়িত্ব ঘাট পরিচালনা কমিটি গ্রহণ করবে। প্রতিটি ঘাটে বিআইডব্লিউটিএর জেটি বা পন্টুন থাকতে হবে।
এদিকে দুর্ঘটনার পর থেকেই ডুবে যাওয়া নৌকার মাঝি পলাতক রয়েছেন। তার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার চম্পকনগর ইউনিয়নের ছতুরপুরে।
এইচেকআর