ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০২১

Motobad news

ওষুধ যখন ভয়ঙ্কর মাদক!

 ওষুধ যখন ভয়ঙ্কর মাদক!

 

 

ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর শেষ স্তর কিংবা দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে আহতদের তীব্র কষ্ট লাঘবে চিকিৎসকরা বিশেষ বিবেচনায় ওষুধটি ব্যবহারের অনুমতি দেন। অথচ অক্সি-মরফোন নামের তীব্র ব্যথানাশক এই ওষুধটিই সম্প্রতি মাদক হিসেবে ছড়িয়ে পড়ছে যুবসমাজের মধ্যে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশে শুধুমাত্র জিসকা ফার্মা ওষুধটি উৎপাদন করার অনুমতি আছে। আর আলাদা অনুমোদন সাপেক্ষে সারা দেশে ১২০ জন ডিলারের এটি বিক্রয়ের অনুমতি আছে। এত বিধি-নিষেধের মধ্যেও পাইকারি ও খুচরা বাজারে ওষুধটি বিক্রির প্রমাণ পেয়েছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তালিকা অনুযায়ী অক্সি-মরফোন ‘ক’ শ্রেণির মাদক। চিকিৎসকরা একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে বিশেষ রোগীকে এটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সর্বোচ্চ সাতদিন সাধারণত ইনজেকশনের মাধ্যমে ব্যবহারের অনুমতি দেন। বাড়তি ডোজ এবং দীর্ঘমেয়াদে এটি ব্যবহারের ফলে কিডনি বিকল হয়ে যায়। অথচ মাদকসেবীরা হরহামেসাই অক্সি-মরফোন ট্যাবলেট গুড়া করে সিরাপ বা পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে খেয়ে নেশাগ্রস্ত হচ্ছেন। যুব সমাজ বিশেষ করে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ব্যবহারের তথ্য পেয়েছে ডিবি।

শুক্রবার (১৯ নভেম্বর) রাতে রাজধানীর বাবু বাজার এলাকা ও সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের ধানমন্ডি শাখায় অভিযান চালিয়ে ১৩ হাজার পিস অক্সি-মরফোনসহ আলমগীর সরকার ও জাহিদুল ইসলাম নামে দুইজনকে গ্রেফতার করে ডিবি লালবাগ বিভাগ।

ডিবি সূত্র জানায়, বিষয়টি তদন্তে জানা যায় দেশে ১২০টি ডিলারের ওষুধটি বিক্রির অনুমতি আছে। এর মধ্যে বরিশাল বিভাগে সর্বোচ্চ ৫০টি ডিলার রয়েছে। ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর, হার্টের রোগীসহ জটিল চিকিৎসা ঢাকা কেন্দ্রীক বেশি হলেও ঢাকায় ডিলার রয়েছে ২৭টি।

জিসকা ফার্মার তথ্যানুযায়ী, তারা গত পাঁচ মাসে ৫ লাখ অক্সি-মরফোন তৈরি করেছে, যা ১৫টি জেলায় বিপণনের জন্য সরবরাহ করা হয়েছে। কিভাবে বিপুল সংখ্যক ওষুধ খোলা বাজারে মাদক হিসেবে বিক্রি হচ্ছে তদন্ত করছে ডিবি পুলিশ।

অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া ডিবি লালবাগ বিভাগের কোতোয়ালী জোনাল টিমের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) সাইফুর রহমান আজাদ জানান, কতিপয় ব্যক্তি বাবু বাজার এলাকায় বিপুল পরিমাণ অবৈধ মাদকদ্রব্য অক্সি-মরফোন বিক্রির জন্য অবস্থান করছে এমন তথ্যের ভিত্তিতে ১৯ নভেম্বর সন্ধ্যায় অক্সি-মরফোনসহ আলমগীর ও জাহিদুলকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে ২ হাজার পিস অক্সি-মরফোন উদ্ধার করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্য মতে রাতেই সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের ধানমন্ডি শাখায় অভিযান চালিয়ে আরও ১১ হাজার পিস অক্সি-মরফোন উদ্ধার করা হয়।

গ্রেফতার আলমগীর ডেল্টা ড্রাগ কর্পোরেশনের মালিক ও জাহিদুল ইসলাম জে ট্রেড ফার্মেসি ঢাকার মালিক। তারা বিপুল পরিমাণে ভয়ঙ্কর এই ড্রাগ সংগ্রহ করে মাদকসেবীদের কাছে বিক্রি করে আসছিল বলেও জানান তিনি।

অক্সি-মরফোনের ব্যবহার

চিকিৎসকদের তথ্যানুযায়ী, অক্সি-মরফোন হলো মরফিনের একটি এনালগ, যা একটি এনালজেসিক ড্রাগ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি ইনজেকশন থেকে ওরাল ফর্মে নিয়ে আসা হয়েছে। এটি মূলত মস্তিস্কের সেন্ট্রাল নার্ভ সিস্টেমে কাজ করে। ইউফোরিক ড্রাগ হিসেবে এটি তীব্র ব্যথানাশক হিসেবে ক্যানসার, হার্ট, দূরারোগ্য রোগে আক্রান্ত মৃত্যু পথযাত্রী রোগীর তীব্র ব্যথা কমানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। ড্রাগটি ব্যবহারে মস্তিষ্কে প্রচণ্ড আনন্দ অনুভূতি তৈরি করে। শরীরে সাময়িকভাবে দুঃখ-কষ্ট, ব্যথা ভুলিয়ে দেয়। ব্যথার সিগনাল গিয়ে মস্তিষ্ককে উত্তেজিত করতে পারে না। মস্তিষ্ক বোধহীন-অসাড় হয়ে যায়।

ড্রাগটির বিক্রেতার সম্পর্কে তথ্যানুসন্ধান করতে গিয়ে ভয়াবহ তথ্য পাওয়া গেছে উল্লেখ করে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, এটি নিয়ন্ত্রিত একটি ড্রাগ, যা সাধারণ খুচরা পাইকারি বিক্রেতার কাছে থাকার কোনো সুযোগ নেই। একমাত্র জিসকা ফার্মা এটি উৎপাদন করে। তারা বিভিন্ন হাসপাতালে ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ উৎপাদন ও নিজস্ব ডিলারের মাধ্যমে বিক্রি করে থাকে।

এটি রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ক্রয়-বিক্রয় ও বিপণনের সুযোগ নেই। এমনকি যে চিকিৎসক এটি ব্যবহারের অনুমতি দেন ব্যবস্থাপত্রে সেই চিকিৎসকের নাম, রেজিস্ট্রেশন নাম্বার উল্লেখ করতে হয়। কিন্তু অসাধু ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে এটি চলে যাচ্ছে যুবসমাজের হাতে। মূলত মাদকসেবীরা অক্সি-মরফোন গুড়া করে যেকোনো সিরাপ বা পানীয় এর সঙ্গে মিশিয়ে সেবন করে। এটি ব্যবহারে প্রথমে আনন্দ অনুভূত হয়, এরপর অ্যাডিকশন এবং পরে ডিপেন্ডেন্সি সৃষ্টি হয়। সেবনকারী এটি না পেলে খুন, সাইবার অপরাধের মতো ভয়াবহ অপরাধ সংগঠিত হতে পারে।

৪০০ টাকার ওষুধ মাদক হিসাব ৩ হাজার

সংশ্লিষ্টরা জানান, অক্সি মরফোন প্যাথডিনের চেয়েও অনেক শক্তিশালী। ওষুধটির গায়ের মূল্য ৪০০ টাকা, অথচ খোলা বাজারে এটির দাম আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত।

এটি ব্যপকহারে খুচরা বিক্রেতার কাছে চলে যাচ্ছে উল্লেখ করে এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, কিভাবে খোলা বাজারে বিক্রি হচ্ছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এটি সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার না করলে যুবসমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে।

যুব সমাজ যাতে এই ড্রাগ হাতে না পায় সেজন্য রেজিস্টার্ড চিকিৎসক-বিক্রেতাদের অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, এটির নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা যারা আছেন তাদের সঙ্গে আমরা বসবো। এর সঠিক নিয়ন্ত্রণ না থাকলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো।

এদিকে ওষুধটি চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হলেও মাদক হিসেবে ব্যবহার বিবেচনায় এর লাইসেন্স দিয়ে থাকে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ওষুধ বিক্রির অনুমোদন দেওয়া আছে। যারা নির্দিষ্ট কোম্পানির কাছে লাইসেন্স প্রদর্শনপূর্বক পরিবহনের রুট প্রদর্শন করে এবং কার কাছে বিক্রি করা হবে তা প্রদর্শন করে গ্রহণ এবং বিক্রি করতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক মো. আইয়ুব হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, আমরা ওষুধ হিসেবে এর ব্যবহার ও বিক্রির অনুমোদন দিয়েছি। যেটির বিপণনের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়াও রয়েছে। এটির অনুমোদনের ক্ষেত্রে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। উৎপাদিত অক্সি-মরফোন বিক্রির লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত মনিটরিং ও পরিদর্শন করে থাকে প্রশাসনের পরিদর্শকরা। তবে, এটি মাদক হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে কিনা সেটি দেখার দায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের। বিপণনের ক্ষেত্রে যদি অনুমোদনের বেশি মজুদ ও বিক্রির তথ্য আমরা পাই তবে, কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক (চিকিৎসা ও পুনর্বাসন) মো. মাসুদ হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, অক্সি-মরফোন ওষুধ হিসেবে আমরা লাইসেন্স দিয়ে থাকি। আমরা বিষয়টি জেনেছি যে, অক্সি-মরফোন মাদক হিসেবে বিক্রি হচ্ছে। এমন অসাধু কাজে আমাদের কোনো কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে কেউ ছাড় পাবে না।


এসএম