ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৮ অগাস্ট ২০২২

Motobad news
হাজারো যাত্রীর নৌযাত্রা হয়ে ওঠে অনিরাপদ

দুই ঘণ্টা সেবা দিয়ে রাত গভীর হলে সবাই ঘুমান

দুই ঘণ্টা সেবা দিয়ে রাত গভীর হলে সবাই ঘুমান

বরিশাল কিংবা ঢাকা নৌপথে এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে দূরত্ব মাত্র ৮ ঘণ্টার। এ জন্য শ্রেণি ভেদে মোটা অংকের ভাড়া নেওয়া হয় যাত্রীদের কাছ থেকে। কিন্তু ৮ ঘণ্টার এই রাত্রীকালীন সার্ভিসে এক থেকে দুই ঘণ্টা সেবা দেওয়ার পর আর খোঁজ থাকে না তাদের। রাত গভীর হলে দুই-তিনজন কর্মী ছাড়া বাকিরা ঘুমিয়ে পরেন। এ সময় হাজারো যাত্রীর নৌযাত্রা হয়ে ওঠে অনিরাপদ।

ঝালকাঠীতে লঞ্চে অগ্নিকান্ডের সময় দায়িত্বপ্রাপ্তরা ঘুমিয়ে থাকায় শুরুতেই আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। এমন অবস্থায় ৮ ঘণ্টার পুরো সার্ভিসে সেবা চান যাত্রীরা। রাত্রীকালীন সার্ভিসে কর্মীদের ঘুমাতে হয় বলে দাবি মালিকদের। অপ্রতুল সেবা বাড়াতে তদারকি করার কথা জানিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ।  বরিশাল কিংবা ঢাকা উভয়প্রান্ত থেকে রাত ৯টায় গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় যাত্রীবাহি জাহাজগুলো। গন্তব্যে পৌঁছে ভোর ৫টায়। এই সময়ে ডেকের কিংবা দ্বিতীয় শ্রেণির যাত্রীরা লঞ্চের রেস্তোরাঁয় কিংবা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় রাতের খাবার শেষ করেন।

স্যুট, ভিআইপি কিংবা কেবিন যাত্রীদের খাবার পর্ব শেষ হয় রাত ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে। তাদের সেবা দেয়ার জন্য লঞ্চে নিয়োজিত রয়েছেন কেবিন বয়। কেবিন যাত্রীদের খাওয়ানো শেষ তো ডিউটিও শেষ তাদের। লঞ্চটি গন্তব্যে পৌঁছার আগ পর্যন্ত আর পাওয়া যায় না তাদের। এ কারণে ছোট-বড় দুর্ঘটনা কিংবা সম্ভাব্য বিপদের শুরুতেই যাত্রী এবং মালিকের সম্পদ রক্ষা করা যায় না।  আব্দুল মোতালেব নামে একজন প্রথম শ্রেণির নৌযাত্রী বলেন, ঘাট থেকে অনেক আদর করে ডেকে যাত্রীদের লঞ্চে তোলা হয়। লঞ্চটি ঘাট ত্যাগ করার পর কর্মীরা কে কোথায় যায় হদিস থাকে না। যাত্রীদের সমস্যা-অসুবিধা হলে লঞ্চের কর্মচারীদের খুঁজে পাওয়া যায় না।

 ডা. মো. রায়হান নামে এক কেবিন যাত্রী বলেন, ভাড়ার টাকা তো কম নেয় না তারা। কিন্তু সেবার বেলায় নেই। মধ্য রাতে খাবার পানির প্রয়োজন হলেও কাউকে পাওয়া যায় না। গন্তব্যের উদ্দেশ্যে লঞ্চ ছাড়ার দুই ঘণ্টা পর সবাই ঘুমায়।  সিকদার আবির আজাদ নামে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী বলেন, কেবিনের চাবি হাতে পাওয়ার পর ভোরে বিদায় হওয়ার সময় চাবি হস্তান্তরের আগে লঞ্চের কর্মীদের সেবা নামমাত্র। রাত ১০টা ১১টার পর সবাই ঘুমায়।  কৌতুহলবশত একজন যাত্রী যাত্রাপথে রাত আড়াইটার দিকে পুরো লঞ্চ পরিচালনা ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন। দেখেন নীচে ইঞ্জিন রুমে একজন ড্রাইভার কিংবা তার সহকারী গ্রীজার এবং মাস্টার ব্রীজে একজন সুকানী (দিক নিয়ন্ত্রণকারী) চালিয়ে নিচ্ছেন হাজারো যাত্রী বোঝাই বিশাল আকারের লঞ্চটি।

 তিনি বলেন, মাত্র ৮ ঘণ্টার রাত্রীকালীন সার্ভিস। অথচ হাজারো যাত্রীর নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষা করে ঘুমিয়ে থাকেন সবাই। মালিক কিংবা বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ কেউ তদারকি করেন না বিষয়গুলো। তার দাবি ঝালকাঠীর সুগন্ধা নদীতে যখন অভিযান-১০ লঞ্চে অগ্নিকা-ের সূত্রপাত হয়, তখন ওই লঞ্চের এক-দুইজন কর্মী ছাড়া সবাই ছিলো গভীর ঘুমে। এ কারণে শুরুতেই আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি তারা। দায়িত্বপ্রাপ্তরা যথাযথভাবে দায়িত্বে নিয়োজিত থাকলে শুরুতেই আগুন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো।  

বরিশাল-ঢাকা রুটের বিলাসবহুল বড় যাত্রীবাহি একেকটি লঞ্চ পরিচালনার জন্য ৪০ থেকে ৪৫ জন কর্মী নিয়োজিত থাকেন। যাত্রীদের ভালোমন্দ দেখার দায়িত্ব সুুপারভাইজারের। ভাড়া আদায় করেন ৩জন কেরানী। লঞ্চটি চালনার দায়িত্ব প্রথম শ্রেণির ২ জন মাস্টারের। তাদের নির্দেশনায় এদিক-সেদিক করে মাঝ নদীতে লঞ্চ চালিয়ে নেন ২ জন সুকানী। ইঞ্জিন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ২ জন ড্রাইভার এবং ড্রাইভারের সহকারী ২ জন গ্রীজার।

এছাড়া লঞ্চটি নোঙ্গর করাসহ সিড়ি টানাটানির জন্য ৬-৭ জন লস্কর, ১৫ থেকে ২০ জন কেবিন বয়, ১জন ইলেক্ট্রিশিয়ান এবং মালিকের স্বার্থ দেখার জন্য ৩ থেকে ৪ জন নিরাপত্তাকর্মী। মধ্য রাতে এদের মধ্যে ২-৩ জন ছাড়া সবাই ঘুমায়।  এ বিষয়ে বাংলাদেশ লঞ্চ মালিক সমিতির পরিচালক ও সুরভী নেভিগেশনের চেয়ারম্যান মো. রিয়াজুল কবির বলেন, রাত্রীকালীন সার্ভিসে কর্মীদের ঘুমাতেই হয়। তবে তারা রাত ১টার আগে ঘুমায় বলে মনে হয় না। দিনে রাতে সব সময় কর্মীরা লঞ্চেই থাকেন বলে তিনি জানান।  

বরিশাল বিআইডব্লিউটিএ’র যুগ্ম পরিচালক (বন্দর ও পরিবহন) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, লঞ্চে সেবা অপ্রতুল থাকতে পারে। যাত্রীরা যাতে পর্যাপ্ত সেবা পায় সে বিষয়টি মালিকদের সাথে কথা বলে নিশ্চিত করবেন তিনি।  উল্লেখ্য, বরিশাল-ঢাকাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দূরপাল্লার রুট থেকে প্রতিদিন রাজধানী ঢাকায় চলাচল করে ২ শতাধিক বড় বড় লঞ্চ।

 


এইচকেআর