বাউফলে মৃত ব্যক্তির নাম খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চালের তালিকায়


মো. রশিদ উদ্দিন আহম্মেদ। তিনি ২০২১ সালের ২৯ অক্টোবর মারা গেছেন। তাঁর নাম রয়েছে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজিতে চাল বিক্রির তালিকায়। তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে মৃত্যুর আগেও কোনো সময় তিনি ১০ টাকা কেজি দরে চাল পাননি। অথচ সর্বশেষ এপ্রিল মাসেও তাঁর নামে চাল বিক্রি দেখানো হয়েছে।
মো. আলাল হাওলাদার। ২০২০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মারা গেছেন। অথচ খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির হতদরিদ্রদের তালিকায় তাঁর নাম আছে এবং সর্বশেষ এপ্রিল মাসেও তাঁর নামে চাল বিক্রি দেখানো হয়েছে।
মোসা. সাজু বেগম মারা গেছেন ২০২১ সালের ২০ জুলাই। তাঁর নামও রয়েছে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির তালিকায় এবং তিনিও এপ্রিল মাসে ৩০ কেজি চাল ক্রয় করেছেন বলে দেখানো হয়েছে। অথচ তাঁদের পরিবারে এই সুবিধা সম্পর্কে জানেন না।
এমন ঘটনা পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কেশবপুর ইউনিয়নে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজিতে চাল বিক্রির বেলায়।
এছাড়াও তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত অনেক দরিদ্র ব্যক্তিরা। পাশাপাশি অনেক বিত্তশালী ও ডিলারের স্বজনেরা দরিদ্র ব্যক্তিদের সুবিধা ভোগ করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে ।
এর প্রতিকার পেতে ভুক্তভোগী দরিদ্র ২০ ব্যক্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন।
লিখিত অভিযোগ ও কেশবপুর ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কেশবপুর ইউনিয়নের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ৪, ৫ ও ৬ নং ওয়াডের্র ৫২৩ জন সুবিধাভোগীর নাম রয়েছে। প্রত্যেকে ১০ টাকা কেজি দরে বছরে পাঁচ মাস (মার্চ, এপ্রিল, সেপ্টম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর) ৩০ কেজি করে সংশ্লিষ্ট ডিলারের কাছ থেকে চাল পাওয়ার কথা। কিন্তু সুবিধাভোগি ওই তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও অনেকে সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাঁরা চাল পাচ্ছেন না।
ওই তালিকার ১৪৪ নম্বরে রয়েছে ভরিপাশা গ্রামের বাসিন্দা শহিদুল ইসলামের স্ত্রী মোসা. হোসনেয়ারা বেগমের নাম। ১৪৬ নম্বরে অসিম খানের স্ত্রী ইসরাত জাহান ওরফে সরমি, ১৪৩ নম্বরে ফজলে করিমের ছেলে শহিদুল ইসলাম, ১২২ নম্বরে আ. লতিফ সরদারের স্ত্রী নিলুফা বেগম ও ২২৪ নম্বরে রয়েছে খলিল সরদারের স্ত্রী লাভলি বেগমের নাম। কিন্তু তাঁরা ১০ টাকা কেজি দরের চাল ক্রয় করতে পারছেন না।
হোসনেয়ারা বেগম প্রথম আলোকে বলেন,‘তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও ডিলার তাঁকে চাল দেন না। অভিন্ন অভিযোগ করেন ইসরাত জাহান, শহিদুল ইসলাম, নিলুফা বেগম,লাভলি বেগম।
হাওয়া বেগম নামে এক নারী বলেন,‘ তালিকার ১৪৭ নম্বরে তিন বছর পর্যন্ত তাঁর নাম ছিল। তবে কখনও ১০ টাকা কেজি দরের চাল পাননি। পরে তাঁর নাম কেটে দেওয়া হয়।’ হাওয়া বেগমের প্রশ্ন তিন বছর তাঁর নামের চাল কে নিয়েছিল? তাঁকে কেনো দেওয়া হয়নি?
একই তালিকার ১৩ নম্বরে আসমত আলী ভূঁইয়ার ছেলে মো. রাজ্জাক ভূইয়ার নাম রয়েছে। তিনিও চাল পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন। তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও ভরিপাশা গ্রামের শাহনাজ বেগমকে চাল দেওয়া হচ্ছে না। অথচ ৪,৫,৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক নারী ইউপি সদস্যা এলিনা আক্তারের শ্বাশুড়ি বিত্তশালী মোসা. রাশেদা বেগমের নাম রয়েছে দরিদ্র ব্যক্তিদের তালিকায়। তিনি চালও পাচ্ছেন নিয়মিত। এ বিষয়ে এলিনা আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,‘আমার শাশুরীর নামটাই দেখলেন, অন্য কারো নামটা দেখলেন না। এ রকম অধিকাংশ ইউপি সদস্যদের আত্মীয়-ম্বজনদের নাম দরিদ্র ব্যক্তিদের তালিকায় আছে। যাঁরা সবাই বিত্তশালী।
ভরিপাশা গ্রামের মৃত রশিদ উদ্দিনের মেয়ে মোসা. ডালিয়া বেগম (৪২) বলেন,‘আমার বাবা জীবিত থাকাকালীন কোনোদিনও ১০ টাকা কেজি দরে চাল ক্রয় করতে পারেননি। তখন চাল ক্রয় করতে গেলে ডিলার জানিয়ে দেন তাঁর নাম তালিকায় নাই। এখন জানলাম আমার বাবার নাম তালিকায় ছিল এবং ২০২১ সালের ২৯ অক্টোবর মারা গেলেও এখনও তাঁর বাবা ১০ টাকা কেজি দরে চাল ক্রয় করছেন বলে তালিকায় নাম আছে। আজব দেশ।’
মল্লিকডুবা গ্রামের আলাল হাওলাদার ও সাজু বেগম মারা যাওয়ার পরেও তাঁদের নাম রয়েছে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজিতে চাল বিক্রির তালিকায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইউপি সদস্য অভিযোগ করেছেন,রাজনৈতিক বিবেচনায় আওয়ামী লীগের লোকজনকে ডিলারশিপ দেওয়ার কারণে অনিয়ম হচ্ছে। তাঁরা (ডিলার) কোনো নিয়ম নীতির তোয়াক্কা করছেন না। অনেকের নামের চাল তাঁরা (ডিলার) আত্মসাৎ করছেন।
ডিলার মো. জুয়েল রানা বলেন,‘‘তালিকায় কিছু অনিয়ম আছে। যা তাঁর পূর্বের ডিলার করে গেছেন।’ তবে তিনি কোনো অনিয়ম করছেন না দাবি করে আরও বলেন, যাঁরা কার্ড নিয়ে আসেন, তাঁদেরকেই তিনি চাল দিচ্ছেন। কে মারা গেছে তা তিনি জানেন না।
ইউএনও মো. আল আমিন লিখিত অভিযোগ পাওয়ার সত্যতা স্বীকার করে বলেন,‘এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে ডিলারের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এইচকেআর
