ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

Motobad news

উচ্চহারে করদাতাদের জন্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি কি সময়ের দাবি নয়?

 উচ্চহারে করদাতাদের জন্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি কি সময়ের দাবি নয়?
গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

মো. কামরুজ্জামান খান ‍॥
বাংলাদেশের অর্থনীতি যত বড় হচ্ছে, রাষ্ট্র পরিচালনায় কর রাজস্বের গুরুত্বও তত বাড়ছে। উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত অর্থনীতির পথে এগিয়ে যেতে হলে শক্তিশালী ও টেকসই রাজস্ব কাঠামোর কোনো বিকল্প নেই। অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা কিংবা প্রশাসনিক ব্যয়—সবকিছুর পেছনেই মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে কর রাজস্ব। আর সেই রাজস্বের বড় একটি অংশ আসে ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের কাছ থেকে।

সম্প্রতি সরকার ব্যক্তি শ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা ধাপে ধাপে বৃদ্ধির যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা ভাবছে, তা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী উদ্যোগ। মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং মধ্যবিত্তের আর্থিক চাপের বাস্তবতায় এটি অনেকের জন্য স্বস্তির কারণ হতে পারে। তবে এই আলোচনার পাশাপাশি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনা প্রয়োজন—নিয়মিত ও উচ্চহারে কর প্রদানকারী নাগরিকদের জন্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও কিছু প্রণোদনামূলক সুবিধা চালুর বিষয়টি।

বাংলাদেশে বর্তমানে বিপুলসংখ্যক ব্যাংকার, করপোরেট কর্মকর্তা, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, উদ্যোক্তা ও বেসরকারি চাকরিজীবী রয়েছেন, যাদের আয় থেকে উৎসে কর কর্তন করা হয় এবং যারা ২৫% বা ৩০% কর স্ল্যাবে থেকে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আয়কর পরিশোধ করেন। তাঁদের অনেকে বছরে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা বা তারও বেশি কর প্রদান করেন। বাস্তবতা হলো—ঋণের কিস্তি, বাসাভাড়া, সন্তানের শিক্ষা ব্যয়, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের চাপে তাঁদের জীবনও খুব বেশি স্বস্তিদায়ক থাকে না। তবুও তাঁরা নিয়ম মেনে কর পরিশোধ করেন, কারণ তাঁরা বিশ্বাস করেন—রাষ্ট্রের উন্নয়নে তাঁদেরও দায়বদ্ধতা রয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই সৎ ও নিয়মিত করদাতারা রাষ্ট্রীয়ভাবে কী ধরনের স্বীকৃতি পান?

বাস্তবে দেখা যায়, কর প্রদানকারী অনেক নাগরিক সরকারি বিভিন্ন সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও সাধারণ ভোগান্তি থেকে মুক্ত নন। অথচ বিশ্বের অনেক দেশেই উচ্চহারে ও নিয়মিত কর প্রদানকারীদের জন্য বিশেষ সম্মাননা, দ্রুত সেবা, স্বাস্থ্য সুবিধা কিংবা নাগরিক অগ্রাধিকার ব্যবস্থা চালু রয়েছে যাতে নাগরিকদের মধ্যে কর প্রদানের সংস্কৃতি শক্তিশালী হয় এবং স্বচ্ছ অর্থনীতি গড়ে ওঠে।

বাংলাদেশেও সময় এসেছে করদাতাদের শুধু রাজস্ব আহরণের উৎস হিসেবে না দেখে “রাষ্ট্রের অংশীদার নাগরিক” হিসেবে মূল্যায়ন করার। সরকার ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড চাইলে ভবিষ্যতে কিছু বাস্তবধর্মী উদ্যোগ বিবেচনা করতে পারে। যেমন—বিশেষ “Taxpayer Health Card”, সরকারি অফিসে Priority Service ডেস্ক, বিমানবন্দরে অগ্রাধিকার সুবিধা, নির্ভরযোগ্য করদাতাদের জন্য সহজতর ব্যাংকিং ও প্রশাসনিক প্রসেস কিংবা “Honoured Taxpayer” ধরনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।

এ ধরনের সুবিধা বিলাসিতা নয়; বরং এটি হতে পারে সৎ করদাতাদের প্রতি রাষ্ট্রের সম্মান প্রদর্শনের একটি ইতিবাচক বার্তা। এতে নতুন প্রজন্মও কর প্রদানে উৎসাহিত হবে। কর ফাঁকি কমবে, স্বেচ্ছায় রিটার্ন দাখিলের প্রবণতা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আহরণ আরও শক্তিশালী হবে।

রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক কেবল দায়বদ্ধতার নয়, পারস্পরিক আস্থা ও সম্মানেরও। নাগরিক যদি দায়িত্বশীলভাবে কর প্রদান করেন, তবে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও তাঁদের প্রতি কিছু ইতিবাচক স্বীকৃতি ও সেবামুখী দৃষ্টিভঙ্গি থাকা সময়ের দাবি বলেই মনে হয়।

কলাম-
মো. কামরুজ্জামান খান
সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট
হেড অফ এসএমই ও রিটেইল বিজনেস। 
লংকাবাংলা ফাইন্যান্স পিএলসি


 


এইচকেআর
গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন